২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ১১ আশ্বিন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ মঙ্গলবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭ইংরেজী
বুধবার, 23 এপ্রিল 2014 00:23

গৌতম বুদ্ধের প্রকৃতি প্রেম

লিখেছেনঃ নোবেল চৌধুরী প্রজ্ঞা

গৌতম বুদ্ধের প্রকৃতি প্রেম

গৌতম বুদ্ধের প্রকৃতি প্রেম আমরা গৌতম বুদ্ধের জীব প্রেম সম্পর্কে সকলেই অবগত। ‘জগতের সকল প্রাণী সুখী হউক’ অপ্রমেয় মৈত্রীর এ বাণীই তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ। এবার আমরা আলোচনা করছি বুদ্ধের প্রকৃতি প্রেম নিয়ে।

প্রকৃতির বিরূপ আচরণ, বৈশ্বিক উষ্ণতা এবং নানাবিধ প্রাকৃতিক বিপর্যয় নিয়ে বিশ্ব আজ উৎকণ্ঠিত। দিনে দিনে এ ধরিত্রীর আরো বিপর্যয়! বিশ্বের অস্তিত্বের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি কার্বনের নিঃসরণ না কমে বরং বাড়ছে। ফলে বিপর্যয় আরো ঘনীভূত হচ্ছে। পত্রিকার পাতা খুলতেই চমকে উঠছে মানব সত্ত্বা। একের পর এক বিপর্যয়ের দুঃখলীলা। ঘন ঘন ভূমিকম্প, সুনামি, সাইক্লোন, খরা, অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল এবং নানাবিধ প্রাকৃতিক দুযোর্গে মানুষের জীবন সদা মৃত্যুর সাথে সংগ্রামময়। অনেকের মতে, এর সবই আমাদের নিজেদের ডেকে আনা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন- ‘এর সবই হচ্ছে বিশ্বের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায়। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে বরফ গলে সাগরের উচ্চতা বাড়ছে। ফলে ইতিমধ্যে তলিয়ে গেছে বিশ্বের বহু জনপদ। আর এই ঝুঁকির মধ্যে থাকা দেশগুলোর শীর্ষে আছে আমাদের এই বাংলাদেশও।

প্রতি বছর ২২ এপ্রিল বিশ্বের প্রকৃতি ও পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনতা ও ভালোবাসা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ‘বিশ্ব ধরিত্রী দিবস’ পালিত হয়। এ দিবসটির শ্লোগান হয়- “ধরিত্রী বাঁচান, বাঁচান নিজেকে”। ১৯৭০ সনের ২২ এপ্রিল মার্কিন সিনেটর গেলর্ড নেলসন ধরিত্রী দিবসের প্রচলন করেন। এটি ১৯৯০ সালে আন্তর্জাতিক ভাবে পালিত হয় এবং ১৪১ টি জাতি দ্বারা আয়োজন করা হয়েছিল। সিনেটর গেলর্ড নেলসন ১৯৭০ সালে যে আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন তার নাম ‘Environmental Teach-In’।

কিন্তু প্রকৃতি, পরিবেশ, ধরিত্রীর প্রতি সচেতনতা, ভালোবাসা এবং প্রাকৃতিক এ বিপর্যয়ের কথা ভেবে বুদ্ধ প্রাণ ও প্রকৃতিকে রক্ষার জন্য ভিক্ষু সংঘ ও সাধারণ মানুষকে নানা দিক-নির্দেশনা দিয়েছিলেন আজ থেকে আড়াই হাজার বছরেরও আগে। প্রথমে আমরা বুদ্ধের জীবনের দিকে লক্ষ্য করি- “সিদ্ধার্থ গৌতমের জীবনটাই ছিল প্রকৃতির মায়াজালে বাঁধা। তাঁর জন্ম, বুদ্ধত্ব লাভ এবং মহাপরিনির্বাণ এ তিন মহা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সংঘটিত হয় খোলা আকাশের নিচে, বৃক্ষের ছায়াতলে”।

যে গাছের নিচে আমরা ছায়া লাভ করি, সেই গাছের পাতা, শাখা-প্রশাখা, ডাল-পালা অকারণে ভেঙ্গে ফেলা উচিত নয় বলে বুদ্ধ বোধিসত্ত্বাবস্থায়ও আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন, যা আমরা ‘মহাবোধি জাতকে’ দেখতে পায়। এবং বোধিবৃক্ষের ছায়ায় বসে তিনি বুদ্ধত্ব লাভ করেছিলেন বলে অনিমেষ স্থানে বসে সপ্তাহকাল অনিমেষ নয়নে বোধিবৃক্ষের দিকে তাকিয়ে যেরূপ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন, তা আমরা সকলেই অবগত।

‘যথাপি ভমরো পুপ্ফং বণ্নগন্ধং অহেঠযং পলেতি রসমাদায এবং গামে সুখী চরে’। - পুপ্ফবগ্‌গো ০৬

অর্থাৎ, ভ্রমর যেমন বর্ণ ও গন্ধ নষ্ট না করে ফুলের মধু আহরণ করে, ভিক্খুও তেমনি লোকালয়ে বিচরণ করবে। মহাকারুণিক বুদ্ধ আরো দেশনা করেন- “কালের মহা-পরিক্রমায় জন্ম-জন্মান্তরে আমরা কোনো না কোনো প্রাণিকুলে জন্ম নিয়েছিলাম। সেই সূত্রে বিশ্বের প্রায় সব প্রাণীর সঙ্গে রয়েছে আমাদের অদৃশ্য অচ্ছেদ্য আত্মীয়তার বন্ধন। অন্তত এ কথা ভেবে আমাদের কোনো প্রাণীর প্রাণ সংহার করা উচিত নয় (লঙ্কাবতার সূত্র)”।

কেবল প্রাণী হত্যা থেকে বিরত থাকা নয়, বুদ্ধ ভিক্খু সংঘের প্রতি প্রাণীর হাড়, দাঁত ও শিংয়ের তৈরি জিনিস ব্যবহারেও নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। প্রাণীর প্রাণ রক্ষার পাশাপাশি তৃণ ও উদ্ভিদ রক্ষায় বুদ্ধ ভিক্খু সংঘকে বিশেষ নির্দেশ দেন। বর্ষাকালে ভিক্খুদের হাঁটাচলায় যাতে তৃণ বা শস্যহানি না হয় এর জন্য বুদ্ধ ভিক্খু সংঘকে বর্ষা ঋতুতে তিন মাস এক নাগাড়ে এক স্থানে অবস্থান নিয়ে বর্ষাব্রত পালনের নির্দেশ দিয়েছেন।

বিনয় পিটকে বুদ্ধ ভিক্খু সংঘের প্রতি গাছ কাটতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। সংযুক্ত নিকায়ের বনরূপা সূত্রে, বুদ্ধ ভিক্খু সংঘকে গাছ লাগাতে এবং বনায়ন সৃষ্টিতে উৎসাহিত করেন। চক্কবত্তিসিংহনাদ সূত্রে বুদ্ধ আদর্শ রাজার বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করতে গিয়ে দেশনা করেন- একজন আদর্শ রাজা কেবল তাঁর প্রজার রক্ষক নন, তিনি বন, প্রাণী ও পক্ষিকুলেরও আদর্শ রক্ষক। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় বুদ্ধ কোশলরাজ প্রসেনজিৎ ও মগধের রাজা বিম্বিসারকে মহান রক্ষকের ভূমিকা পালনে উদ্ধুদ্ধ করেছিলেন। বুদ্ধের উপদেশ মেনে চললে প্রাকৃতিক ভারসাম্যহীনতার কুফল আজ আমাদের ভোগ করতে হতো না।

‘চিত্তেনা নিযতি লোকো’ (চিত্ত দ্বারা বিশ্ব শাসিত)। চিত্ত শাসন করে ষড়রিপুকে । তাই সবার আগে চাই চিত্ত বা মনের সংস্কার। নির্মল মন মানে নির্মল বিশ্ব। বায়ু (অক্সিজেন), পানি, সৌরতাপ ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে না। উদ্ভিদ অক্সিজেন দেয়, চুষে নেয় কার্বন-ডাই অক্সাইড। তাই উদ্ভিদ মানুষের পরম বান্ধব। ধরিত্রী উদ্ভিদ, প্রাণী ও প্রাকৃতিক নানান উপাচারে ইকো-সিসটেম চালু রেখে মানুষকে বাঁচিয়ে রেখেছে। ধরিত্রী যেন সর্বংসহা মা। দুগ্ধপোষ্য শিশুদের ন্যায় আমাদের আগলে রেখেছে। এ মায়ের প্রতি আমাদেরও সকৃতজ্ঞ প্রতিদানের কর্তব্য রয়েছে। সব প্রাণীর জন্য মমত্ববোধ, শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানের পরিবেশ সৃষ্টি করে বাঁচাতে হবে প্রিয় ধরিত্রীকে।

Additional Info

  • Image: Image