২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ৩ কার্তিক ১৪২৪ বঙ্গাব্দ বুধবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৭ইংরেজী
শুক্রবার, 21 মার্চ 2014 19:40

কবি ভাগ্যধন বড়ুয়ার প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'অপর পৃষ্ঠার বৃত্তান্ত'

লিখেছেনঃ শাহনেওয়াজ বিপ্লব

কবি ভাগ্যধন বড়ুয়ার প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'অপর পৃষ্ঠার বৃত্তান্ত'

কবিতা লেখা হচ্ছে অনেক। কবিতার পাঠক কমে যাচ্ছে, এমনটিও সম্ভবত নয়। যদিও নানা আলোচনাসভায় উপস্থিত কবিদের মধ্যে কেউ না কেউ প্রায় তেমনই অনুযোগ জানান নিয়ম করে। কিন্তু আমার নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে দেখেছি,বাংলাদেশে সাম্প্রতিককালে কবিরা নিজেদের গোষ্ঠীভুক্ত কবিদের বাইরে অন্যদের কবিতা সম্পর্কে খুব একটা মনযোগী থাকেন না। ‘আমি এবং আমরা যারা লিখছি’,তার বাইরে অন্যরা তেমন ইম্প্রেসিভ নয়-এমন একটি ধারণা যত্নসহকারেই তারা লালন করেন।

কবিতা লিখছেন এবং অন্যের কবিতা কম পড়ছেন-এমন কবির সংখ্যা কি ক্রমশ বাড়ছে? উত্তর: সম্ভবত বাড়ছে।

প্রশ্নটি অনিবার্যভাবেই এসে গেল এ বছরের বইমেলায় প্রকাশিত ভাগ্যধন বড়ুয়ার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘অপর পৃষ্ঠার বৃত্তান্ত’ পড়তে পড়তে। বলা বাহুল্য যে, সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম থেকে যে ক’জন তরুণ কবি লিখে চলেছেন,কবি ভাগ্যধন বড়ুয়া তার ভেতরে সামনের কাতারের।

‘অপর পৃষ্ঠার বৃত্তান্ত’ কবি ভাগ্যধন বড়ুয়ার প্রথম কাব্যগ্রন্থ। দশক-ওয়ারি বিবেচনায় যারা বিশ্বাসী,তাদের বিবেচনায় শূন্য দশকের কবিও বলা যায় তাকে। কিন্তু শূন্য দশক জুড়ে গতানুগতিক লঘু আবেগধর্মী কবিতার যে ধারা, সে ধারা থেকে নিজেকে সযত্নে আলাদা করে নিয়েছেন ভাগ্যধন বড়ুয়া। ৬৪টি কবিতায় সমৃদ্ধ ‘অপর পৃষ্ঠার বৃত্তান্ত’ কাব্যগ্রন্থে তিনি রচনা করেছেন বেশ কিছু গভীর আর মননশীল কবিতা:

‘এটাও একটা পুরনো কাসুন্দি/ যারা আমাকে জানে/ কিংবা যাদের স্মৃতিভ্রম এখনো হয়নি/ তারা সকলেই বলবে /এতোদিনে আবার/ অচল শব্দের জোড়াতালি কেন দিলে ?/

আমিও চেয়েছি/ মনেপ্রাণে ভেসে আসা / জীবনের কথামালা কতোদিনে ফিকে হয় / ধুলোবালি জমে জমে,/ কেউ যদি বলে / জারুল-দুপুর ছুটামেঘ আর টাটকা রোদের কথা / তোমার কবিতার বাকলে এতো জড়াও কেনো?/

অথচ দেখো-আমাকে তাড়ায় / রঙধনুবুক আকাশ অতল সোনাদিয়া বালিচর-যেখানে পরীরা ঘুমায় / মাঘীপূর্ণিমার মায়ায় বয়ার কাঁপনে/ সুখস্মৃতি জানে ওই প্যারাবন,/ স্মৃতিবানে স্রোতের মতো তীরের পানে / শুধুই টানে কালের জমিন? অতল গহিন চোরাবালি / পলিপায়ে পায় না হদিস।’ (ক্রমাগত নীলের ভেতর )।

ভাগ্যধন বড়ুয়ার সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব যে, কবিতায় তিনি শব্দকে তার পুরনো অনুষঙ্গের আলখেল্লা ছাড়িয়ে নতুন জ্যাকেটে সাজান, সাজাতে পারেন, সাজিয়ে থাকেন। শব্দকে তিনি যে অভিনিবেশে লক্ষ করেন,যেন মনে হয় দূরবীণ দৃষ্টি দিয়ে দেখা এক নতুন পৃথিবী। আর সেই দৃষ্টিপাতকে তিনি যেভাবে বোধের বাহন করে তোলেন, তেমনটি পারেন না অনেকেই। তিনি একেবারে কম কথায় বলেন। তার লেখা দীর্ঘ কবিতাগুলোও এ স্বাক্ষ্য দেয় যে, তিনি মূলত সংহত কবি। নিজের ব্যক্তি অভিজ্ঞতাকে নিংড়ে নিংড়ে তিনি কবিতার শরীর তৈরি করেছেন। প্রসঙ্গত ‘বাবা’ কবিতাটির কথাই ধরা যাক:

‘শহরে আসার সময় যখন হয়-/ বাবা প্রায়ই নীরবে চোখের জল মোছে/ আর ভাঙা স্বরে বলে-/জয়ের জন্য নাড়ি ছিড়ে যাও.../ নির্জনে কত কথা বলি-শুনি বিচিত্র ধবনি/ দূর থেকে ভেসে আসা কোকিলের ডাক ছাপিয়ে অগুনতি আওয়াজ/ মনে ভিড় করে মাঠের পর মাঠ শস্যদানা ধানক্ষেত/ সরষেফুল আর আমার বাবা/’

শুধু কবিতা নয়,যে কোনো সৃষ্টির মূলে কাজ করে চলে রোমান্টিকতা ও তীব্র প্যাশন। ‘অপর পৃষ্ঠার বৃত্তান্ত’ কাব্যগ্রন্থে ভাগ্যধন বড়ুয়ার কবিতাগুলো পড়তে পড়তে মনে হয়েছে,তার কবিতাকে প্রেমের কবিতা, দ্রোহের কবিতা, দর্শন-আশ্রিত কবিতা, সমাজমনস্ক কবিতা ইত্যাদি ভাগে ভাগ করে দেখা সম্ভব নয়। ভালোবাসা, দ্রোহ, দর্শন তাদের নিজস্বতা নিয়ে সহজেই চলে এসেছে তার কবিতায়। আপাত নিরীহ অথচ অত্যন্ত গভীর আবেদন-সমৃদ্ধ ‘বিন্দুর চন্দ্রে আমি এক চন্দবিন্দু’ কবিতা থেকে:

‘যারা মন বোঝে না,/ চোখের বর্ণালি রেখা চেনে না,/ তাদের বারবার বলে যেতে হয়-/ ভালোবাসি।’ একটু আগেই লিখেছি , তার কবিতাকে অলাদাভাবে প্রেমের কবিতা ইত্যাদি ভাগে ভাগ করা যাবে না। কিন্তু ‘অপর পৃষ্ঠার বৃত্তান্ত’ -এ প্রকাশিত কবিতাগুলো ক্রমশ পড়ে যেতে যেতে শেষ পর্যন্ত আমার নিজের কাছেই ফিরে এল প্রশ্নগুলো: পৃথিবীর সব কবিতাই কি কোনো না কোনো অর্থে প্রেম বা অপ্রেমের কবিতা নয়? যন্ত্রণাবোধ ছাড়া কবিতার জন্ম আদৌ কী সম্ভব? সব যন্ত্রণাবোধের উৎসমূলেই কী থেকে যায় না প্রেম বা অপ্রেমের জাগরিত স্মৃতি?

‘ঠিকানা’ কবিতাটি দেখুন: ‘একাকী দাড়ানো ডাকবাক্সে হলুদ খামের চিঠি আর পড়ে না/ অথচ অনেক দিন আগেও শত আদরজড়ানো অভিমান / দীর্ঘ হিসাবের অভিযোগ গাদাগাদি করে জমা হতো/ দিনের পর দিন বৈশাখ থেকে বসন্তে/ কাঁপা কাঁপা শব্দগুলো কিশোরীর বুকে ঢেউ হতো/...আরাধ্য আনন্দ দোলা দিত কৃষচৃড়া মনে ক্ষণে ক্ষণে।’

‘অপর পৃষ্ঠার বৃত্তান্ত’কাব্যগ্রন্থের প্রতিটি কবিতায় তথাকথিত প্রচলিত কবিতার সীমান্ত ভেঙে দিয়েছেন ভাগ্যধন বড়ুয়া। নিঃশব্দের আলোকভুবন থেকে শব্দ এনে তাকে মিশিয়ে দিয়েছেন তিনি অভিজ্ঞতার সারাৎসারে। কবিতাগুলোর কলাপ্রকৌশলেও নিয়ে এসেছেন তিনি নবচেতনা। কথার পিঠের ওপর মৃদু তানপ্রধানের লয়, আবার কখনো বা পুঞ্জীভূত মেঘের মতোই ভীড় করেছে ধবনি-প্রাধান্যের রূপমাধুরী। কবিতায় তারা বৃষ্টিবিন্দুর মতো ঝরেছে নীরবে। নীরবতার নির্জনতায় মগ্ন চৈতন্যের স্রোত তার কবিতাকে দিয়েছে গতি। এক প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ওপর ধ্যানমগ্ন ঋষির মতো-চুপটি করে বসে থাকে; তার কবিতার প্রতিটি শব্দ, তার কবিতায় কোলাহল নেই। কোলাহলের ঝড়কে থামিয়ে মগ্ন নিঃসঙ্গ নির্জনতায়, তার ‘অপর পৃষ্ঠার বৃত্তান্ত’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলোর ভেতর দিয়ে ভাগ্যধন বড়ুয়া তৈরি করেছেন নিঃশব্দ নীলিমা।

সৌজন্যেঃ দৈনিক আজাদী

Additional Info

  • Image: Image