২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ১২ শ্রাবণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ বৃহস্পতিবার, ২৭ জুলাই ২০১৭ইংরেজী
রবিবার, 04 মে 2014 21:29

ধ্যান কোর্সে অংশগ্রহণ এবং আমাদের করণীয়

লিখেছেনঃ ইলা মুৎসুদ্দী

ধ্যান কোর্সে অংশগ্রহণ এবং আমাদের করণীয়

বর্তমান বৌদ্ধ সমাজে ধ্যান কোর্সে অংশগ্রহণ প্রক্রিয়া খুব বৃদ্ধি পেয়েছে। একটা সময় ছিল শুধুমাত্র আশ্বিনী পূর্ণিমা থেকে প্রবারণা পূর্ণিমার মধ্যে অর্থাৎ বর্ষাবাসকালীন সময়েই বিভিন্ন বিহারে ধ্যান কোর্সের আয়োজন করা হতো। বর্তমানে অনেক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। এখন বছরের প্রায় সময় বিভিন্ন মেডিটেশন সেন্টারসমূহ ধ্যান কোর্সের আয়োজন করে থাকে এবং গুরুত্ব সহকারে বিভিন্ন লিফলেট, পোষ্টারের মাধ্যমে প্রচারণা চালায় সাথে সাথে মানুষকে ধর্মকাজে উদ্বুদ্ধ করে। কারণ অনেকেই বর্ষাবাসকালীন সময়ে বিভিন্ন অসুবিধার কারণে ধ্যান কোর্সে অংশগ্রহণ করতে না পারলে বছরের অন্য সময়ে হলে তাতে অংশগ্রহণ করতে পারে। আমরা যারা এই রকম সপ্তাহব্যাপী বা ১২ দিনের ধ্যান কোর্সে অংশগ্রহণ করি আমাদেরও কিছু করণীয় থাকে। অনেকে হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন আমাদের আবার করণীয় কি?

আমরা যখন মনস্থির করব আমি ধ্যান কোর্সে অংশগ্রহণ করব, তখন প্রথমেই আমাদের চিত্তকে ঋজু করতে হবে। যদি চিত্তকে ঋজু না করি তাহলে ধ্যান কোর্সে যাওয়াটাই বৃথা। কেন বৃথা? কারণ ধ্যানকোর্সে অংশগ্রহণ মানেই সবকিছু আয়ত্ত করা নয়। ওখানে শুধুমাত্র কয়েকদিনের প্রশিক্ষণ এর জন্য যাওয়া। বাকী দিনগুলিতে যাতে আমরা এগুলি প্রতিদিন অভ্যাস করে সম্যক পথে এগিয়ে যাই। আজকের বিষয়টি সঙ্গতকারণে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেখা যায় আমরা ধ্যান কোর্সে অনেকেই নামেমাত্র অংশগ্রহণ করি। আমাদের কোন লাভ হয় না। আমরা ধ্যান কোর্সে গিয়ে ঘরের সদস্যদের কথা চিন্তা করি, এদিক ওদিক তাকাই, গুরুর আদেশ অমান্য করি অর্থাৎ যেনতেন ভাবে ১০ দিন বা ১২ দিন সময়টা কাটিয়ে আসি। কিন্তু বুদ্ধের সম্যক পথে এগুতে হলে আমাদের এসব অবশ্যই বর্জন করতে হবে। দেখা গেল --- প্রথমদিন ধ্যান কোর্সে অংশগ্রহণের দিন গুরু ধর্মদেশনা দেন এবং কিছু বিধি নিষেধ জারি করেন। যেগুলি আমরা বিন্দুমাত্রও কর্ণপাত করি না। আমাদের আসলে এসব খেয়াল করা খুবই জরুরী। দেখা গেল গুরু বলেছেন--- আপনারা যারা ধ্যান কোর্সে অংশগ্রহণ করেছেন, তারা সকলেই ধ্যান চলাকালীন সময়ে কারো সাথে গল্পগুজবে মেতে উঠবেন না, পান খাবেন না, উচ্চস্বরে কথা বলবেন না, এদিক ওদিক তাকাবেন না, ঘুমানোর সময় বৃথা বাক্যালাপ করবেন না। যথাসময়ে ঘুম থেকে উঠে আবার ধ্যান শুরু করবেন। একটু মনোযোগ দিলেই দেখা যাবে বেশীরভাগ ধ্যানী যোগী গুরুর এইসব আদেশের বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা করেন না।

লোভ, দ্বেষ, মোহ ক্ষয়ঃ ধ্যানে অংশগ্রহণ শুধুমাত্র লোক দেখানো নয়। এর তাৎপর্য অনেক গভীর। আমাদের ধ্যান কোর্সে যেতে হলে সংসারের অনেক মায়া, বাধা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে তারপর যেতে হয়। এত কষ্ট করে ঘর থেকে বের হলাম দুঃখ মুক্তির আশায়, আর ওখানে গিয়ে সময় নষ্ট করলাম, হেলায় ফেলায় দিন কাটিয়ে এক সপ্তাহ বা ১২ দিন পর বাড়ী ফিরে আসলাম তাহলে কিন্তু যাওয়াটাই বৃথা। লোভ, দ্বেষ, মোহ ক্ষয়ের কথা কেন বললাম? এটি বলার পিছনে একটিই কারণ দেখা যায় সাধক/সাধিকাদের খাবারের তালিকায় তখন নিরামিষ ভোজন থাকে। অনেকেই তখন খুব অবজ্ঞার সহিত বলাবলি করে আমরা বাসায় প্রতিদিন মাছ মাংস দিয়ে ভাত খাই আর এখানে এসে নিরামিষ তরকারী দিয়ে ভাত খেতে পারছি না। আবার অনেকেই বলেন তরকারী স্বাদ হয়নি। বাস্তবিক পক্ষে আমরা কিন্ত লোভ ত্যাগ করার জন্য শুধুমাত্র বুদ্ধের নির্দেশনা অনুযায়ী ওষুধ স্বরূপ খাবার খাচ্ছি। এখানে স্বাদ গন্ধ খোঁজার জন্য নয়। আমরা কিন্তু তা করি না।

এবার আসি দ্বেষ চিত্ত প্রসঙ্গেঃ একটি কোর্সে ৪০ থেকে ৫০ জন সাধক সাধিকা অংশগ্রহণ করে। এতজনের জন্য বাথরুম থাকে ৪/৫টি। তাই সকলেই একই সঙ্গে স্নানাদি বা অন্যান্য কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব নয়।  ৫/৬ জন ঢুকলে পরবর্তীতে আর ৫/৬ জন ঢুকতে পারে। তাই ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করাই বাঞ্চনীয় এবং এসময়ে চংক্রমণ করা যায়। বাস্তবে দেখা যায়, অনেকে ষ্পষ্ট ভাষায় বিরক্তিভাব প্রকাশ করে বলে থাকেন, একজনের এত দেরী হচ্ছে কেন? এটা কি বাড়ি নাকি? এভাবে ত্যক্ত বিরক্তিভাব দেখায়। যার দরুণ দ্বেষ চিত্ত উৎপন্ন হয়। এর ফলে সাধক-সাধিকাদের অন্তরায় সৃষ্টি হয়, যা তারা বুঝতে পারে না। কারণ যেখানে বিরক্তি সেখানেই সংষ্কার উৎপন্ন হয়। অথচ সংষ্কার ধ্বংসের জন্যই ধ্যান কোর্সে অংশগ্রহণ।

মোহ চিত্তঃ প্রতিদিন বিকালে ধর্মদেশনা শেষ হওয়ার পর যখন চংক্রমণের সময় আসে তখন বেশীরভাগ সাধিকারা দেখা যায় আত্মীয়-পরিজনের সাথে দেখা করার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে। আত্মীয়-স্বজনদের সাথে কথা বলে, গল্পগুজব করে। যদিওবা গুরুর নির্দেশ থাকে কথা না বলার জন্য তারপরও কার কথা কে শোনে। এভাবে মোহ চিত্তের অধিকারী হয়ে আবারও সংষ্কার উৎপন্ন করে।

কথা বলাঃ বেশীরভাগ সাধিকা চংক্রমণের সময় ২/৩ জন একত্রিত হয়ে কথা বলা শুরু করে। যা খুবই অন্যায় আচরণ হিসাবে গণ্য। কারণ কথা বললে স্মৃতির প্রতি একাগ্রতা থাকে না। একাগ্র সহকারে স্মৃতি ভাবনা না করলে কোনদিনও অগ্রগামী সম্ভব নয়।

এদিক ওদিক তাকানোঃ নির্দেশনা থাকে চংক্রমণের সময় শুধুমাত্র চারহাত পর্যন্ত একজন সাধক/সাধিকা দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে পারে। আর আমরা সুযোগ পেলেই ৪০ হাত দৃষ্টি নিবদ্ধ করি। আমরা একটুও চিন্তা করি না, ভব সমুদ্র পার হওয়ার জন্য সংসার সমুদ্র থেকে মাত্র কয়দিনের ছুটি নিয়ে তাও অতীত জন্মের সুকর্মের পারমী ছিল বলেই ধ্যান কোর্সে অংশগ্রহণ করতে পেরেছি। এই সময়টা যদি নষ্ট করে ফেলি ভবিষ্যতে আর এরকম সময় ফিরে পাব না। শরীরে তখন হয়তো আজকের মতো শক্তি বল, বীর্য নাও থাকতে পারে। তাই সময় থাকতে সাবধান হয়ে আমাদের সম্যক পথে এগুনো উচিত।

উল্লেখযোগ্য বিষয়ঃ যারা প্রথম ধ্যান কোর্স করতে যাবেন তাদের ধ্যান সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞান থাকা বাঞ্চনীয়। তাদের অন্ততঃপক্ষে ৬ মাস খন্ডকালীন ভাবনা করার অভ্যাস থাকা প্রয়োজন। নতুবা বিভিন্ন ধ্যাননুশীলনের বই পড়ে আনাপান স্মৃতি এবং বসা অবস্থায় ১ ঘন্টা ধ্যান করার অভ্যাস করা জরুরী। নাহয় হঠাৎ করে ধ্যান কোর্সে গিয়ে ধৈর্য্য সহকারে ১ ঘন্টা বসে থাকা কোনভাবেই সম্ভব হবে না। যদিওবা গুরুভান্তে বলবেন স্মৃতিসহকারে বসার আসন পরিবর্তন করতে পারবেন তবুও দেখা যায় বার বার আসন নড়াচড়া করলে স্মৃতির প্রতি একাগ্রতা নষ্ট হয়ে যায়। যার জন্য স্মৃতি সাধনা পরিপূর্ণ হয় না। বর্তমান সময়ে অনেক তরুণ-তরুণী ধ্যান কোর্সে অংশগ্রহণ করে। তাদের উচিত পূর্বেই প্রস্তুতি নিয়ে তারপর ধ্যান কোর্সে অংশগ্রহণ। পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়া ধ্যান কোর্সে অংশগ্রহণ শুধুমাত্র সময়ের অপব্যবহার। কারণ আমি যে জায়গায় যাব সেই জায়গার ঠিকানা তো অন্তত জানা থাকা চাই। নাহলে পৌছব কি করে? সেরকম ধ্যানে বসতে হলেও ধ্যান সম্পর্কে জেনে বুঝে তারপর ধ্যান কোর্সে বসা উচিত। বয়ষ্কদের কথা বাদ দিলাম। কারণ বয়ষ্করা অনেক সময় ঠিকভাবে এগুতে পারে না শারীরিক অক্ষমতার কারণে। কিন্তু যারা তরুণ প্রজন্ম উৎসাহী, উদ্যমী তারা একটু চেষ্টা করলেই অনেকদূর এগিয়ে যেতে পারে। তাদের ধ্যান সম্পর্কিত বই পড়া প্রয়োজন। বই পড়লে অনেককিছু জানতে পারবে এবং গুরুভান্তের দেশনা শোনার সাথে সাথেই ধ্যান পদ্ধতি বিভিন্ন রকম সমস্যা চিহ্নিত করে দ্রুত এগুতে পারবে।

ধ্যানে জ্ঞান বাড়ে। আর আমরা যেরকম আচরণ করি তাতে জ্ঞান বৃদ্ধি না পেয়ে কমতে থাকে। আমরা দেখি বিহারের ভিক্ষুসংঘরা সকলে মিলে এক একটি কোর্সের সাধক-সাধিকাদের জন্য কত কষ্ট করেন। মশারিটা পর্যন্ত টাঙ্গিয়ে দেন, যাতে সাধক/সাধিকারা নিশ্চিন্তে ধ্যান কার্য সমাপন করে। এই যে ভিক্ষুসংঘের এত পরিশ্রম, সকাল, দুপুর, বিকাল এবং রাত অবধি বিভিন্ন সূত্র পাঠ, দেশনা প্রদান করা, ধ্যানীদের পরিচর্যা করা অন্ততঃ এসব কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করে সাধক সাধিকাদের আরও ধ্যানে মনোনিবেশ করা প্রয়োজন। আত্মোন্নতি সাধনে সচেষ্ট হওয়া একজন বিচক্ষণ সাধকের কর্তব্য।

লেখকঃ কলাম লেখক ও প্রাবন্ধিক
ই-মেইলঃ This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.

 

Additional Info

  • Image: Image