২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ৯ আশ্বিন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ রবিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭ইংরেজী
শুক্রবার, 14 নভেম্বর 2014 03:39

কালের ভাবোদয়

লিখেছেনঃ উজ্জ্বল বড়ুয়া বাসু

কালের ভাবোদয়

শ্রাবস্তীতে জেতবন বিহার নির্মাণের পর থেকেই অনাথপিন্ডিক শ্রেষ্ঠীর সুনাম চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ধার্মিক ও দানবীর হিসেবে তার সুখ্যাতি প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল। শ্রাবস্তীর আবাল, বৃদ্ধ, বণিতা তার গুণকীর্তন করত। এত কিছু সত্ত্বেও অনাথপিন্ডিকের মনে পরিপূর্ণ শান্তি ছিলনা, কারণ একটাই তার পুত্র কাল।

বিপথগামী পুত্রকে নিয়ে কাল সদা বিব্রত ছিল। পুত্রের অসংগত আচরণে তিনি ক্ষোভে, অপমানে, ম্রিয়মান হতেন বটে, কিন্তু পুত্রকে শাসন করা তার সাধ্যাতীত ছিল। এসব থেকে পরিত্রাণ পেতে চিন্তা করতে করতে তার মনে এল তথাগত বুদ্ধের কথা। তিনিই পারবেন আমার সন্তানকে সুপথে আনতে।

তথাগত সে সময় জেতবন বিহারে অবস্থান করতেন। আর সাধারণ গৃহীরা অমাবস্যা, পূর্ণিমা, অষ্টমী তিথিতে অষ্টশীল গ্রহণ করে তথাগতের নিকট সদ্ধর্মদেশনা শ্রবণ করতেন।
অনাথপিন্ডিক মনে মনে ভাবতে লাগলেন আমার সন্তানকে যদি শীল গ্রহণ করাতে পারি, বুদ্ধের সদ্ধর্মসুধা পান করাতে পারি তবে আমার কাল অবশ্যই নিজেকে সুপথে পরিচালিত করবে। এই ভেবে অনাথপিন্ডিক কালকে ডেকে উপোসথদিনে অষ্টশীল গ্রহণ করে অন্যান্য গৃহীদের সাথে জেতবনে রাত কাটানোর উপদেশ দিলেন।প্রত্যুত্তরে কাল মুখের উপর পিতাকে বলে দিলেন ওসব শীল পালন আমার দ্বারা হবেনা বাবা।

শ্রেষ্ঠী ছেলেকে বিহারে নিয়ে যেতে নতুন লোভনীয় প্রস্তাব দিলেন- বললেন যদি তুমি বিহারে দাও তবে তোমায় আমি কাহন(বর্তমানে টাকা) দেব। এবার ছেলে আগ্রহভরে বললেন কয় কাহন দেবে বাবা?পিতা বললেন একশ কাহন দেব। পুত্র রাজী হয়ে গেলেন এবং পরবর্তী উপোসথ দিবসে নামে মাত্র অষ্টশীল গ্রহণ করে ধর্মসভায় না গিয়ে বিহারের এক কোণায় ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে রাত কাটালেন। পরদিন এসেই পিতার কাছ থেকে একশ কাহন নিলেন।
এবার পিতা দিলেন নতুন প্রস্তাব। যদি পরবর্তী উপোসথ দিবসে বুদ্ধের একটি মাত্র উপদেশ শুনে যথাযথ ভাবে শিখে আসতে পারে তবে এইবার দেবে সহস্র কাহন।

ছেলে আরো বেশী খুশী হয়ে গেলেন সহস্র কাহনের প্রস্তাব পেয়ে। এবার পরবর্তী উপোসথ দিবসে এক কোণায় নিভৃতে বসলেন কাল সহস্র কাহনের আশায়।মন দিয়ে বুদ্ধের দেশনা শুনা শুরু করলেন। বুদ্ধ যেন তার মনের কথা গুলো বলে দিচ্ছেন, বুদ্ধের প্রতি তার জাগল অকুন্ঠ ভক্তি, শ্রদ্ধা। যেন লাভ করল নতুন জীবন।

পরদিন বুদ্ধ অনাথপিন্ডিকের বাড়ীতে ভিক্ষা গ্রহণের জন্য এলেন, পিছন পিছন এল কাল। পুত্রের ভাবান্তর দেখে অনাথপিন্ডিক অবাক হলেন। এদিকে পুত্র মনে মনে ভাবছে পিতা যেন সহস্র কাহনের প্রতিশ্রুতির কথা বুদ্ধের সামনে প্রকাশ না করেন।

যেখানে বাঘের ভয়, সেখানে সন্ধ্যা হয়, পিতা কাহনের প্রতিশ্রুতির কথা কিছুই বললেন না, কিন্তু সহস্র কাহনের এক তোড়া বুদ্ধের সামনেই পুত্রকে দিলেন। পুত্র লজ্জায় মাথা নত করলো। ছুয়েও দেখলনা সেই তোড়া।
তখন বুদ্ধ বললেন- শ্রেষ্ঠী, এই কাহনের তোড়া কেন তোমার সমস্ত সম্পদও সে আজ চায় না। অতঃপর বুদ্ধ ভাবোচ্ছাসে গাথায় বললেন- পৃথিবীর একচ্ছত্র রাজত্ব, স্বর্গীয় সুখ এবং সমগ্র ত্রিভুবনের আধিপত্যের চেয়ে ধর্ম স্রোতে অবগাহনই শ্রেষ্ঠ।

প্রিয় পাঠক, আমাদের তেমন সংস্কার ছিলনা বলেই আমরা তথাগতের অমিয় প্রেমের মন্ত্র শুনার সুযোগ পাইনি। পেলে হয়তো তাঁর সদ্ধর্ম শ্রবণ করে এক ধর্মসভাতেই আমরা স্রোতাপত্তি ফল লাভ করতাম। দুঃখ মুক্তির পথ পেয়ে যেতাম। বুদ্ধের দর্শন না পেলেও আমরা ভাগ্যবান যে, আমরা দূর্লভ মনুষ্য জীবন লাভ করেছি। আসুন এই দূর্লভ জীবনের সার্থকতা নিরুপণ করি মৃত্যুর পূর্বে যেন অন্ততঃ দৃষ্টিমুক্ত স্রোতাপত্তি ফল লাভ করতে পারি।
সমাজের হাজারো দ্বন্ধ ভুলে গিয়ে মুক্তি লাভের পথে হেটে অভিষ্ঠ লক্ষে পৌছাই হোক আমাদের একমাত্র চাওয়া।

Courtesy: Soshanvumi Meditation Practiciing Center.Karaiyanagor

Additional Info

  • Image: Image