২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ৬ শ্রাবণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ শুক্রবার, ২১ জুলাই ২০১৭ইংরেজী
সোমবার, 13 এপ্রিল 2015 12:35

হৃদয় জাগে আনন্দলোকে

লিখেছেনঃ ইলা মুৎসুদ্দী

হৃদয় জাগে আনন্দলোকে

চল যাই চল বন্ধুরা
বৈশাখের ঐ মেলাতে
উঠরো সবাই নাগরদোলায়
মাতবো নানান খেলাতে।

সকাল বেলা পান্থা ইলিশ
হরেক রকম খাবার,
আনন্দে আজ যাক না কেটে
বন্ধু তোদের সবার।

খেলনা কিনে ফিরবো বাড়ি
ক্লান্ত মনে সাঁঝ বেলাতে,
চল যাই চল বন্ধুরা
বৈশাখের ঐ মেলাতে।

শুভ বাংলা নববর্ষ।

নববর্ষ আসিতেছে ঘরে ঘরে। নববর্ষ আসে হৃদয়ে হৃদয়ে। আর হৃদয়ে আনে ভালবাসার বারতা। তাইতো কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ লিখছেন --- ‘বৈশাখে দেখেছি বিদ্যুৎ চঞ্চুবিদ্ধ দিগন্তকে ছিনিয়ে নিতে এল কালো শ্যেন পাখীর মতো তোমার ঝড়’। যাক, প্রতি বছর বাঙালি পয়লা বৈশাখের সূর্য কিরণচ্ছটায় অবগাহন করতে নেমে পড়ে পথের ধুলায়। সবার রক্তেই যেন ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয় একই বাণী ‘যা আছে যাক না চুলায় নেমে পড় পথের ধুলায়’। যা কিছু পুরনো, সেসব দূর করে দেওয়ার প্রতিজ্ঞা ও প্রত্যয় নিয়ে আবার এসেছে বৈশাখ বাঙালির চিরন্তন নববর্ষ। কালের অমোঘ নিয়মে পুরনো বছর গত হয়ে যায়। সূচিত হয় নব দিগন্ত ১৪২২ বঙ্গাব্দের প্রথম দিন। সকল জীর্ণ পুরাতন, সকল মলিনতাকে ভাসিয়ে দিয়ে নতুনের জয়গান করার দিন। নববর্ষ মানেই উৎসব, নতুনের আবাহন। বিভিন্ন জাতির জীবন ধারায় নববর্ষ বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। রবীন্দ্রনাথই বাঙালির প্রাণে ঋতু-বৈচিত্র্যের রূপমাধুর্যকে অসাধারণ নিপুণতার সঙ্গে ছড়িয়ে দিয়ে গেছেন। ১লা বৈশাখের সঙ্গে আছে ঋতুর সম্পর্ক। এই দিন থেকে বাংলায় গ্রীষ্ম ঋতুর সূচনা ঘটে। এর আগে ফাল্গুনের আতপ্ত দক্ষিণা হাওয়া বিরহ মিলনের স্বাগত প্রলাপ তুলে আম্রমুকুলের গন্ধে বাঙালির মনকে রাঙ্গিয়ে দিয়ে যায়। ৩১ চৈত্র বসন্ত ঋতুর সমাপনী দিবস তাই তা চৈত্র সংক্রান্তি হিসেবে উদযাপিত হয়। প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে বসন্ত ঋতু বিদায় নিয়ে রাত্রি ভোর হতেই বাংলার প্রকৃতিতে সিংহদুয়ার যায় খুলে, নতুন আবাহনে আসে বৈশাখ, রুদ্র বৈশাখ। প্রতিটি ১লা বৈশাখের সূর্য ওঠা ভোরে আমাদের চিত্ত বিমোহিত হয়। আমাদের অন্তর গেয়ে ওঠে

‘আজি এ উষার পুণ্য লগনে/ উদিছে নবীন সূর্য গগনে’।

অতীতকাল থেকে ঐতিহ্যগতভাবে বাঙ্গালির ঘরে ঘরে উদযাপিত হয়ে আসছে এই সার্বজনীন উৎসব। নববর্ষের প্রথম দিন যে কোন জাতির জন্য একটি উৎসবের দিন। এই দিনে থাকে না কোন ভেদাভেদ। থাকে না কোন হিংসা বিদ্বেষ। সকলে একই প্রাণে আনন্দ উদযাপনে মিলিত হয় একই উৎসবে, আনন্দধারায়। সকলের হৃদয় জাগে আনন্দলোকে। এই দিনটি আনন্দ উৎসবের মধ্য দিয়ে উদযাপন করে প্রতিটি জাতিই নববর্ষকে বরণ করে নেয়। আনন্দ-বেদনা, সফলতা-ব্যর্থতা কোনটাই নিরংকুশ নয়। এসবই আপেক্ষিক ব্যাপার। আর তাই নববর্ষকে আমরা যত আশা পূরণের মধ্য দিয়েই বরণ করি না কেন, নতুন একটি বছর আমাদের জীবনে যোগ-বিয়োগের চিরায়ত ধারাই যে উপস্থাপিত হবে, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। বাংলা নববর্ষ আমাদের জাতীয় জীবনে এক অনুপম বিষয় নিয়ে প্রতিবছর হাজির হয়। ধর্মীয় এবং সামাজিক বিভিন্ন আচার অনুষ্টানের রেওয়াজ আমাদের দেশে প্রচলিত আছে। বাংলা নববর্ষের উৎসবে ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষে সর্বস্তরের বাঙালি শরিক হয় এবং নানাভাবে এ উৎসব উদযাপন করে। পয়লা বৈশাখে সব পঙ্কিলতা ঝেড়ে ফেলে বাংলাদেশ হয়ে ওঠে বাংলাদেশ। জেগে ওঠে তার সপ্রাণ আনন্দময় রূপ। দেশি পোশাকে পথে নেমে আসা উজ্জ্বল নর-নারীদের দেখে আবার প্রত্যয় জাগে, এ দেশের সংস্কতির শেকড় শুকিয়ে যাওয়ার নয়, এ জাতির অন্তরাত্মা অমর। এ বিশ্বাসের আবার নবায়ন ঘটে, এ জাতির পরাজয় নাই।

মুঘল সম্রাট আকবর ফসল কাটার মৌসুমে খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে বাংলা সনের প্রবর্তন করেছিলেন। এই কঠিন কাজ সম্পাদনের ভার পড়েছিল সুপন্ডিত আমির ফতেহ উল্লাহ সিরাজীর উপর। ইংরেজি ১৫৫৬ সালের ১১ এপ্রিল ছিল বাংলা সনের শুভযাত্রা। হিজরি সন আর ফসলি পঞ্জিকার মিশ্রণে তৈরি এই বর্ষপঞ্জিতে মিশে আছে এ দেশের সং®কৃতির উদার সমন্বয়ধর্মের মর্ম। ষাটের দশকে বাঙালির স্বাধিকার অর্জনের সংগ্রামের দিনগুলোয় নববর্ষ পালনের এ উৎসবে যুক্ত হয়েছে নতুন এক চেতনা ও তাৎপর্য। চৈত্রে রবিশস্য, বৈশাখে বোরো, জ্যৈষ্ঠে পাকা আম-কাঁঠাল, আষাঢ়-শ্রাবণে ঘনঘোর বরিষা, নদী জল ছল ছল, শরতে কাশবনে বাতাসের দোলা, অঘ্রাণে নবান্নের উৎসব, পৌষে পিঠাপুলি, মাঘে কনকনে শীত-এসবই আবহমান লোকজীবনের অতি পরিচিত অনুষঙ্গ। বৈশাখ এখানে আসে কালবৈশাখীর আশংকা সঙ্গে লইয়া। কিন্তু বাঙালি জীবনে বৈশাখ আসে জীবন সংগ্রামের অফুরান প্রেরণা সঞ্চারিত করিয়া, জীর্ণ-পুরাতনকে ভাসাইয়া দিয়া লইয়া আসে নবতর জীবন সংগ্রামের আহবান।

বর্ষবরণ উৎসব হয়ে উঠে একই সঙ্গে আনন্দের, প্রতিবাদের আর আত্ম-অনুসন্ধানের উপলক্ষ। চৈত্র মাসের শেষ সপ্তাহ থেকেই শুরু হয়ে যায় নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি। নববর্ষকে কেন্দ্র করে গ্রামে ও শহরে নানারকম আচার অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। গ্রাম ও শহরের দোকানদার ও ব্যবসায়ীরা পালন করে ”হালখাতা” অনুষ্ঠান। নববর্ষের ”হালখাতা” অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণ জানানো হয় ক্রেতাদের। ক্রেতারা পাওনা পরিশোধ করেন আর দোকানি মিষ্টি দিয়ে ক্রেতাদের আপ্যায়ন করেন।

আমরা যতই উচ্চাভিলাষী হই না কেন তারপরও আমাদের মনে বাংলা নববর্ষের আবেদন বিন্দুমাত্র হ্রাস পায়নি। আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত বাঙালিরা এই একদিনের জন্য হলেও যেন সত্যিকারের বাঙালি হয়ে উঠে। পুরুষদের পাজামা-পাঞ্জাবী পরে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। আর মেয়েরা পরে বাঙালি জাতির ঐতিহ্যবাহী পোশাক শাড়ী। কপালে লাল টিপ, হাতে লাল চুড়ি, আর বৈশাখী শাড়িতে বাঙালি নারীরা আজ হয়ে উঠে অনন্য। পথে বেরুলেই মনে হবে, যথার্থ অর্থেই আমরা বাঙালি। আমাদের চিরায়ত প্রথাগত ঐতিহ্য আর সং®কৃতি রয়েছে আমাদের শেকড়ে। যা কখনোই উপড়ে ফেলা যাবে না। অক্ষরে অক্ষত বোধে জাগ্রত। বোধে জাগ্রত বলেই মহাসাড়ম্বরে বৈশাখী উৎসব পালন করা হয়। সারা বাংলায় বৈশাখের ঢেউ আছড়ে পড়ে । সার্বজনীন এই উৎসবে প্রাণে প্রাণ যায় মিলে। অগ্নিস্নানে শুচি হয় ধরা। অশ্র“বাষ্প মেলায় সূদুরে। নতুনের আবাহনে থাকে সামনের পথে এগিয়ে যাওয়ার ঈঙ্গিত। নববর্ষের দিন গান হবে, বাদ্য বাজবে। প্রতি ঘরে ঘরে ভালো খাবার রান্না হবে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বিক্রি হবে পান্তা ভাত, ইলিশ মাছ, নানা রকমের পিঠা। নানা জায়গায় বৈশাখী মেলা বসবে । বাচ্চারা খুবই আনন্দ সহকারে মেলা থেকে কত কিছু কিনবে। মুখে নকশা আঁকবে বড় ছোট সকলে মিলে।

নতুন বছরের সূচনা হিসেবে যা কিছু প্রতিশ্র“তিময় ও ভবিষ্যৎমুখী তা বরণ করার অঙ্গীকার, অসুন্দর ন্যূজ ও ক্ষয়িষ্ণুকে ঝেড়ে ফেলার --- এই চিন্তা চেতনায়, মননে মানসিকতায় সব বাঙালি ও আদিবাসীরা স্বাগত জানায় পয়লা বৈশাখকে। দেশের মানুষ আজ স্বপ্ন দেখছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশ আবারো নতুনভাবে জেগে উঠবে । আজকের নববর্ষে মানুষের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন এটিই। এই মহাস্বপ্ন বাস্তবায়ন দেখতে দেশবাসী আজ অধীর আগ্রহে অপেক্ষমান । নববর্ষকে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি আমরা সদ্য বিদায়ী বছরের সাফল্য ও ব্যর্থতার মূল্যায়নও করি। মানুষের জীবনে যেমন সাফল্য ব্যর্থতা আছে, তেমনি জাতির জীবনেও আছে আনন্দ-বেদনার সাফল্যগাথা। ১৪২২ বাংলা সন ব্যক্তি ও জাতির উপর বর্ষণ করুক মঙ্গলধারা। নতুন এ বছরে সকল অপশক্তির কালো অধ্যায় বিদুরিত হোক। নতুন বছর আমাদের নিয়ে যাক দিগন্তময়ী বিস্তৃত প্রত্যাশার আলোয় ফেলে দিয়ে পুরোনো ভুলত্রুটি, ক্ষুদ্রতা, অন্ধকারের ছায়া থেকে। বাংলাদেশ জেগে উঠুক ভবিষ্যতের আনন্দ আলোয়। নতুন বছর বাংলাদেশে আসুক সুজলা-সুফলা, শস্য শ্যামলা ধরণী হয়ে। বাংলা নববর্ষের এই আনন্দঘন মুহুর্তে নতুন বছর সবার জীবনে বয়ে আনুক অনাবিল আনন্দ, সুখ এবং সাফল্য। সকল প্রকার অন্তরায়, বাধা-বিঘœ দূরীভূত হোক। জাতি এগিয়ে যাক সামনের দিকে। বস্তুতঃ বাংলা নববর্ষ যেমন সুর ও সঙ্গীতের, মেলা ও মিলনের, আনন্দ-আবাহনের, তেমনই সাহস ও সংকল্পের। নূতন প্রতিজ্ঞায় ও প্রত্যাশায় বুক বাঁধিবার দিন পহেলা বৈশাখ। দেশের মানুষ চায় শান্তি ও সুশাসন, চায় সকল মৌলিক মানবাধিকারের নিশ্চয়তা। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নিয়ে সুন্দর দেশ গড়ার প্রত্যয়ে আমাদের বিবেক ও মনুষ্যত্ব বোধকে জাগ্রত করার দীক্ষা যেন আমরা গ্রহণ করিতে পারি। নতুন বছরের শুভ প্রত্যাশা কামনা করি। একটি বছরের মধ্যে প্রকৃতির সব রূপ বৈচিত্র্যই থাকবে। থাকবে ভাঙ্গা গড়ার খেলা। থাকবে আনন্দ হাসি আর সুখ-দুঃখের স্বপ্ন। প্রত্যেকেই নিজের মত করে বরণ করে নেবে এই মাসকে। এই জন্যই বৈশাখের এতো কদর। তার প্রতি সবার এতো আগ্রহ। আশা-প্রত্যাশার মধ্যে দিয়ে তাকে বরণ করা হয়। পুরনো সব কিছুকে বাদ দিয়ে নতুনের জয়ধ্বনির মধ্যে দিয়ে আসে বৈশাখ। কর্দমাক্ত সব ধুয়ে মুছে নতুন করে শুরু হয় পরিচ্ছন্নতার। মানুষ নতুন উদ্যমে যেন শুরু করতে চায় তার জীবনযাপন। ঐদিন সেজেগুজে, বৈশাখী পোশাকে স্বাগত জানানো হয় নববর্ষকে। প্রচন্ড গরম উপেক্ষা করেই মানুষের ঢল নামে উৎসবের জন্য। সবাই সুন্দর একটি ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা করে। বৈশাখ আমাদের অনেক প্রত্যাশার। আমরা বৈশাখকে স্বাগত জানাই, স্বাগত জানাই নববর্ষকে। শুভ নববর্ষ ১৪২২।

যাক পুরাতন স্মৃতি, যাক ভুলে যাওয়া গীতি
অশ্রুবাষ্প সূদুরে মিলাক
যাক্ যাক যাক
এসো হে বৈশাখ এসো হে এসো।

নববর্ষে আলোকে কামনা করছি সকলের ব্যক্তিগত, পারিবারিক এবং জাতীয়-সকল পর্যায়ে সুখ ও সমৃদ্ধি। চির অবসান ঘটুক হানাহানি, নারী নির্যাতন, গুম, নরহত্যা, খুন আর হিংসা-বিদ্বেষের। চতুর্দিকে বয়ে যাক শান্তির সুবাতাস। ১৪২২ সন আমাদের সকলের জন্য নিয়ে আসুক শুভ বার্তা, শুভ ক্ষণ, শুভ দিন।

ইলা মুৎসুদ্দী : কলাম লেখক, প্রাবন্ধিক, সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক : নির্বাণা পিস ফাউন্ডেশন, সহযোগী সম্পাদক : নির্বাণা ( www.nirvanapeace.com ), This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.

Additional Info

  • Image: Image