২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ১৫ চৈত্র ১৪২৩ বঙ্গাব্দ বুধবার, ২৯ মার্চ ২০১৭ইংরেজী
বৃহস্পতিবার, 03 এপ্রিল 2014 01:14

প্রাচীন বৌদ্ধ মতবাদের পক্ষে আধুনিক বিজ্ঞান : সুখ ও সুস্বাস্থ্য

লিখেছেনঃ নির্বাণা ডেস্ক

প্রাচীন বৌদ্ধ মতবাদের পক্ষে আধুনিক বিজ্ঞান : সুখ ও সুস্বাস্থ্য

সভ্যতা এগিয়ে গেছে, মানুষ দিনে দিনে নানা নতুন নতুন আবিষ্কার করেছে। প্রতিনিয়তই মানুষ নতুন শিক্ষায় নতুনভাবে শিক্ষিত হয়েছে। এর অর্থ এই নয় যে, প্রাচীনকালের সব কিছুই ভুল। অতীতের অনেক কিছুই এখন ফিরে আসছে। আরিয়ানা হাফিংটনের নতুন বই 'থ্রাইভ : দ্য থার্ড মেট্রিক টু রিডিফাইনিং সাকসেস এন্ড ক্রিয়েটিং আ লাইফ অব ওয়েল-বিয়িং, উইসডম এন্ড ওয়ান্ডার' এর পুরো ৫৫ পাতাজুড়ে প্রাচীন মনোবিজ্ঞান এবং চিন্তাধারার চর্চার অনেক কিছুই আধুনিক বিজ্ঞানের উন্মেষ ঘটিয়েছেন। জীবনযাপনের অনেক বহু প্রাচীন পন্থাই এখনো আমাদের সুখী, স্বাস্থ্যবান এবং ভারসাম্যপূর্ণ জীবন দিতে পারে। আধুনিক বিজ্ঞানের পথ ধরে আমরা এসব অতীত শিক্ষার চর্চা চালিয়ে সুন্দর জীবন গড়ে তুলতে পারি।
আধুনিক বিজ্ঞানেও ফিরে এসেছে এমন প্রাচীনকালের ৮টি বিশ্বাস এখানে তুলে ধরা হলো যা আমাদের জীবনটাকে সুন্দর করে তুলতে পারে।

১. অন্যকে সাহায্য করা স্বাস্থ্যের জন্য ভালো

গ্রিক দার্শনিকরা 'হিডোনিক' এবং 'ইউডায়মনিক' সুখের নানা উপকারিতা নিয়ে মতামত দিয়েছেন। হিডোনিক সুখ হলো খুশীর জোয়ার এবং কষ্টের ভাটার মিশ্রণ। অন্যদিকে, ইউডায়মনিক সুখ জীবনে অনেক গভীর এবং ব্যাপক অর্থ বহন করে।
চ্যাপেল হিলের ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ক্যারোলিনার মনোবিজ্ঞানী বারবারা ফ্রেডরিকসন গবেষণায় দেখিয়েছেন, কোন ধরনের সুখ আমাদের স্বাস্থ্য এবং সুন্দর জীবনযাপনের জন্য উত্তম।
এই মনোবিজ্ঞানীর গবেষণার প্রতিবেদনটি 'প্রোসিডিংস অব দ্য ন্যাশনার অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস'-এ গত বছর প্রকাশিত হয়। সেখানে বলা হয়, যখন গ্রিক দার্শনিকদের ওই দুটি সুখই যখন আপনাদের সুখী করে, তখন এর পরবর্তী প্রভাব আপনাদের স্বাস্থ্যকর এবং দীর্ঘ জীবন প্রদান করে। ফোনে সাক্ষাৎকার, প্রশ্নের উত্তর নেওয়া এবং রক্তের নমুনা সংগ্রহের মাধ্যমে গবেষণা করা হয়েছে। সেখানে বিশ্লেষণ করা হয়, ওই দুই ধরনের সুখ কীভাবে মানুষের জেনেটিক পর্যায়ে কাজ করে। অধিক হিডোনিক সুখ এবং কম ইউডায়ামনিক সুখ যাদের মধ্যে রয়েছে, তাদের দেহে ভাইরাস আক্রমণ ঠেকাতে অ্যান্টিবডি অনেক কম উৎপাদন হয়। আর যারা অনেক বেশি ইউডায়ামনিক সুখ ভোগ করেন, তাদের দেহে অ্যান্টিবডি অনেক বেশি উৎপন্ন হয়।

২. আকুপাংচার দেহের ভারসাম্য রক্ষা করে

চীনের এই প্রাচীন চিকিৎসা পদ্ধতিতে আদিকালে মানুষের পুরো দেহে শক্তি প্রবাহের ভারসাম্য বজায় রাখা হতো। এই শক্তি প্রবাহ পদ্ধতিকে বলা হয় 'চি'। আধুনিককালে আমরা ব্যায়ামের মাধ্যমে গোটা দেহের শক্তি প্রবাহমাত্রা ঠিক রাখি। অথচ 'আর্কাইভস অব ইন্টারনাল মেডিসিন'-এ সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণালব্ধ প্রতিবেদনে বলা হয়, এই প্রাচীন পদ্ধতিতে মাইগ্রেনের ব্যাথা, আরথ্রাইটিস এবং অন্যান্য ক্রনিক ব্যাথা থেকে মুক্তি মেলে।
অতীতে আকুপাংচার পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন এমন ১৮ হাজার ব্যক্তির ওপর এক জরিপ চালিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন ধরনের ব্যাথা মুক্তিতে আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি অপেক্ষা প্রাচীন চীনের আকুপাংচার অনেক বেশি কার্যকর।

৩. সফলতার জন্য সমাজের সমর্থন দরকার

প্রচলিত বৌদ্ধ মতাদর্শ মতে, সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস করাটা যেকোনো সুখ অর্জনে এবং জীবনের আকঙ্খা পূরণে চাবিকাঠির কাজ করে। ২০১০ সালে বার্মিংহাম ইয়ং ইউনিভার্সিটি এবং ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ক্যারোলিনার গবেষকরা এই বৌদ্ধ মতাদর্শকে সম্পূর্ণ সত্য বলে মত দিয়েছেন। তা ছাড়া দীর্ঘ জীবনের জন্যেও এই মতাদর্শ কার্যকর বলে মত দিয়েছেন তারা।
মোট ১৪৮টি গবেষণার মাধ্যমে ৩ লাখ মানুষের ওপর পরীক্ষা চালানো হয়। এতে দেখা যায়, সামাজিক যোগাযোগ যারা রক্ষা করে চলেন তাদের শতকরা ৫০ ভাগ দীর্ঘজীবন লাভ করেন।

৪. 'তাই চি' স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী

প্রাচীন চীনের এই মার্শাল আর্টের উদ্ভব হয় মানুষের মানসিক এবং দৈহিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য। এর মাধ্যমে শান্তি এবং স্থিরতা অর্জন করা যায় যা প্রাকৃতিকভাবে দীর্ঘজীবন দেয়। ২০০৯-এর মে মাসে হার্ভার্ড ওমেনস হেলথ ওয়াচ এক গবেষণা দেখায়, 'তাই চি' এক ধরনের চলমান মেডিটেশন অর্থাৎ দেহের নড়াচড়ার মাধ্যমে ধ্যানের একটি প্রক্রিয়া। এর মাধ্যমে বয়সের কারণে যেসব রোগের উদ্ভব ঘটে সেসব ক্ষেত্রে খুব কাজ দেয়। এর মাধ্যমে আরথ্রাইটিস এবং হৃদরোগীরা অনেক উপকার পেয়েছেন।

৫. মেডিটেশনে মানসিক চাপ মুক্তি ও সুখের আগমন

পৃথিবীর পূর্ব অংশের আবিষ্কার এই মেডিটেশন বা ধ্যান। এর মাধ্যমে মনের শান্তি ফিরে আসে এবং মানসিক চাপ সংক্রান্ত সমস্যা দূর হয়ে যায়। মেডিটেশন নিয়ে সর্বসাম্প্রতিক গবেষণাটি করেছে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল বিজ্ঞানী। তারা দেখেছেন, মেডিটেশনের মাধ্যমে কীভাবে মানব দেহের জিনে প্রভাব পড়ে এবং এর মাধ্যমে মানসিক চাপের মাত্রা কমে আসে এবং বিপাকীয় সমস্যা দূরীভুত হয়।
হার্ভার্ডের মনোবিজ্ঞানী জন ডেনিজার এবং তার দল নিউরো-ইমেজ এবং জেনোমিক্স প্রযুক্তির মাধ্যমে মেডিটেশনের ফলাফল নিখুঁতভাবে দেখা হয়। দেখা গেছে, মেডিটেশন এবং ইয়োগা বা যোগ ব্যায়ামের ফলে দেহের ক্ষুদ্র কোষে শক্তির যোগানদাতা মাইটোকনড্রিয়ার শক্তি উৎপাদনের ক্ষমতা ও এর ব্যবহার এবং স্থিতিস্থাপকতা দারুণভাবে প্রভাবিত হয়।

৬. সমবেদনা অর্থবহ জীবনের চাবিকাঠি

তিব্বতীয় বৌদ্ধদের মধ্যে একটি বিশেষ বিষয়ের চর্চা রয়েছে যাকে বলে 'মিত্তা'। একে ভালোবাসা-দয়ার সমার্থক বলা যায়। ২০১২ সালে ইমোরি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, সমবেদনার এই চর্চা মানুষের মানসিক উন্নতি সাধন করে যা তাদের চেহারায় ফুটে ওঠে।
ভালোবাস-দয়াশীলতা কেন্দ্রীক মেডিটেশন নিয়ে ২০১১ সালের আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, এতে মন গভীর মানসিক শান্তি খুঁজে নিতে সমর্থ হয়, জীবনের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নির্দিষ্ট করে নিতে সহজ হয় এবং স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটে।

৭. অপরিবর্তনীয় বিষয় মেনে নিলে যন্ত্রণা কমে

এটিও একটি বৌদ্ধ মতবাদ। যা আপনার দ্বারা পরিবর্তন করা সম্ভব নয়, তাকে মেনে নিলে মনের যন্ত্রণা-কষ্ট লাঘব হয়।
অস্ট্রেলিয়ার ডিয়াকিন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা দেখেছেন, যাদের দ্বারা যা পরিবর্তন সম্ভব নয় অথবা অন্যভাবে বললে, যা করা আপনার সাধ্যের বাইরে তা মেনে নিলে অনেক কষ্ট কমে যায় এবং এক ধরনের সুখ আসে। এই গবেষণা প্রতিবেদনটি 'জার্নাল অব হ্যাপিনেস স্টাডিজ'-এ প্রকাশ পায় গত বছর। সমাজে দায়িত্বশীলতা নিয়ে বসবাস করছেন এমন মানুষদের এ পরীক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এদের প্রত্যেকে তাদের সামর্থহীনতা মেনে নেওয়ার পর দেখা গেছে, তারা অসম্ভবকে গ্রহণ করতে শিখেছেন এবং এতে তাদের মানসিক শান্তি বেড়ে গেছে।

৮. প্রয়োজন শুধু ভালোবাসা

প্রাচীন সব চিন্তাধারার মধ্যে অন্যতম একটি বিষয় হলো- ভালোবাসা। মানুষ মানুষের ভালোবাসা পেলে সে সুখী হয়, জীবনকে উপভোগ করে এবং জীবন তার কাছে অর্থবহ হয়ে ওঠে।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী জর্জ ভিলান্ট একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৬৮ জন ছাত্রের জীবন নিয়ে ও গবেষণা চালিয়েছেন। তার গবেষণার একটি সার্বজনীন প্রশ্নই ছিলো। তা হলো- জীবনের সুখ অর্জনের জন্য উন্নতি, মূল্যায়ন, মূল্যবোধ এবং উদ্দেশ্য কেমন ও কী হওয়া উচিত? এ গবেষণায় সবচেয়ে যে বিষয়টি প্রয়োজনীয় হয়ে উঠে এসেছে তা হলো 'ভালোবাসা'। মানুষের জীবন অন্য মানুষদের কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়।
জর্জ ভিলান্টের মতে, সুখের দুটি খুঁটি রয়েছে। একটি ভালোবাসা। অপরটি হলো, জীবনের সঙ্গে মানানসই একটি পথ বের করা যা ভালোবাসাকে দূরে ঠেলে দেয় না।

সূত্র : হাফিংটন পোস্ট

Additional Info

  • Image: Image