২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ বৃহস্পতিবার, ২৩ নভেম্বর ২০১৭ইংরেজী
Clear

22°C

Chittagong

Clear

Humidity: 68%

Wind: 17.70 km/h

  • 23 Nov 2017

    Partly Cloudy 27°C 16°C

  • 24 Nov 2017

    Mostly Sunny 27°C 18°C

শুক্রবার, 13 জুন 2014 01:01

জৈষ্ঠ্য পূর্ণিমার তাৎপর্য : শ্রীলংকায় অর্হৎ মহেন্দ্র স্থবিরের ধর্মবিজয় এবং বৌদ্ধধর্ম প্রচার

লিখেছেনঃ প্রাঞ্জল বড়ুয়া

জৈষ্ঠ্য পূর্ণিমার তাৎপর্য : শ্রীলংকায় অর্হৎ মহেন্দ্র স্থবিরের ধর্মবিজয় এবং বৌদ্ধধর্ম প্রচার

বৌদ্ধ ধর্ম কর্মবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত। সর্বদা সৎকর্ম সম্পাদন করা প্রত্যেকেরই কর্তব্য। শুভ-সৎকর্ম সম্পাদনের জন্য কোন তিথি লগ্ন শুভ বলে নির্দিষ্ট না থাকলেও মহা পুরুষের জীবনের পূণ্য স্মৃতি বিজড়িত ঘটনাবলীর সাথে যে দিন বা কালের সম্পর্ক সে দিন বা কাল শুভ পবিত্র বলে আমাদের বিশ্বাস। ইহাই কাল মাহাত্ম্য নামে অভিহিত। কাল মাহাত্ম্যকে বলা হয় পর্ব। আজও তেমনি একটি পূণ্যময় পর্ব বা তিথি ‘‘শুভ জৈষ্ঠ্য পূর্ণিমা’’।  মহাকারুণিক বুদ্ধ কর্তৃক শ্রাবস্থীতে প্রথম ধর্মদেশনা প্রদান এবং সম্রাট অশোক (ধর্মাশোক) পুত্র অর্হৎ মহেন্দ্র স্থবির কর্তৃক শ্রীলংকায় বৌদ্ধধর্ম প্রচারের জন্য এই পূর্ণিমা তিথি তাৎপর্যপূর্ণ।

এই পূর্ণিমা তিথি শ্রীলংকান বৌদ্ধরা ‘‘পোসন পয়া’’ (PosonPoya) নামে অভিহিত করেন। Posonবলতে ‘ধর্মবিজয়’ এবং Poyaবলতে ‘পূর্ণিমা’ বুঝানো হয়; অর্থাৎ এই পূর্ণিমা তিথিতে শ্রীলংকায় বৌদ্ধধর্ম প্রচারিত হয় বলে পূর্ণিমাটি ‘‘ধর্মবিজয় পূর্ণিমা’  নামে আখ্যায়িত। শ্রীলংকান বৌদ্ধদের নিকট এটি দ্বিতীয় প্রধান পূর্ণিমা বা ধর্মীয় তিথি। অর্থাৎ, বুদ্ধ পূর্ণিমার পরই এই পোসন পয়া বা জৈষ্ঠ্য পূর্ণিমার স্থান। মহাসারম্ভে সমগ্র শ্রীলংকা জুড়ে দিনটি প্রতিপালিত হয়। বিহারে আলোকসজ্জা, তোরণ নির্মাণ, আলোক কুডু তৈরী, পেরেহেরা (প্যারেড/র্যা লী), অন্ন-পানীয় দানশালার অয়োজন তো রয়েছেই। সেই সাথে ভোরে উপাসক-উপাসিকাদের বিহারে আগমন, উপোসথ শীল গ্রহণ, ভাবনা অনুশীলন, পুরো দিবস জুড়ে ধর্মদেশনা শ্রবণ এবং সন্ধ্যায় বোধি পূজা ইত্যাদি ধর্মানুশীলনের মধ্যদিয়ে পূণ্যময় দিনটি উদ্যাপিত হয়ে থাকে। তবে, শ্রীলংকার মিহিনতল নামক স্থানটি যেখানে  তৎকালীন সিংহলী রাজা দেবানাম প্রিয়তিস্স মহেন্দ্র স্থবিরের নিকট বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন এবং শ্রীলংকার প্রাচীন রাজধানী অনুরাধাপুর নামক প্রদেশে বিভিন্ন অঞ্চল হতে পূণ্যার্থীদের তীর্থযাত্রা এবং নানা ধর্মময় আয়োজনে পুরো সপ্তাহকাল উৎসবমুখর থাকে।

অর্হৎ মহেন্দ্র স্থবির কর্তৃক শ্রীলংকায় বৌদ্ধধর্ম প্রচার :

মহাকারুণিক বুদ্ধের পরিনির্বাণের প্রায় ২২৫ বৎসর পর সম্রাট অশোক‘মোগ্গলিপুত্ত তিস্স’ স্থবিরের নিকট বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন। তৃতীয় সঙ্গীতি সমাপ্ত করে ‘মোগ্গলিপুত্ত তিস্স’ স্থবির সম্রাট অশোকের সহায়তায় বিভিন্ন দেশে ধর্মপ্রচারক প্রেরণ করেন। ভারতীয় ধর্ম সংগঠিত রূপে ভারতের বাহিরে এই প্রথম প্রচারিত হতে থাকে। এই প্রচারকদল পশ্চিমে যবন রাজাদের রাজ্য গ্রীস, মিশর ও সিরিয়া আদি দেশে, উত্তরে মধ্য-এশিয়া, দক্ষিণে তাম্রবর্ণী (লঙ্কা) ও সুবর্ণভূমি (বর্মা) ও গিয়েছিলেন। লঙ্কায় মোগ্গলিপুত্ত তিস্সের শিষ্য অশোক পুত্র‘অর্হৎ ভিক্ষু মহেন্দ্র’ও তাঁর সহোদরা ‘অর্হৎ ভিক্ষুণী সংঘামিত্রা’গিয়েছিলেন। তাঁদের সাথে আরো চারজন অর্হৎ ভিক্ষু এবং একজন উপাসকও যোগ দিয়েছিলেন। লঙ্কার রাজা ‘দেবানাম পিয়তিস্স’বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত হন। কিছুদিনের মধ্যে লঙ্কাবাসী সকলে বৌদ্ধধর্মে প্রবেশ করেন। শ্রীলংকায় উড়তে শুরু করে বৌদ্ধ পতাকা। বুদ্ধ, ধর্ম, সংঘের জয় ধ্বনিতে মুখরিত হয় লঙ্কাদ্বীপ।

সিংহলী রাজা দেবানাম প্রিয়তিস্সের বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ :

মনোরম আবহাওয়া, সুন্দর পরিবেশ, চারিদিকে সুশোভিত সবকিছু মিলে দিনটি ছিল অতীব চমৎকার। রাজা দেবানাম প্রিয়তিস্স রাজ উদ্যানে সেদিন শিকার উৎসবে ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করছিলেন। হঠাৎ একটি বড় হরিণ তার পাশ দিয়ে দৌড়ে পালাচ্ছিল। রাজা সেই বড় হরিণকে শিকার করার জন্য তীর তাক করলেন। এমন সময় যে পর্বতের পাদদেশে দাঁড়িয়ে রাজা শিকার তাক করেছিলেন, সে পর্বত পৃষ্ঠ হতে এক আলোক রশ্মি দেখতে পেলেন এবং তিনি মধুর স্বরে তার নাম ধরে ডাক শুনতে পেলেন। চিন্তা করলেন, কার এত বড় যে আমায় নাম ধরে ডাকে! রাজা সেদিকে মনোযোগ দেওয়াতে শিকার লক্ষ্য ভ্রষ্ট হল। কিন্তু স্বরটা এতই মধুর ছিল যে রাজার মনে একটুও বিরক্তি জমল না।

এবার রাজা সেদিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলেন। দেখলেন পর্বত পৃষ্ঠে আম গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে গেরুয়া বসন পরিহিত শান্ত-সৌম্য, উজ্জ্বল-জ্যোতিষ্ময় এক সন্ন্যাসী। তার চোখ যেন আর ফিরে না! তিনি বিষ্মিত নয়নে তাকিয়ে রইলেন স্থবির পাণে। পরক্ষণে স্থবিরের পেছনে তিনি আরো চারজন সন্ন্যাসী, একজন সন্ন্যাসীনি এবং একজন উপাসককে দেখতে পেলেন। স্থবির মহেন্দ্র রাজার মনোভাব বুঝতে পারলেন। তিনি উপলব্ধি করলেন রাজা তাঁর উপদেশ শুনতে প্রস্তুত।

পরাক্রমশালী রাজা দেবানাম প্রিয়াতিস্সের হাত হতে শিকারের সেই তীর-ধনুক অজ্ঞাতেই পড়ে গেল ভূমিতে। তিনি প্রথমে কপালে স্থবিরের পা ঠুকিয়ে, এরপর নতজানু হয়ে বসে দু'হাত জোড় করে প্রণাম নিবেদন করলেন। অর্হৎ মহেন্দ্র স্থবির প্রথমে রাজার জ্ঞান এবং বুদ্ধিমত্তা নিরুপণ প্রয়াসে সাধারণভাবে ধর্মদানের সিদ্ধান্ত নিলেন। আর এভাবেই স্থবিরের ধর্মোপদেশ শ্রবণে রাজা বৌদ্ধধর্ম সম্পর্কে জ্ঞান লাভ পূর্বক ত্রিশরণাগমনে বৌদ্ধধর্মে প্রবেশ করলেন।

আজ হতে প্রায় ২০০০ বৎসরেরও পূর্বেসেদিনের সেই ধর্মবিজয় হতেই আজো শ্রীলংকায় বৌদ্ধধর্ম পূর্ণালোকের ন্যায় দেদীপ্যমান। আর কেনইবা দেদীপ্যমান থাকবে না! বুদ্ধ পতিরূপ সে দেশ বৌদ্ধদের এক মহান পূণ্য তীর্থভূমি। সেদেশের অনুরাধাপুরে রয়েছে বুদ্ধগয়ার মূল মহাবোধি বৃক্ষের শাখা বৃক্ষ; কেন্ডিতে রয়েছে গৌতম বুদ্ধের পবিত্র দন্তধাতু, এছাড়াও শ্রী-পাদ পর্বতে রয়েছে গৌতম বুদ্ধের পবিত্র পদচিহ্ন।

পরিশেষে, অনন্ত গুণসম্পন্ন বুদ্ধ, ধর্ম, সংঘ, মাতা-পিতা, আচরিয়গণের প্রতি বন্দনা-পূজা, শ্রদ্ধা, ভক্তি অর্পণ পূর্বক দূরের-কাছের সকল জ্ঞাতী, বন্ধু, শত্রু-মিত্র, কল্যাণকামী-অকল্যাণকামী সর্বোপরি সকলের প্রতি ২৫৫৮ বুদ্ধাব্দের শুভ জৈষ্ঠ্য পূর্ণিমার মৈত্রীময় শুভেচ্ছা জানায় এবং উপরোক্ত ধর্ম ভাষণ পূর্বক আমার সঞ্চিত পূণ্যরাশি জগতের সকল প্রাণীর হিত-সুখ, জয়মঙ্গল এবং দেশে-বিশ্বে শান্তির সুবাতাস প্রবাহিত হোক এ শুভ প্রত্যাশা-প্রার্থনায় দান করছি।

জয়তু বুদ্ধ শাক্যমুনি, জয়তু বুদ্ধ সাসনম্।
জগতের সকল প্রাণী সুখী হউক।

লেখক : প্রাঞ্জল বড়ুয়া;
এডমিন: “স্বাধীন চিন্তা-চেতনা ও মানব কল্যাণে বৌদ্ধধর্ম” ফেসবুক পেইজ
ই-মেইল:: This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it. ,
ফেইসবুক: www.facebook.com/pranjol.barua

Additional Info

  • Image: Image