২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ৯ আষাঢ় ১৪২৪ বঙ্গাব্দ শুক্রবার, ২৩ জুন ২০১৭ইংরেজী
মঙ্গলবার, 09 সেপ্টেম্বর 2014 00:21

আত্মোন্নতি ও বিশ্বমৈত্রী কামনায় মৈত্রী ভাবনা অনুশীলন

লিখেছেনঃ নোবেল চৌধুরী প্রজ্ঞা

আত্মোন্নতি ও বিশ্বমৈত্রী কামনায় মৈত্রী ভাবনা অনুশীলন

‘যো চ বস্স সতং জীবে অপসসং উদয়ব্বয়ং,
একাহং জীবতিং সেয়্যা পস্সতং উদয়ব্বয়ং’।

অর্থাৎ ‘স্মৃতিহীন হীনবীর্য হয়ে শত বৎসর বেঁচে থাকার চেয়ে স্মৃতিমান বীর্যবন্ত হয়ে ‘নাম-রুপের’ উদয়-ব্যয় দর্শন করে মুহুর্ত কাল বেঁচে থাকাই শ্রেয়’।

সকল প্রাণীর প্রতি সমভাব এবং বিশ্বজনীন অনুভূতির বিপুল ঔদার্য এবং সাম্য-মৈত্রী-করুণার অমৃতময় বাণীতে সমৃদ্ধ বৌদ্ধধর্ম দেশ-কালের সীমারেখা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্থান করে নিয়েছে অপূর্ব মহিমায়। জীবন ও জগত সম্পর্কে তথাগত বুদ্ধের অহিংসা, সাম্য, মৈত্রী, করুণা এবং আধুনিক চিন্তাচেতনার কারণেই বিশ্বের অধিকাংশ জনগোষ্ঠী বৌদ্ধধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাযুক্তচিত্তে নিজেকে সম্পন্ন করেছিল। মহামানব বুদ্ধ সব সময় চারটি বিষয়ে সর্বাপেক্ষা গুরুত্ব দিয়েছেন তা হল- মৈত্রী, করুণা, মুদিতা ও উপেক্ষা। এ চারমৈত্রী ধ্যানে বুদ্ধ সতত বিরাজমান থাকতেন। ধ্যান-সমাধি বা ভাবনা হলো, মনের কার্যকলাপ উন্নয়নের সচেতন প্রচেষ্টা। পালি ভাষায় ভাবনার অর্থ হল- গড়ে তোলা বা বৃদ্ধি করা। ভাবনা, কর্মস্থান, সমাধি, যোগ ও সাধনা প্রভৃতির শব্দ একার্থ বাচক। এই ভাবনা সাধারণত দুই প্রকার। "সব্বত্থ কম্মট্ঠানং ও পরিহারিয় কম্মট্ঠানং"। (ক) "সব্বত্থ কম্মট্ঠানং" বলতে মৈত্রী ভাবনা, মরণানুস্মৃতি ভাবনা ও অশুভ ভাবনা এবং (খ) "পরিহারিয় কম্মট্ঠানং" বলতে চল্লিশ প্রকার শমথ ভাবনাকেই বুঝায়। নিম্নে মৈত্রী ভাবনা সম্পর্কে আলোকপাত করা হল-

● বাংলায় মৈত্রী ভাবনা:

১) আমি শত্রুহীন হই। বিপদ শূন্য হই। নিরুপদ্রব হই। সুখে আপন জীবন অতিবাহিত করি। আমার ন্যায় আমার আচার্য-উপাধ্যায়গণ, মাতা-পিতা, হিতৈষী, মধ্যস্থ ব্যক্তিগণ, আমার অমঙ্গল কামী ব্যক্তিগণ শত্রু শূন্য হোক, বিপদ শূন্য হোক, নিরুপদ্রব হোক, সুখে স্বাচ্ছন্দ্যে বাস করুক, দুঃখ হতে মুক্তি লাভ করুক, যথালব্ধ সম্পত্তি হতে বঞ্চিত না হোক, সকল প্রাণী নিজ নিজ কর্মাধীন।

২) এই (বিহার হলে) বিহারে, (গৃহ হলে) গৃহে, এই গ্রামোপকণ্ঠে, এই নগরে, এই জনপদে, এই বঙ্গদেশে (যিনি যে প্রদেশে অবস্থান করেন সে প্রদেশের নাম উল্লেখ করে বলতে হবে), এই জম্বুদীপে (প্রাচীন বৃহত্তম ভারতে), এই চক্রবালে যে সব প্রভুত্ব লাভী ব্যক্তি, সীমান্তরক্ষক দেবতা, সমস্ত প্রাণী শত্রু হীন হোক, বিপদ শূন্য হোক, নিরুপদ্রব হোক, সুখে স্বাচ্ছন্দ্যে বাস করুক, দুঃখ হতে মুক্তি লাভ করুক, যথালব্ধ সম্পত্তি হতে বঞ্চিত না হোক, সকল প্রাণী নিজ নিজ কর্মাধীন।

৩) পূর্ব, দক্ষিণ, পশ্চিম ও উত্তর দিকে। পূর্ব, দক্ষিণ, পশ্চিম ও উত্তর কোণে, নিম্ন দিকে, ঊর্দ্ধদিকে সকল সত্ত্ব (পঞ্চস্কন্ধ লাভী), সকল প্রাণী (নিশ্বাস-প্রশ্বাস সম্পন্ন), সকল ভূত, সকল পুদ্গল, সকল দেহধারী, সকল স্ত্রী, সকল পুরুষ, সকল আর্য, সকল অনার্য, সর্ব দেব, সর্ব মনুষ্য, সর্ব অমনুষ্য, সকল বিনিপাতিকা (প্রেত, পিশাচ প্রভৃতি নারকীয় প্রাণী) শত্রু হীন হোক, বিপদ শূন্য হোক, নিরুপদ্রব হোক, সুখে স্বাচ্ছন্দ্যে বাস করুক, দুঃখ হতে মুক্তি লাভ করুক, যথালব্ধ সম্পত্তি হতে বঞ্চিত না হোক, সকল প্রাণী নিজ নিজ কর্মাধীন।

৪-৭) পূর্বদিকে, দক্ষিণদিকে, পশ্চিমদিকে, উত্তরদিকে যে সকল শক্তিশালী দেবগণ আছেন, তাঁরাও আমাকে নিরাময় ও সুখে রক্ষা করুন।

৮) পূর্বদিকে ধৃতরাষ্ট্র দক্ষিণদিকে বিরূড়ক, পশ্চিমদিকে বিরূপাক ও উত্তরদিকে কুবের নামক যে চারিজন যশস্বী লোকপাল মহারাজা আছেন তাঁরাও আমাকে নিরাময় ও সুখে রক্ষা করুন।

উপরোক্ত বিস্তৃত মৈত্রী ভাবনা শিক্ষা করতে না পারলে, নিম্নোক্তরূপে সংক্ষেপে হলেও মৈত্রী ভাবনা শিক্ষা করা আবশ্যক। উল্লেখ্য যে, সর্বদা অর্থসহ মৈত্রী ভাবনা করার মধ্যদিয়ে চিত্তের প্রসন্নতা উৎপাদন এবং মনোজগতের অভাবনীয় উন্নতি সাধনসহ সকল প্রাণীর প্রতি ‘‘মৈত্রী (বিশ্বের সকল প্রাণীর সুখ কামনা করা), করুণা (বিশ্বের সকল প্রাণীর প্রতি দয়া প্রদর্শন করা), মুদিতা (অপরের সুখ, সৌভাগ্য দর্শনে সুখ অনুভব করা তথা মঙ্গল কামনা করা), উপেক্ষা (শত্রু-মিত্রের প্রতি হিংসা, প্রতিহিংসা না করা)’’ ভাব সুদৃঢ় হয়।

১) ‘‘অহং সুখীতো হোমি, নিদুক্খো হোমি’’ আমি সুখী হই, দুঃখ হীন হই।
২) ‘‘অহং সুখী হোমি, অব্যাপজ্জো হোমি, অনীঘো হোমি, সুখী অত্তানং পরিহরামি’’ আমি শত্রুহীন, মানসিক দুঃখহীন, কায়িক-বাচনিক দুঃখহীন হই এবং নিজকে সুখে রক্ষা করি।"
৩) ‘‘সব্বে সত্ত্বা সুখীতা হোন্তু’’ সর্ব প্রাণী সুখী হোক।
৪) ‘‘সব্বে সত্ত্বা দুক্খা মুঞ্চন্তু’’ সর্ব প্রাণী দুঃখ হীন হোক।
৫) ‘‘সব্বে সত্ত্বা যথালদ্ধ সম্পত্তিতো’’ সর্ব প্রাণী যথালব্ধ সম্পত্তি হতে বঞ্চিত না হোক।
৬) ‘‘সব্বে সত্ত্বা কম্মস্সকা’’ সর্ব প্রাণী কর্মের অধীন।

● মৈত্রী ভাবনার ফলসমূহ:

আন্তরিক অনুভূতি নিয়ে সবার প্রতি মৈত্রীভাব তথা মঙ্গল কামনা করতঃ নিজের মধ্যে প্রশান্তিময় এক শুভ চেতনা অনুভূত হয়। দেখতে পাবেন, আপনি সবার কাছে ক্রমশঃ গ্রহণযোগ্য, ক্ষমাশীল হয়ে উঠেছেন, আপনার প্রিয় ব্যক্তিদের প্রতি আপনার ভালবাসা বৃদ্ধি পাচ্ছে। যাদের প্রতি আপনি উদাসীন ছিলেন, আপনার ক্ষোভ ও বৈরীভাব ছিল, তাদের প্রতি অকুশল ভাব হ্রাস পেয়ে করুণা-উপেক্ষা-মৈত্রী ভাবের উদয় হচ্ছে। নিম্নে মৈত্রী ভাবনার একাদশ (১১) প্রকার ফল বর্ণিত হল। ক্রমান্বয়ে-

১) মৈত্রী ভাবনা পরায়ণ ব্যক্তি সুখে নিদ্রা লাভ করেন।
২) নিদ্রা হতে সুখে জাগ্রত হন ।
৩) কোন প্রকার পাপক দুঃস্বপ্ন দেখেন না।
৪) সকল মনুষ্যের প্রিয় হন।
৫) অমনুষ্য অর্থাৎ ভূত-প্রেত প্রভৃতি অপদেবতাদেরও প্রিয় হন।
৬) দেবগণ রক্ষা করেন।
৭) তাদের আগুন দ্বারা দগ্ধ করলেও দগ্ধ হন না, বিষপান করালেও বিষক্রিয়া হয় না, অস্ত্রাঘাতও ব্যর্থ হয়।
৮) তিনি ভাবনা করার ইচ্ছায় আসন গ্রহণ করা মাত্রই চিত্তের একাগ্রতা উপস্থিত হয়।
৯) তার মুখমণ্ডলে উজ্জ্বল-প্রসন্নতা ফুটে উঠে।
১০) সজ্ঞানে মৃত্যুবরণ করতে সক্ষম হন।
১১) তিনি অরহত্বফল লাভ করতে না পারলেও ব্রম্মলোকে উৎপন্ন হন।

প্রত্যেকদিন সকাল-সন্ধ্যা পূজা-বন্দনার সময় এবং শয়ন কালে এ মৈত্রী ভাবনা একাগ্রমনে ভাব ও অর্থের প্রতি দৃষ্টি রেখে আবৃত্তি করা একান্ত প্রয়োজন। এ মৈত্রী ভাবনা মনে-মুখে সমানভাবে আচরণ করার অভ্যাস করতে পারলে আত্মোন্নতি সাধন, প্রভূত উপকার ও উপদ্রব হতে রক্ষা পাওয়া যায়। সুতরাং আত্মোন্নতি ও বিশ্বমৈত্রী কামনায়, প্রাত্যহিক জীবন নিরাপদ এবং সকল প্রকার উপদ্রব, অপচ্ছায়া হতে পরিত্রাণ প্রয়াসে প্রত্যেক ব্যক্তির পক্ষেই এ মৈত্রী ভাবনা অমোঘ মন্ত্র যা আবৃত্তি করার জন্য "পালি-বাংলায়" মৈত্রী ভাবনার স্তবকসমূহ শিক্ষা করা উত্তম।

শক্তিশালী কি দুর্বল, উচ্চ, মধ্য বা নিচু গোত্রের, ক্ষুদ্র বা বৃহৎ, দৃশ্য বা অদৃশ্য, কাছের বা দূরের, জীবিত বা জন্ম প্রত্যাশী-সকল প্রাণীই সুখী হোক! কোন প্রাণীর প্রতি ক্রোধ বা ঘৃণা বশতঃ অমঙ্গল কামনা না করে আসুন সকল প্রাণীর প্রতি সম মৈত্রী পরায়ণ হই এবং লালন করি, যেমন করে মা অপার প্রেমময় মায়া-স্নেহে স্বীয় সন্তানকে লালন করে।

জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক!

সূত্রঃ স্বাধীন চিন্তা-চেতনা ও মানব কল্যাণে বৌদ্ধধর্ম

Additional Info

  • Image: Image