২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ৬ শ্রাবণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ শুক্রবার, ২১ জুলাই ২০১৭ইংরেজী
বৃহস্পতিবার, 01 মে 2014 03:08

অবতারবাদ : বুদ্ধই সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সাম্য-মৈত্রীর অদ্বিতীয় মহামানব

লিখেছেনঃ নোবেল চৌধুরী প্রজ্ঞা

অবতারবাদ : বুদ্ধই সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সাম্য-মৈত্রীর অদ্বিতীয় মহামানব

ভারতবর্ষে বুদ্ধকে বৈদিক দেবতা বিষ্ণুর সঙ্গে সমীকরণ করা হয়। মৎসপুরাণে এ বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে। ভগবত পুরাণেও বুদ্ধকে বিষ্ণুর সঙ্গে সমীকরণ করা হয়। বুদ্ধকে ভারতীয় ধর্মীয় ঐতিহ্যে বিষ্ণুর নবম অবতার মনে করা হয়। বৌদ্ধধর্মের অনেক পন্ডিতের মতে, ভগবান গৌতম বুদ্ধ বেদবিরোধী ধর্ম প্রচার করার কারণে গৌতম বুদ্ধকে বিষ্ণুর নবম অবতার বানিয়ে হিন্দুত্ববাদীরা ফায়দা লুটে নিচ্ছে। এ প্রসঙ্গে আরো একটি ঐতিহাসিক মতবাদ রয়েছে, শঙ্করাচার্য বুদ্ধের ধর্ম-দর্শনের জনপ্রিয়তা লক্ষ্য করে, তাঁকে বিষ্ণুর অবতার বলে চালিয়ে দেয়।

যারা এ অবতারবাদ মানেন তারা জয়দেবের স্তোত্র মতে দশ অবতারের মধ্যে বুদ্ধকে নবম অবতাররূপে বিশ্বাস করে থাকেন। জ্ঞানীগণ অবতারবাদের মধ্যে ‘Theory of Evolution’ বা ক্রম-বিবর্তনবাদ দেখে থাকেন। অবতারগণ একটার পর অন্যটা উন্নততর অবস্থা প্রাপ্ত হয়েছেন।

 

 

ছবি : দশ অবতার; মৎস (মাছ), কুর্ম, বরাহ, নৃসিংহ (নর-সিংহ), বামন, পরশুরাম (পরশু অর্থাৎ কুঠার সহ রাম), রাম, কৃষ্ণ, বুদ্ধ, কল্কি।

যেমন-

প্রথম অবতার- জলচর ‘মৎস্য’।

দ্বিতীয় অবতার- উভয়চর ‘কুর্ম’।

তৃতীয় অবতার- ‘বরাহ’ একান্তই স্থলচর; কিন্তু নিকৃষ্ট পশু।

চতুর্থ অবতার- নৃসিংহদেব অর্ধেক পশু ও অর্ধেক মানব।

পঞ্চম অবতার- ‘বামন’, মানুষ হলেও অপূর্ণ।

ষষ্ঠ অবতার- ‘পরশুরাম’, পূর্ণ মানুষ বটে; কিন্তু তিনি একুশবার ক্ষত্রিয় নিধন করেন এবং ‘মাতৃহত্যা’ রূপ মহাপাপও করেছিলেন।

সপ্তম অবতার- ‘রাম’। তিনি সুগ্রীবের সহিত বন্ধুত্ব রক্ষা করার জন্য নিরপরাধ বালিকাকে হত্যা করেন এবং নির্দোষ জেনেও সীতাকে বনবাসে পাঠিয়েছিলেন।

অষ্টম অবতার- ‘কৃষ্ণ’। তিনি আত্মার অমরত্ব ব্যাখ্যা করে অনিচ্ছুক অর্জুনকে আত্মীয় নিধনে এবং যুধিষ্ঠিরকে ‘অশ্বত্থমা হত ইতি গজ’ এ মিথ্যা বাক্য বলার জন্য নিযুক্ত করেছিলেন এবং আরও কত  নিন্দনীয় কাজ করেছেন তা অনেকেই বিদিত!

এভাবে বিচার করলে দেখা যায় এখনও যেহেতু ‘কল্কি’ অবতার আসেননি, অবতারদের মধ্যে নবম অবতার ‘বুদ্ধ’ই সর্বশ্রেষ্ঠ। কেননা, বুদ্ধ এমন এক মহামানব যাঁর মধ্যে ছিল জগতের সমস্ত প্রাণীর প্রতি মমত্ববোধ-ভালবাসা। যার বলিষ্ট উদাহরণ- ‘জগতের সকল প্রাণী সুখী হউক’। এরকম গভীর অথচ সরল বাণীর মধ্যদিয়ে মহাকারুণিক গৌতম বুদ্ধ শুধু মানব জাতি নয়, বিশ্বে যত প্রকার প্রাণী আছে সকলের সুখ কামনা করেছেন। তিনি রাজৈশ্বয্য, ভোগশ্বর্য সব কিছু ত্যাগ করে জীবজগতের মঙ্গলের জন্য সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী হয়ে কঠোর সাধনায় মাধ্যমে জগতে 'বুদ্ধ' নামে আর্বিভূত হয়েছেন। শিক্ষা দিয়েছেন মানবতা, স্নেহ, মায়া, মমতা, দয়া করুণা, সহমর্মিতা, অন্যের ধর্ম বিশ্বাসে শ্রদ্ধা, ভ্রাতৃত্ববোধ, সামাজিক ন্যায়বোধ, সামাজিক কল্যাণ, নৈতিকতা ইত্যাদি সর্ব মানবধর্ম। অবতারবাদ অনুসারে, বিষ্ণু যখন যুগোপযোগী ধর্ম প্রচারের জন্য অবতাররূপে জগতে অবতীর্ণ হন, বর্তমান যুগের উপযোগী ধর্ম-প্রচারের জন্য তিনি ‘বুদ্ধ’ রূপেই অবতীর্ণ হয়েছেন। অতএব, বর্তমান যুগের অযোগ্য অতীত রাম ও কৃষ্ণাদি অবতারদের ধর্মবাদ দিয়ে অবতার বিশ্বাসীদের বৌদ্ধধর্মই একান্তভাবে গ্রহনীয় ও পালনীয়।

বুদ্ধ হচ্ছেন জাত বা গোত্রের উর্দ্ধে। এ ধর্মে সব মানুষ সমান। বুদ্ধ দেশনা করেছেন- ‘সমুদ্রের যেমন একটি মাত্র স্বাদ এবং সেই স্বাদ লবনের, সেই রকম আমার ধর্মমতেরও একটি মাত্র স্বাদ, সেই স্বাদ দুঃখের হাত থেকে মুক্তি অর্জনের।’ এই ধর্মমত অনুসারে যথাযথ জীবনযাপন এবং নির্ভুল চিন্তার দ্বারা মানুষ দুঃখ জয় করতে পারে। পাশাপাশি বুদ্ধ আরো দেশনা করেছেন- গঙ্গা, যমুনা, অচিরাবতী, সরভূ ইত্যাদি নদী সমুদ্রে মিলিত হয়ে তাদের স্বতন্ত্র সত্ত্ব ও নাম হারিয়ে ফেলে, তেমনি ক্ষত্রিয়, ব্রাহ্মণ, বৈশ্য এবং শূদ্র আমার ধর্মে প্রবেশ করে জাতি, গোত্র ও নাম হারিয়ে ফেলে। আর বুদ্ধের জীবপ্রেম, সকল সৃষ্টির প্রতি মমত্ত্ববোধ সম্পর্কেও আমরা অবগত। জগতের সকল প্রাণীর শান্তি সুখ কামনার পাশাপাশি 'অহিংসা পরম ধর্ম' বাণীতে তিনি প্রচার করেছেন মহানুভব, সাম্য-সৌম্য জীবনদর্শন। বুদ্ধের প্রচারিত এ ধর্ম রক্ষার্থে কখনো অস্ত্রের প্রয়োজন হয়নি; প্রয়োজন হয়নি যুদ্ধ-বিগ্রহের।

ছবি : ধর্মপ্রচাররত সর্ব জীবে মৈত্রী পরায়ণ, দেব-মনুষ্যগণের শাস্ত্রা মহাকারুণিক বুদ্ধ ভগবান।

পরিশেষে বুদ্ধ সম্পর্কে কবিগুরুর একটি উক্তি দিয়ে শেষ করছি, কবিগুরু বুদ্ধ সম্পর্কে 'বুদ্ধদেব' গ্রন্থে লিখেছেন- এত বড় রাজা কি জগতে আর কোনোদিন দেখা দিয়েছে! বর্ণে বর্ণে, জাতিতে জাতিতে, অপবিত্র ভেদবুদ্ধির নিষ্ঠুর মূঢ়তা ধর্মের নামে আজ রক্তে পঙ্কিল করে তুলেছে এই ধরাতল, পরস্পর হিংসার চেয়ে সাংঘাতিক পরস্পর ঘৃণার মানুষ এখানে পদে পদে অপমানিত। সর্বজীবে মৈত্রীকে যিনি মুক্তির পথ বলে ঘোষণা করেছিলেন সেই তারই বাণীতে আজ উৎকণ্ঠিত হয়ে কামনা করি এই ভাতৃ বিদ্বেষ কলুষিত হতভাগ্য দেশে।

Additional Info

  • Image: Image