২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ৯ আষাঢ় ১৪২৪ বঙ্গাব্দ শুক্রবার, ২৩ জুন ২০১৭ইংরেজী
শুক্রবার, 07 নভেম্বর 2014 14:00

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং ধর্মীয় উৎসবের দেশ: বাংলাদেশ

লিখেছেনঃ স্থিতধী বড়ুয়া

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং ধর্মীয় উৎসবের দেশ: বাংলাদেশ

১৯৭১ইং সনের ১৬ ডিসেম্বর মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ বাংলাদেশে এ বছর অর্থাৎ ২০১৪ইং সনের অক্টোবর মাসে হিন্দুদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব সার্বজনীন শারদীয় দুর্গাপূজা, মুসলমানদের দ্বিতীয় বৃহত্তম পবিত্র ধর্মীয় উৎসব ঈদ-উল-আযহা এবং বৌদ্ধদের পবিত্র ধর্মীয় উৎসব প্রবারণা পূর্ণিমা সারা বাংলাদেশব্যাপী পরম ধর্মীয় ভাবগম্ভীর এবং আনন্দঘন পরিবেশে উদ্যাপিত হয়। হিন্দু সম্প্রদায়ের লক্ষ্মী পূজা এবং কালী পূজাও এ মাসে উদ্যাপিত হয়। একই মাসে ৩টি বৃহৎ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের এতগুলো উৎসব অনুষ্ঠিত হওয়ার নজীর আছে বলে আমার মনে হয় না।

১লা অক্টোবর হতে ৩রা অক্টোবর পর্যন্ত সারা বাংলাদেশব্যাপী ২ হাজারের উপর পূজা মণ্ডপে জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশে সার্বজনীন দুর্গোৎসব অনুষ্ঠিত হয় এবং ৪ঠা অক্টোবর বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মাধ্যমে পূজা শেষ হয়। হিন্দু ধর্মীয় বিধান মতে দুর্গতিনাশিনী, দুর্গেশনন্দিনী, মহামায়া দুর্গাদেবীর এবার ভক্তদের বোধনের মাধ্যমে আহবানে নৌকা যোগে কৈলাস হতে ধরাধামে আগমন ঘটে এবং দোলায় চড়ে বিজয়া দশমীতে ভক্তদের চোখের জলে ভাসিয়ে কৈলাসে স্বামী গৃহে ফিরে যান। নৌকায় আগমনের কারণে ধর্মীয় বিশ্বাস মতে এবার পৃথিবী সুজলা সুফলা হয়ে উঠবে। অপরদিকে দোলায় ফিরে যাওয়ার কারণে এবার ঝড়-বৃষ্টি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগেরও যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। শারদীয় দুর্গাপূজা একটি ব্যয়বহুল অনুষ্ঠান বিধায় একসময় রাজা-মহারাজা, জমিদার, জোতদার এবং সম্পদশালী ব্যক্তি ছাড়া এ ব্যয়বহুল অনুষ্ঠান সাধারণ জনগণ করতে সাহস করত না। বলতে দ্বিধা নেই যে, নিম্নবর্ণের হিন্দুরা ছাড়াও অনেকের পক্ষে এ ব্যয়বহুল অনুষ্ঠান করার অধিকার তখন ছিল না বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। সময়ের বিবর্তনে এখন অনেক কিছুর পরিবর্তনের সাথে সাথে এ পূজা এখন বৃহত্তর পরিবেশে সার্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে।

৫ অক্টোবরের পরের দিন অর্থাৎ ৬ অক্টোবর এদেশের মুসলমান সম্প্রদায়সহ সারা বিশ্বের মুসলমানরা সর্বোচ্চ ত্যাগের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব ঈদ-উল আযহা পালন করেন। এ দিন পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ ও ভেদাভেদ ভুলে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে কোলাকুলির মাধ্যমে সবাই কুশল বিনিময় করেন। আজ থেকে আনুমানিক চার হাজার বছরেরও আগে সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহতায়ালা প্রিয় নবী হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর আনুগত্য পরীক্ষার জন্য তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বস্তুকে কোরবানী দিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। স্বীয় পুত্র হযরত ইসমাঈল (আঃ) প্রিয় নবী হযরত ইব্রাহীমের (আঃ) সবচেয়ে প্রিয় হওয়া সত্ত্বেও এ কঠিন অগ্নি পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে তিনি মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশ মান্য করার জন্য হযরত ইব্রাহীম (আঃ) বিনা দ্বিধায় স্বীয় পুত্রকে কোরবানী দিতে উদ্যত হলে পরম করুণাময় আল্লাহর নির্দেশে কোরবানী স্থলে হযরত ইসমাঈলের (আঃ) পরিবর্তে একটি দুম্ভা কোরবানী হয়ে যায়। এ প্রতীকি ঘটনার অন্তর্নিহিত অর্থ স্রষ্টার প্রতি বান্দার পরম আনুগত্য এবং ত্যাগ স্বীকার। মানুষের মনের রিপু, কাম, ক্রোধ, মোহ, লোভ, লালসা, পরনিন্দা ও পরশ্রীকাতরতাকে বিসর্জন দেওয়া কোরবানীর চরম শিক্ষা। এ দিন দুস্থদের মাঝে দান-খয়রাতের মাধ্যমে মুসলমানরা নিজেরা তৃপ্তি লাভ করেন এবং অন্যকে তৃপ্ত করেন। ঈদের নামাজের পর এদেশে এ কোলাকুলি এবং কুশল বিনিময় নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের সাথে ভাগাভাগি করে নেয়।

মুসলমান সম্প্রদায়ের ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত ধর্মীয় উৎসব ঈদ উল আযহার পরদিন অর্থাৎ ৭ অক্টোবর বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব প্রবারণা পূর্ণিমা অর্থাৎ আশ্বিনী পূর্ণিমা বাংলাদেশের সব বৌদ্ধ বিহারে আনন্দঘন এবং ধর্মীয় পরিবেশে পালিত হয়। বৌদ্ধ ধর্মীয় বিধান মতে প্রতিটি বৌদ্ধ বিহারে আষাঢ়ী পূর্ণিমার তিথি হতে আশ্বিনী পূর্ণিমা পর্যন্ত এ তিন মাস বিহারের আবাসিক ভিক্ষুরা ধ্যান ও ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান অনুশীলনের মাধ্যমে বর্ষাব্রত পালন করেন। তিন মাস বর্ষাব্রত পালনের পর আশ্বিনী পূর্ণিমা তিথিতে প্রতিটি বৌদ্ধ বিহারে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অন্যান্য বৌদ্ধ রাষ্ট্রে প্রবারণা পূর্ণিমা পরম ধর্মীয় ভারগম্ভীর পরিবেশে পালিত হয়। প্রবারণা পূর্ণিমার সময় প্রতিটি বৌদ্ধ বিহারে সন্ধ্যার পর সবার মঙ্গলার্থে শান্তির প্রতীক হিসেবে ফানুস উড়ানো হয়। তাছাড়াও এর মাধ্যমে ভগবান তথাগত বুদ্ধের চুল ধাতুর পূজা করা হয়। প্রবারণা পূর্ণিমার পরদিন হতে কার্তিক পূর্ণিমা পর্যন্ত একমাস বাংলাদেশসহ অন্যান্য বৌদ্ধ রাষ্ট্রে প্রতিটি বৌদ্ধ বিহারে কঠিন চীবর দান উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। এ বছর কঠিন চীবর দান উৎসব ৮ অক্টোবর শুরু হয় এবং নভেম্বর মাসের ৬ তারিখ পর্যন্ত এ উৎসব চলে। প্রবারণা পূর্ণিমা এবং কঠিন চীবর দান উৎসব এখন আর বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এ উৎসব এদেশে এখন সার্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা প্রবারণা পূর্ণিমা এবং কঠিন চীবর দানের সময় ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান বাদে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের সাথে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে একাত্মতা প্রকাশের এমন নজির অন্যত্র খুঁজে পাওয়া মুসকিল। বিশেষ করে প্রতিটি বৌদ্ধ বিহারে ফানুস উড়ানোর সময় সহযোগিতা ও সহমর্মিতা প্রকাশের মাধ্যমে তারাও আনন্দ উপভোগ করে। আশ্বিনী পূর্ণিমা তিথিতেই বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায় সর্বত্র সন্ধ্যার সময় পূজা অর্চনার মাধ্যমে লক্ষ্মী পূজা করে ধনদেবী দেবীর কাছে অর্থ ও ধনসম্পদ লাভের জন্য প্রার্থনা করেন।

২৩ অক্টোবর সমগ্র বাংলাদেশে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের আর একটি অন্যতম ধর্মীয় উৎসব শ্রী শ্রী শ্যামা পূজা অনুষ্ঠিত হয়। ঐদিন সন্ধ্যার পর হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রায় প্রতিটি বসত বাড়িতে মোমবাতি জ্বালিয়ে দীপাবলী অনুষ্ঠান পালিত হয়। দুর্গাপূজার প্রতিমা বিসর্জনের পরবর্তী অমাবস্যার রাতেই দীপাবলী অনুষ্ঠান পালিত হয়। অমাবস্যা তিথিতে দিপাবলীর রাতে দেবী কালীর পুজোর আয়োজন এবং এর মাধ্যমে ভক্তরা দেবীর কাছে কৃপা প্রার্থনা করেন। দেবী কালী-দেবী দূর্গা অর্থাৎ পার্বতীর ভিন্ন রুপ। দুর্গা থেকে কালীর সৃষ্টি। হিন্দু শাস্ত্র মতে কালী শক্তি, শৌর্য্য বীর্য এবং তেজের দেবী। মা কালী শ্যামা নামেও পরিচিত। ছোটবেলার একটি স্মৃতির কথা উল্লেখ না করে পারছিনা। আমাদের এলাকায় তখন দীপাবলী রাতে প্রত্যেক বাসা বাড়িতে সন্ধ্যার পর মোমবাতি জ্বালাতাম। আধুনিকতার ছোঁয়ায় এখন আর এ দৃশ্য চোখে না পড়লেও এখন দীপাবলীর রাতে বাজি পোড়ানো এবং নানা অনুষ্ঠান আয়োজনে ঘাটতি নেই্। আকাশ সংস্কৃতির এ যুগে আমরা পবিত্র ঈদ উল আযহা, দীপাবলী, প্রবারণা পূর্ণিমা, দুর্গাপূজাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানের প্রচার টেলিভিশনের পর্দায় দেখি ও উপভোগ করি। যেটা আজ থেকে দুই যুগ আগেও কল্পনা করা যেত না।

এখানে উল্লেখ করতে হয় যে, আমরা সাধারণ জনগণ যে যে ধর্মের অনুসারী হই না কেন প্রতিটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে পরস্পরের সাধে ভাবের আদান-প্রদান ও মেলামেশার মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে আনন্দ ভাগাভাগি করে উপভোগ করি। আমরা সাধারণ জনগণ পরস্পর পরস্পরের প্রতি সংবেদনশীল এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করি। এ পরিবেশ যদি আমাদের শ্রদ্ধেয় রজনীতিবিদ যারা দেশ পরিচালনা করেন এবং যারা ভবিষ্যতে দেশ পরিচালনায় আগ্রহী তারা যদি বজায় রাখতে পারতেন তাহলে এ ৪২ বছরে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়ে যেত। আমাদের শ্রদ্ধেয় দুই নেত্রীকে টেলিভিশনের পর্দায় আমরা আলাদা আলাদাভাবে ধর্মীয় উৎসবের সময় শুভেচ্ছা বিনিময় করতে দেখতে পাই। আমাদের দুর্ভাগ্য তাঁদের উভয়কে কোন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে একত্রে শুভেচ্ছা বিনিময় করতে দেখতে পেলাম না। গত ১১ অক্টোবর প্রথম আলোতে কবি, সাংবাদিক সোহরাব হাসান এর “আমাদের আত্মঘাতী গণতন্ত্র” নিবন্ধনটির সাথে ছবিতে দেখা যায় ৩রা অক্টোবর নয়াদিল্লীর সুভাস ময়দানে হিন্দু ধর্মীয় অনুষ্ঠান দশেরা উপলক্ষে আয়োজিত সমাবেশে বিরোধী দলীয় কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, ভারতের উপ-রাষ্ট্রপতি হামিদ আনসারী, রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী একই সাথে পাশাপাশি বসে অশুভ শক্তি রাবণের বধের মাধ্যমে শুভশক্তির বিজয় অনুষ্ঠানটি উপভোগ করেন। আমাদের দেশে কি এটা কখনও কল্পনা করা যায়? আমাদের দেশের নেতা-নেত্রীরা যদি এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারতেন তাহলে আমরা সাধারণ জনগণ নিশ্চিত করে বলতে পারি বাংলাদেশ অতি দ্রুত সর্বক্ষেত্রে এগিয়ে যাবে এতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম এগিয়ে যাওয়ার জন্য এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করা উচিত বলে সাধারণ জনগণ আশা করে।

লেখক : সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (অবঃ)

নরেন্দ্র কুটির, ৪৮ এনায়েত বাজার রোড, চট্টগ্রাম।
সৌজন্যেঃ দৈনিক আজাদী

Additional Info

  • Image: Image