২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ৯ আশ্বিন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ রবিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭ইংরেজী
সোমবার, 27 জানুয়ারী 2014 02:04

বৌদ্ধধর্ম মতে প্রাকৃতিক বিপর্যয় বা ট্রেজেডী

লিখেছেনঃ বিজয় কুমার বড়ুয়া

বৌদ্ধধর্ম মতে প্রাকৃতিক বিপর্যয় বা ট্রেজেডী
মূল (ইংরেজী)-ড. কে শ্রী ধম্মানন্দ
অনুবাদ-বিজয় কুমার বড়ুয়া, এম, কম, এমবিএ (যুক্তরাজ্য)

২০০৪ সনের ডিসেম্বরে ভারত মহাসাগরের তীরবর্তী দেশসমূহে এশিয় সুনামী ট্রেজেডী যে আঘাত আনে তার মাধ্যমে বিভিন্নভাবে অনেকে এ ধরনের বিপর্যয়ের কারণ খুঁজতে গিয়ে প্রশ্ন করেছে পৃথিবীতে মানুষের সকল দুষ্কর্মের শাস্তি হিসেবে সৃষ্টিকর্তার অসন্তুষ্টির ফলে সংঘটিত হয়েছে কিনা?
কতিপয় বর্হিশক্তি এ ধরনের ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির কারণ হিসেবে মতামত প্রকাশ করার পূর্বে আমাদেরকে অবশ্যই অস্তিত্বের বিশেষ করে মানুষের অস্তিত্বের স্বরূপ সম্পর্কে শিক্ষা নিতে হবে।
মানুষ শব্দটি সংস্কৃত শব্দ ‘মন্যুসস’ থেকে উদ্ভব হয়েছে যার অর্থ হলো মানব সমাজ। মন্যুসস শব্দটির উৎস হলো মন। অস্তিত্বের বিভিন্ন ক্ষেত্রের মধ্যে মানব সমাজের মধ্য থেকেই বুদ্ধ হওয়ার সুযোগ লাভ করতে পারে। মানুষের মধ্যে বুদ্ধি ও প্রজ্ঞা আছে বলেই তারা তাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে, কিভাবে এবং কেন তারা এ পৃথিবীতে জন্ম নিয়েছে এবং জীবনের অর্থ সম্পর্কে প্রশ্ন করার সুযোগ পায়। এ ধরনের বুদ্ধি ও প্রজ্ঞার ব্যবহারের মাধ্যমে মানব সমাজ জীবনের স্বরূপ সম্পর্কে, জীবনের ভিত্তি সম্পর্কে অর্ন্তদৃষ্টি ও জ্ঞানের উন্মেষ ঘটাতে পারে। এ ধরনের অনুসন্ধানের মাধ্যমে বুদ্ধের এই যে জীব জগৎ এবং বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের অস্তিত্বই হলো উপাদান ও শক্তি।
উপাদানগুলো হলো- মাটি, বায়ু, পানি এবং তাপ, যা প্রাকৃতিক, বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ও সৌর জগতের- নিয়মানুসারে পরিচালিত এবং অবিরত জন্ম, বৃদ্ধি, ক্ষয় এবং অদৃশ্য হওয়ার চক্রে আবর্তিত। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের জীবন্ত এবং প্রাণহীন বস্তুসমূহ বুদ্ধিবৃত্তিক ও ভৌত উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত যা প্রাকৃতিক নিয়মে পরিচালিত।
বুদ্ধ পাঁচটি প্রাকৃতিক শক্তির কথা বলেছেন। প্রথমটি হলো তাপ বা শক্তি। শক্তি-উষ্ণতা এবং শীতলতা হিসেবে দেহ ও পরিবেশে অনেক পরিবর্তন ঘটায়। ইহা ফ্লাস্কের সাথে তুলনীয়  নিয়ত পরিবর্তনশীল ও সুসম অবস্থা বিরাজমান। এটাই নিয়ম যা শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণ করে, যেমন বৃদ্ধবয়সে এবং রুগ্ন অবস্থায়। জলবায়ুর ক্ষেত্রে শক্তি আবহাওয়া, ঋতু এবং পৃথিবীর গতি পরিবর্তন করে।
বুদ্ধ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেছেন যে শক্তি প্রয়োগ শুধুমাত্র ভৌগলিক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নহে, সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ইহা প্রত্যেক গ্রহ এবং সৌরজগতের জড় ও অজড় পদার্থকে প্রভাবিত করে। এ সকল উপাদান পরিবর্তনশীল এবং সময়ে সময়ে ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে।
এমনকি জীবন, মানব জীবন ও পৃথিবী প্রাকৃতিক নিয়মে পরিচালিত। তারা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, অদৃশ্য হয় এবং পুন: পুন: জন্মগ্রহণ করে অশেষ সৌরজাগতিক চক্রের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। সময়ে সময়ে দুর্যোগ ঘটে কারণ মৌলিক উপাদান সমূহ যেমন পানি, মাটি, বায়ু এবং অগ্নি সত্ত পরিবর্তনশীল এবং সুষম অবস্থানে বিরাজমান। তজ্জন্যই বুদ্ধ বলেছেন যে মানব জীবন দু:খময়। কারণ সব সময় পরিবর্তনশীল, সামাজিক অবস্থান ও প্রজাতি নির্বিশেষে সার্বজনীন কারণে প্রত্যেক প্রাণীই দু:খ ভোগ করে। বুদ্ধের শিক্ষা এই যে আমরা নিজেরাই নিজেদের ভাগ্য নিয়ন্তা এবং মানুষ হিসেবে আমরা পরিনামে আমাদের কর্মশক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। প্রত্যেক কিছুই কর্ম নির্ভর, বৌদ্ধরা তা বিশ্বাস করে না। তারা অন্যান্য প্রাকৃতিক শক্তিকে অবজ্ঞা করে না। দেখা যাচ্ছে যে কর্ম প্রাকৃতিক শক্তির অন্যতম উপাদান হিসেবে পরিলক্ষিত হয়। ইহা সহজেই অনুমেয় যে জীবনের সকল কার্যক্রম কর্ম নির্ভর নহে।

প্রাকৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন উপাদান আমাদেরকে বুঝতে সাহায্য ও মনস্তাত্ত্বিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন উপাদান আমাদেরকে বুঝতে সাহায্য করে কিভবে একটি ঘটনা একাধিক কারণের ফলে ঘটতে পারে। কিভাবে বিভিন্ন ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য বস্তুকে সমকালীন ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। সাধারণত একাধিক নীতির কার্যকারিতার মধ্যে অধিকতর জোড়ালোটি বহাল থাকবে।
উদাহরনস্বরূপ অতি উষ্ণ তাপমাত্রা মানসিক অবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে এবং অস্বস্থি অনুভব করতে পারে না। প্রবল ইচ্ছাশক্তি সাময়িকভাবে প্রতিকূল পরিবেশের প্রভাব ও কর্মফলকে অগ্রাহ্য করতে পারে। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে মৃত্তিকা ও পানির গতিবিধির বিপর্যয়কারী শক্তির নিকট কর্মশক্তি যেমন ভূমিকম্প ও সুনামী অকার্যকর হয়ে পড়ে। এশিয়ান সুনামী বিপর্যয়ের মহাপ্লাবন প্রাকৃতিক শক্তির কাছে কর্মফলের পরাজয়ের একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
বিধ্বংসী সুনামীর ফলে দোষগুণ নির্বিশেষে লক্ষাধিক লোকের মৃত্যু হয়েছে। ভাল ও খারাপ কর্মের অধীন সকলে সমভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। কেউ এবং কিছুই এ ধরনের শক্তি থেকে পরিত্রাণ পেতে পারে না যা অচিরস্থায়ীকে চিরস্থায়ী বলে মনে করে। বৌদ্ধধর্মের ভিত্তি এই চিরন্তন সত্যের উপর প্রতিষ্টিত। এ ধরনের জ্ঞানের সাথে ঘনিষ্ট ধীশক্তির বলে স্থিরচিত্তে বুঝতে পারবে যা পরিবর্তন যোগ্য নহে এবং তাদের প্রকৃত কর্মশক্তিকে অধিকতর সৃজনশীল ও আধ্যাত্মিক কাজে ব্যবহারে সমর্থ হবে।
এ ধরনের অনবরত পরিবর্তনের সাথে বাঁচার উপায় হিসেবে মানব সমাজকে সহানুভূতিশীল ও দয়াপরবশ হওয়া উচিত। শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করা প্রকৃতিকে জয় করা বুঝায় না। তা প্রকৃতি শক্তিকে গভীরভাবে অনুধাবন ও কৃতজ্ঞতাবোধকে বুঝায়। বিধ্বংসী সুনামী ফলে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের জন্য প্রাকৃতিক শক্তিকে দোষারোপ করার ভ্রমাতœক ধারণার ইহাই যথার্থ কারণ। কাউকে ও কোন কিছুকে দোষারোপ করার নেই।
ঈশ্বরের কাজকে যুক্তিবাদী করে তোলার কোন প্রয়োজন নেই। কারণ সুনামীর ধ্বংসযজ্ঞই প্রাকৃতিক শক্তি নিচয়ের অচিরস্থায়ী তাই স্পষ্টভাবে প্রদর্শিত হয়েছে। ইহা সম্পূর্ণরূপে প্রকৃতির শক্তি তাদের ক্ষণস্থায়ীত্ব ও অহমিকাবাদ সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রসারিত করেছে। এই কারনেই আমাদেরকে পার্থিব বিষয় তীব্র আকাঙ্খা জাগ্রত না করার শিক্ষা নেয়া দরকার। আমাদের ভৌত অবস্থা ও পরিবেশ সম্পর্কে আসক্তি আমাদেরকে অধিকতর দু:খকষ্টে নিপতিত করবে। কারণ ভবিষ্যতে পূর্ণজন্মের ফলে আমাদেরকে প্রাকৃতিক শক্তির অভাবনীয় দুর্যোগের শিকার হতে হবে। এমনকি এটাকে আমরা মুক্তির পথ হিসেবে গ্রহণ করতে পারি। প্রতিরূপ দেশে (মঙ্গল সূত্র) পূর্ণজন্মের জন্য কঠোর চেষ্টা করতে পারি যা প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে সৃষ্ট দু:খকষ্ট থেকে মুক্ত। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও আমাদেরকে সময়মত মনে করিয়ে দিচ্ছে আমরা কিভাবে বসবাস করছি তা পুনরায় পরীক্ষা করে দেখা এবং প্রকৃতির সাথে আমাদের সম্পর্ক পূর্ণ-মূল্যায়ন করা। মূল প্রতিপদ সূত্রের কারণে দেহ ও মনের পারস্পরিক মিতক্রিয়তা ও নির্ভরযোগ্যতা পরিলক্ষিত হয়।
আমরা যা চিন্তা করি, বলি এবং করি তার একটি সুদূর প্রসারী ফল আমাদের বর্তমান শারীরিক অবস্থার উপর পড়ে। আমরা যদি মাটিকে বিষাক্ত করি এর ফলাফল হিসেবে দূষিত পানির মাধ্যমে আমরা আক্রান্ত হবো। আমাদের বুদ্ধিমত্তার শ্রেষ্ঠত্বের কারণে আমরা যদি সব সময় প্রকৃতিকে জয় করার চেষ্টায় রত থাকি তা হলে আমাদেরকে অবশ্যই প্রকৃতির গভীর ক্রোধের সম্মুখীন হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদেরকে চিরন্তন সত্য ও মিথ্যাচার সম্পর্কে আগ্রহী হওয়ার জন্য স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। ইহা সত্য যে এ সময়ে এবং কালে অতি উন্নয়নের ফলে পরিবেশ ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছে। সমীক্ষায় দেখা যায় এখনও যদি শ্রীলংকার উপকূলের প্রবল প্রাচীর অক্ষত থাকত, তা হলে সমুদ্রের ঢেউয়ের আঘাত থেকে উপকূলকে রক্ষায় সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারত। ভারতীয় উপকূলীয় এলাকায় জলাভূমি ও ম্যানগ্রোভের অস্তিত্বের ফলে সূস্পষ্টই প্রমাণিত হয়েছে যে উক্ত প্রাকৃতিক উপাদান বড় ধরনের দুর্যোগ মোকাবেলায় সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।
আজকে সমাজে সংযতভাবে জীবন যাপনকে দারিদ্রের কাছে নতি স্বীকার বুঝায় না। প্রাকৃতিক পরিবেশের সাথে শান্তিতে বসবাস করার সামর্থ এবং সচেতনতাকে বুঝায়।
ইন্দ্রিয় পরিতৃপ্তির সহায়তার জন্য প্রকৃতি ধ্বংস এবং কৃত্রিম পরিবেশ সৃষ্টি করাকে বুঝায় না। সংযতভাবে জীবন যাপন, একে অন্যের প্রতি দয়াপরাবশ এবং সহানুভূতিশীল হওয়ার জন্য উৎসাহিত করে। যাতে মানসিক গুণাবলী ভোগের সামগ্রীর চেয়ে শ্রেয় হয়।
পৃথিবী যখন বিপদগ্রস্থদের জন্য দু:খ প্রকাশ করে আমাদের উচিত বিদেহী আত্মার শান্তির জন্য সহানুভূতিশীল হওয়্ াবিভিন্ন উপায়ে আমরা তা করতে পারি। প্রথমত: আমরা উদ্ধার কাজে নিজেদের নিয়োজিত করার মাধ্যমে গুণ অর্জন করতে পারি। সুতরাং যারা কষ্টভোগ করছে আমরা তাদেরকে প্রত্যক্ষভাবে সাহায্য করতে পারি। দ্বিতীয়ত: যারা পরলোক গমন করেছে তাদের বিদেহী আত্মার উত্তম পূর্নজন্ম আমরা মানসিক আলো বিকীর্ণ করতে পারি। তৃতীয়ত: এ মুহুর্তে যারা উদ্ধারকর্মী হিসেবে বিপদগ্রস্থদের সাহাযার্থে সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় নিয়োজিত তাদের প্রতি আমরা দয়াপরবশ হওয়া উচিত।
আমরা সকলেই জাগ্রত হতে শিখি এবং প্রকৃতির কর্মকাণ্ড ও আমাদের মধ্যে অধিকতর সংবেদনশীল হওয়া উচিত। যাতে আমরা নিজেদের মধ্যে প্রকৃতি ও  বিশ্বব্রহ্মণ্ডের মধ্যে শান্তিতে বসবাস করতে পারি।

অনুবাদক-সাবেক অতিরিক্ত মহা-পরিচালক, বার্ড, কুমিল্লা ও উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য, বাংলাদেশ বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘ, ঢাকা।