২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ৬ শ্রাবণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ শুক্রবার, ২১ জুলাই ২০১৭ইংরেজী
শনিবার, 30 জানুয়ারী 2016 03:31

ভাগ্যধন বড়ুয়া-এর গুচ্ছ কবিতা

লিখেছেনঃ ভাগ্যধন বড়ুয়া

ভাগ্যধন বড়ুয়া-এর গুচ্ছ কবিতা

নদীর নিজস্ব ঘ্রাণ

মাতামুহুরীর কথাই বলছি;যার একান্নবর্তী সংসার ভরে আছে জল, জাল, মাতাল তরঙ্গ আর প্রবহমাণ করতালি।…রাত যখন ক্রমশ আঁধার হয়ে আসে তখন অস্পষ্ট স্বর নিরবতায় মাদক ঢালে আর ঢুলুঢুলু চোখে চারদিকের আয়োজন দেখে; ভয় নাকি পরাজয়!… বেদনা না প্রণোদনা!

কারা সঙ্গ দিতে আসে রাতে নদীর বুকে? তারা, সংসার বৈরাগী, ঘর ভাঙ্গা মানুষ নাকি আত্মহন্তারক? যার যার মতো সময়ের বিন্যাসে আসে তারা, জলতরঙ্গে ভাসে; কাঁদে বা হাসে!…তার পরের হিসাব নদীও মনে রাখে না।

তবে প্রতি শীতের সকালে নদী তার নিজস্ব ঘ্রাণে বাস্প বানায় আর জানান দেয়; সারারাত ধরে প্রবাহিত পাঁজরের তাপ।

রাতের সঙ্গম শেষে শীতের ভোরে যারা মাতামুহুরীর জলে স্নান সেরেছেন তাদের শরীরে অনুভূত তাপই সাক্ষ্য দিবে নদী ও নারীর ঘ্রাণ সম্পূর্ণ মৌলিক।

চোরাবাঁশি

বাঁশিও তরঙ্গ তোলে জলে আর মনে
চোরাবাঁশি টান মারে বেনামী প্রহরে
প্রকাশ্যে নিখুঁত দেহ ভেতরে অঙ্গার
বনের আগুন যেন বাতাসের বেগে জ্বলে !
সন্ধ্যায় একাকী হলে মনোব্যথা জাগে
নীরব কম্পন তোলে সুরের মায়ায়
এমন আনন্দী রাগ আগেতো শুনিনি
এমন পাঁজর নাড়া কখনো বুঝিনি!
জলের আয়নায় দেখি তার মুখ ভাসে
কাঁপা কাঁপা ঢেউ মিলে চোখ-মুখ-ছবি
যত চাই জোড়া দিতে ততই তরঙ্গ
তৃষ্ণার্ত দরিয়া রাগে অসহ্য জোয়ার!
গভীর আকুতি জমা অন্তরিক্ষ মাঝে
বাঁশির বয়ান লিখি কাগজের ভাঁজে

আঁচলের গিঁট

চাল নেই বাজার নেই; মায়ের গলায় এই রেওয়াজ শুনতে শুনতে বড় হয়েছি অভাবের গৃহছায়ায়; মনে হতো আমার মা পৃথিবীর সেরা অভাবী আর আমার বাবা স্বীয় স্বভাবে এইসব কথা এক কান দিয়ে ঢুকায় আর অন্য কান দিয়ে বের করে। টানাটানির সংসারে কোন কিছুই বেশী ছিল না বলে যা খাবার পেতাম কম কম করে মিলেমিশে সবাই মজা করে খেতাম ধীরে ধী…রে শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত; শুনেছি অভাবের টানে মমতা বাড়ে। কিন্ত এখন তা বিশ্বাস করি…

এখন অভাবহীন সংসারে বাবার অভাবেই দিন কাটে আর আমার মাকে আর বলতে শুনি না তেল নেই নুন নেই!

সংসারের চাবি বণ্টন হতে হতে মায়ের হাতে শুধু আঁচলের গিঁটটাই রয়ে গেছে যেখানে মায়াবন্ধনে বেঁধেছিল পুরো
অভাবী সংসার…

কর্ণফুলি

কর্ণফুলি’র দু’পাড় জানে গল্প-গাথা কানের দুল
জলই জানে অতল কত চোরাবালি মনের ভুল।
নদীর বুকে এলো গেল উজান-ভাটা জোছনা-ভোর
সাম্পান নাইয়া টেনেই চলে বৈঠা হাতে স্বপ্ন-সুর।
পাহাড়-সাগর মিলন হলে জন্ম হবে ভাটির গান
কিনার ধরে নরম কাদায় বপন করি মায়াটান।
চন্দ্রাবতীর নয়নজলে কম্প তোলে ভরা বুক
লুসাই পাহাড় মুক্ত মুড়া অশ্রুজলে বাড়ায় দুখ।
ভাটির দেশে চরাচরে আমার বাড়ি মায়ের ডাক
পুষ্পভদ্রা গতিপথে নাম হারিয়ে ভিন্ন বাক।
শ্যামের গলা স্বাক্ষী রেখে বাঁশি তোলে জলের গান
দূরে গেলে কালুর ব্রীজ মনে তোলে কলতান।

শীতের সই কাল

গত শীতে আমার সই ছিল; এই বছর শীত কই! দূর্বাঘাসের সাথে শিশিরবিন্দুর যৌথজীবনের মতো রৌদ্রযাপন কালে দেহে তরঙ্গ তুলেছিল তাপ, মনোমিটারের লাফালাফি তখনও থামেনি; তারপরের পরিণাম জেনে গেলে চোখে কুয়াশা প্রাচীর।

শীত মানে সই কাল; যুথবদ্ধ প্রণয়ে লেপের ওম।

স্কুল সিরিজ: এক

স্কুলের দপ্তরি যখন শেষ ছুটির ঘণ্টা বাজাতেন তখন শুরু হতো আমার প্রেমের প্রস্তুতি; তোমার হাতের সংকেতে বুঝে যেতাম সময় ও আস্তানা। নলকুপের মুখে হাত-মুখ লাগিয়ে এক ঢোক জল পান করে বন্ধুদের অগোচরে ছুটে যেতাম মাতামুহুরীর পাড়ে। তুমিও দেবীর মতো গাছের আড়াল থেকে বের হয়ে আমাকে অবাক করে দিতে ; আলিঙ্গনে যেতে হাত বাড়ালে তুমি ভরশূন্য বেগে বুকে জড়াতেই তরঙ্গিত হতো রক্তস্রোত। উড়ন্ত দিনের এসব কাহিনি নিচু থেকে উঁচু ক্লাসে খুব দ্রুত রটেছিল আর দেয়ালে দেয়ালে অজানা ঈর্ষায় শোভাবর্ধন করেছিল বি প্লাস ডি হোল স্কআর; তখন সবেমাত্র বীজগণিত পড়া শুরু করেছি, জ্যামিতির পরিমিতিবোধে সন্নিহিত মন তখনও ভালমতো রপ্ত করিনি !

একদা স্কুলের পাঠ শেষ হলো;

এখন মনে গেঁথে আছে শুধু হোল স্কআর আর ছুটির ঘণ্টা…

Additional Info

  • Image: Image