২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ৬ শ্রাবণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ শুক্রবার, ২১ জুলাই ২০১৭ইংরেজী
সোমবার, 28 এপ্রিল 2014 02:15

বাংলা সাহিত্য শতবর্ষের বৌদ্ধ অবদান

লিখেছেনঃ ড. বেণীমাধব বড়ুয়া

বাংলা সাহিত্য শতবর্ষের বৌদ্ধ অবদান

প্রত্যেক দেশ, জাতি, সম্প্রদায়, সমাজ কিংবা পরিবারের এমন এক সময় আসে, যখন আমরা জানিতে চাহি, ইহার কোন ঐতিহ্য আছে কিনা যাহা ইহার বৈশিষ্ঠ সম্পাদন করিয়াছে। ঐতিহ্য মাত্রের দুইটি দিক আছে। ইহার ভিতরের দিক সংস্কৃতি বা কৃষ্টি, যাহাকে আমরা ইংরেজিতে বলি কালচার। ইহার বাহিরের দিক সভ্যতা বা সিভিলাইজেশন। চিন্তা, কল্পনা, ভাবধারা, ধর্মবিশ্বাস এবং যাবতীয় জ্ঞান সম্পদ সংস্কৃতির অন্তর্গত।ভাষা, সাহিত্য, শিল্প, এবং যাবতীয় জাতীয়, রাষ্ট্রীয় এবং ধার্মিক প্রতিষ্ঠান লইয়াই সভ্যতা। সংস্কৃতি এতিহ্যের অধ্যাত্মরূপ এবং সভ্যতা ইহার স্থায়ী বাহ্য রূপ। সংস্কৃতিতে আছে নব নব আদর্শ রুপের উদ্ভাবনী শক্তি এবং সভ্যতায় পাই অভিনব নির্মান কেীশল। যেন একদিকে সস্কৃতিতে দেখি অধ্যাত্মজীবনের উৎস এবং প্রবাহ, তেমন অপর দিকে সভ্যতায় পাই ইহার যথার্থ প্রকাশ পরিচয় ও নিদর্শন। ঐতিহাসিক, সভ্যতার দেখিয়া উহাদের সাহায্যে অধ্যাত্ম জীবনের প্রগতির ধারা ও ক্রম, স্বরুপ ও আকার নির্নয় করিতে যান। শুধু তাহাতেই বিচনতা দেখাইয়া তাহার কত্যর্ব তাহার কর্তব্য সম্পন্ন হয়না, উপযুক্ত কারনসহ সৃষ্টির উৎকর্ষ অপকর্ষ দেখানও তাঁহার বিশেষ কর্ত্যব্যের মধ্যে। মানব সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে যথার্থ সমৃদ্ধি ও প্রগতিশীল করিতে হইলে ধীরতা ও বিজ্ঞতার সহিত নানা দিক হইতে বিচার ও নির্ধারন করা আব্যশক। কোথায়, কখন এবং কাহার দ্বারা কি ভাবে, কি পরিমাণে ও কিরুপ স্তরে তাহা উন্নীত হইয়াছে এবং তাহার উৎকর্ষ অপকর্ষ ও বা কিরুপ ঘটিয়াছে। নচেৎ কবিতা লিখিয়া জনসমাজে প্রকাশ করিলেই কবি হইলেন, যা তা ত লিখিয়া ছাপাইলেই লেখক ও সহিত্যিক হইলেন অথবা দুই চারিটি আলাপ করিতে পারিলেই দার্শনিক হিইলেন ধারনা জনসাধারনের মনে বদ্ধমূল হয। ইহাতে শুধু প্রশ্রয় দেওয়া হয় পল্লবগ্রাহিতাকে এবং হেয় করা হয় বিভিন্ন বিষয়ে প্রকৃত সাধকের জীবনব্যাপী সাধনাকে।
অবশ্য এ কথা বলিকার তাৎপর্য এই নহে যে সব ক্ষেত্রে সকলের পক্ষে বিচারের সমান মাপকাঠি। প্রগতির ধরায় এই মাপকাঠির ও পিিরবির্তিন হয়, হইয়াছে, হইতাছে, হইবেই। আমি এমন কথাও বলিতে চাহি না যে, বনানীর মধ্যে শুধু বনস্পতিই জন্মাবে ও বিরাজিত বিরাজ করিবার অধিকার থকিবে না। আমি জানি বনানির বহু, উদ্ভিদ- পরিবারের মধ্যে বিরাজ করিয়াছে বনস্টতির মহত্ব, মর্যাদা ও গৌরব। কবি শশঙ্কমোহনের ভাষায় বলিতে গেলে, সহস্র জন কবিত রচনা করিলেও “ কবি হয় এজন” এবং শত জন হাতে তুলি ধরিলেও চিত্রকর একজন। যেমন একদিকে বনস্পতি লইয়া বনানীর মর্যাদা ও গৌরব । কবি শশাঙ্কমোহনের ভাষায় বলিতে গেলে, সহস্র জন কবিতা রচনা করিলেও “কবি হয় একজন। এবং শত জন হাতে তুলি ধরিলেও চিত্রকর একজন। যেমন একদিকে বনস্পতি লইয়াই বনানীর মর্যাদা, তেমন অপর দিকে বনানীর সমিষ্টগত সৃষ্টি বৈচিত্যের গৌরব প্রকাশ করিয়াই বনস্পতির জীবন ধন্য । রবীন্দ্রনাথের অতুলনীয় ভাষায় বলিতে গেলে-

“শুধু ভঙ্গী দিয়ে যেন না ভোলায় চোখ
সত্য মূল্য না দিয়েই সাহিত্যের খ্যাতি করা চুরি।
ভালো নয়, ভালো নয় নকল সে শৌখিন মজুদদার
…সাহিত্যের ঐক্যতন সংগীত সভায়
একতারা যাহাদের তারাও সন্মান যেন পায়।”

আমার শুধু বলিবার উদ্দ্যেশ্য এই যে, যে দেশ, জাতি, সম্প্রদায় অথবা সমাজ যতই নব নব আদর্শ রূপ রচনা করিয়া অগ্রসর হইতে পারে, ততই তাহা প্রগতিশীল।
বাংলা সাহিত্য বোদ্ধগনের উল্লেখযোগ্য কোন দান আছে কিনা এবং থাকিলে তাহার গতি ও প্রকৃতি কিরুপ, এই প্রশ্ন উথাপিত হইয়াছে। প্রশ্নটি তুলিয়াছেন চট্রলের প্রাচীন পুথির তালিকা-সংগ্রাহক শ্রদ্ধাস্পদ মেীলবী আবদুল করিম সহিত্যবিশারদ মহাশয় মাসিকপত্র ভারতবর্ষে। “মঘা খমুজা”ই আধুনিক বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম বৌদ্ধগ্রন্থ। ইহা একটি অনুবাদ-গ্রন্থ, যাহাতে মূল গ্রহন্থের নাম পরিবর্তন করা হয় নাই। বাংলার বৌদ্ধগ্রন্থের নিকট “মঘা” শব্দের পারিভাষিক অর্থ বর্মিজ অরে লিখিত এবং পালি কিম্বা ব্রহ্মাদেশীয় ভাষায় রচিত বৌদ্ধশাস্ত্রগ্রন্থ। শব্দটি সংস্কৃতিগত, জাতিবাচক নহে, যেমন মীননাথ ও মৎসোন্দ্রনাথ প্রভৃতিনাথগুরুদের নাম অধ্যাতœাসাধনাসূচক জাতি সূচক নহে। “মঘা খমুজা” পুস্তকের পুথির পরিচয় দিতে গিয়ে আব্দুল করিম সাহেব বৌদ্ধধর্মাবলম্বী বড়–য়াদের জাতিগত কতকগুলি অবান্তর কথা লিখিয়াছেন। তাহার ব্যক্তিগত স্নেহশত ঃ বাংলা ভাষায়বড়–য়াদের সাহিত্যচর্চাপ্রসঙ্গে কর্ণফুলীল উত্তর কূলে আমার এবং দনি কূলে বন্ধুবর গজেন্দ্রনালাল চৌধুরীর নামোল্লেখ করিয়অচেন। তিনি জানিতেন ান যে, পালি মজঝিমনিকায়ের প্রথম খন্ডের অনুবাদক আমি এবং বেসস্তরাজাতকের অনুবাদক গজেন্দ্রলাল এইদুইয়ের মধ্যে কেহই বাংলা ভাষায় বড় সাহিত্যিক নহি। বাংলায় বড়–য়াদের মধ্যে যাহাঁরা যশস্বী লেখক, কবি কিম্বা সাহিত্যিক তাহাঁেদর কাহারও নামে তিনি ভূলক্রমেও করেন নাই।

যদি আমরা “মঘা খমুজাকে বাংলা ভাষায় আদি বৌদ্ধগ্রন্থ মনে করি, তাহা হইলে ইহার রচনাকাল হইতে আজ পর্যন্ত অন্তত, এক শতাবব্দী অথতীত হইছে। বাংলঅ সাহিত্যে এই শতবর্সের বৌদ্ধ অবদানকে গুরুঠাকুরী বিদ্যাসাগরী “নবীনসেনী” “নব্য” এবং “পাশ্চাত্য” প্রধানত ঃ এই পাঁচ যুগ পর্যায়ে বিভক্ত করিয়া প্রত্যেক যুগপর্যায়ে আদি, অন্ত ও মধ্য এইতিন যুগক্রম কল্পনা করা চলে। “গুরু ঠাকুরী” ও নবযুগের মধ্যে পণ্ডিত ধর্মরাজ বড়যুঅ পণ্ডিত নবরাজবড়ুয়া পণ্ডিত অগগ্সার মহাস্থবির, ডাক্তার রামচন্দ্র বড়ুয়া এবং কবি সর্বানন্দ বড়ুয়ার আবির্ভাব হয়। নবরাজের জন্মস্থান আবুরখিল গ্রাম।তাহাঁদের মধ্যে ডাক্তার রামচন্দ্র বড়ুয়ার জ্ম ১৮৪৭ খ্রীষ্টাব্দের ২রা মে, এবং মত্যু ১৯২২ খ্রীস্টা্েদর ২৪ শে ডিসেম্বর, রবিবার পন্ডিত ধমৃরাজের ১২২২ মঘঞীর (১৮৬০ খ্রীষ্টাব্দের ) ১০ই কার্র্তিক এবং মৃত্যু ১২৩৭ মঘঞীর (১৮৯৪) খ্রীষ্টাব্দের ২রা মে, এবং মুত্যু ১৯২২ খ্রীষ্টাব্দের ২৪শে ডিসেম্বর, রবিবার, পণ্ডিত ধর্মরাজের জন্ম ১২২২ মঘীর (১৮৬০ খ্রীষ্টাব্দের ) ১০ই কার্তিক এবং মৃত্যু ১২৩৭ মঘীর (১৮৯৪খ্রিষ্টাব্দের) ১লা চৈত্র, রবিার, এবং কবি সর্বানন্দের জন্ম ১৮৭০ খ্রীষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারীর মাস এবং মৃত্যু ১৯০৮ খ্রীষ্টাবে ১৬ই এপ্রিল (২রা বৈশাখ)। ডাক্তার রামচন্দ্র পচাঁত্তর বৎসর বয়সে কলেরার আক্রান্ত হইয়া মানবলীলা সংবরণ করেন। বৌদ্ধসমাজে ধর্মরাজের অব্যবহিত পূর্ববতী খ্যাতনামা বৌদ্ধগ্রন্থধ প্রণেতা নোয়াপাড়া গ্রামবাসী ফুলচন্দ্র বড়ুয়া এবং অব্যবিহত পরবর্তী লেখক বৈদ্যপাড়া গ্রামবাসী পণ্ডিত নবরাজবড়ুয়া ফুলচন্দ্রের আবির্ভাবের পূর্বে বড়ুয়াদের মধ্যে জনৈক অল্প প্রতিভামালী কবি জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেণ, “মঘা খমুজা” যাহার রচনা। দুভাগ্রবশতঃ তাহাঁর নামা কিছুই এখনও আবিস্কৃত হয় নাই, যদি ও তাহার আবিভার্বকাল ফুলচন্দ্রের আবির্ভাবকালের খুবই কাছাকাচি। সম্ভবত পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা জাতির মধেথ্য প্রচলিত ও সমাদৃত সাতটি গোজেনের লামা”ই আধুনিক যুগে বাংলায় বৌদ্ধ সমাজের প্রথম উপাদেয় পালা, গান, যাহাতে পুরাতন বৌদ্ধ গান ও দৌহার ধারা কিছু না কিছু রতি আছে বলিয়অ মনে হয়। নবরাজ পণ্ডিতের জন্ম ১৮৬৬ খ্রীষ্টাব্দের মাঝামাঝি এবং মৃত্যু মাত্র ঊনত্রিশ বৎসরবয়সে ১৮৯৬ খ্রীষ্টাব্দের ১৬ই জানুয়ারী। অগগসারের উপস্পদা ( ভিুব্রত গ্রহণ ) ১৮৮৩ খ্রীষ্টাব্দে এবং দেহত্যাগ ১৯৪২ খ্রীষ্টাব্দে । রামচন্দ্র ও অগ্গসালের জীবন যেমন দীর্ঘ তেমনই কর্মবহুল ও ঘটনাবহুল। অপর তিন জনের জীবন দীর্ঘ া হইলেও অমূল্য বাংলায় বৌদ্ধগ্রন্থ প্রনেতারূপে ধর্মরাজ পাঁচ জনের মধ্যে সকলেরই পূর্ববর্তী এবং সর্বানন্দ সকলেরই পরবর্তী ।

“নীতিরত্ন” “বৌদ্ধলঙ্কার” “শিাসার” “প্রকৃত সুখী কে? প্রকৃত সুখী কে ? “প্রসন্নজিতোপাখ্যান” "পালি ব্যাকরন” প্রভৃতি গ্রন্থধপ্রণেতা গ পণ্ডিত নবরাজ বড়ুয়া বিরচিত বন্ধু পরিচয়ের দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকা অংশে গ্রন্্যথকারের সংপ্তি পরিচয় দিতে গিয়া বংশদীপ মহাস্থবির লিখিয়াছেন, ছাত্র বৃত্তি পড়িবার সময় হইতেই তাহার প্রকৃত ধর্মজীবনেইর বিকাশ হইতে থাকে। সদ্ভাব শতকতাহাদের পাঠ্য ছিল এবং ব্রাহ্মসমাজের তদানীন্তন সুযোগ্য আচার্য কাশ্মীম্বর গুপ্ত তাহাদেরছিল প্রধান শিক ছিলেন ।তাহারই ধার্মিক হইবার বাসনা বাড়িয়া গেল। এই সময়ই তিনি বৌদ্ধশাস্ত্রজ্ঞ কাশীমোহনমুন্সির সহায়তায় উবুকশীল নামে বৌদ্ধদের নিত্যাবশ্যকীয় একটি পুস্তিকায় প্রচার করেন। এই পরিচয়ের মধ্যে কোথায়ও ভূলক্রমে পণ্ডিত ধর্মরাজের অথবা ফুলচন্দ্র বড়–য়ার উল্লেখ করা হয় নাই।

ধর্মরাজ, নবরাজ, অগগসার রামচন্দ্র এবং সর্বানন্দ জীবিতকাল হিসাবে সমসাময়িক হইলেও বাংলা ভাষায় বৌদ্ধগ্রন্থ প্রণেতারূপে ধর্মরাজ শুধু যে নবরাজের পূর্ববতীী তাহা নহে, তিনি বহুগুনে শক্তিশালী এবং দ লেখক ও বটে। তাহাঁদের দুই জনেরই আদর্শ চরিত্র সদ্ধর্মে গভীর আসথা এবং গ্রন্থ রচনায় ও কার্যে উভয়েই লোকশিক। পণ্ডিত নবরাজের পরিচয়ে লিখিত হইয়াছে, সাধু নবরাজ ও বিশ্বাসপূতে নীরব জীবনের আভাসা দিয়া গিয়াচেন, ঐরূপ জীবনের পচিয় অল্প স্থানেই পাইয়াছি। মুখে কথা নাই, হাতে কাজ আছে, বাহিরে কোন আড়ম্বর নাই, অন্তরে বিশ্বাস ভক্তি জমিয়া জমিয়া শন্তিনিকেতনে পরিণত হইতেছে। সংসারের প্রতি আসক্তি বা স্পৃহা নাই, অন্তরে বিশ্বাস ভক্তি জমিয়া শান্তি জমিয়া শান্তি নিকেতনে পরিণত হইতেছে ইহা দেখিয়াছি শুধু নবরাজের পরি অস্ফুট মহাজীবনে। অস্ফুট বলি এই জন্য তাহা এই বিংশ শতাব্দীর পাঠকের পইে প্রযুক্ত হইতে পারে। তবে নবরাজকৃত বুদ্ধ পরিচয়ে উপসংহারে তিনি যে আত্মনিবেদন রচনা করিয়াছেন, তাহা এই বিংশ শতাব্দীরপাটকের পক্ত্যেন্ত সেকেলে নিতান্ত পাঁচমিশুলী ওবেমানান। ইহার প্রথম সাতটি শেলাকে শুধু সদ্য বিধবার বৈঞ্চবী বিরহ বিলাপ।

“কোথা গেলে ওহে প্রভু বুদ্ধ ভগবান
এ দাসেরে সঙ্গী কেন না কৈলে তখন ?
সে কালে আমার কথা কেন না স্মরিলে
কিরূপে থাকিব আমি এই ভবানলে
তুইি ত মম প্রভুব জীবনের ধন
সে ধন বিহনে কিসে ধরিব জীবন।
কি হবে আমারগতি ওহে দয়ময়
ডুবে গেল শোখ দুঃখে এ মম হৃদয়
হায়রে ! এমুখে আর বাক্য নাহি সরে
মর্মগ্রন্থ ছিড়ে যেন গেল চিরতরে।

ইহার ৮ম ও ৯ম শেলাকে ঋষিপ্রবজ্যা ও ভিু প্রবজ্যার মধ্যে আচারগত গোলযোগ ঘটিয়াছে।
“কাষার বসন কবে করিয়া ধারণ
নগর নগরানেতর করিব ভ্রমণ !
ভিা হেতুদ্বারে দ্ববারে কখনিভ্রমিব।
কিন্তু পরবর্তী দুই শ্লোকে দেখা যাইবে, উহার মধ্যে বৌদ্ধ ভাবধারার কেমন এক সুন্দর অভিব্যক্তি আছে।
পর্বতকন্দরে কিম্বা গহন কানন।
সিংহ ব্যাঘœ সনেকবে হইবে মিলন !
তোমার বিশুদ্ধ ধর্ম করিয়া কীর্ত্তন
দেশ দেশান্তরে কবেহবে তৃপ্তদ মন।
তালপুট স্থবির তাহাঁর অতুলনীয় প্রচীন গীতি গাথার প্রথম দুই গাথায় বৈরাগ্যসূচক খেদোক্তি করিয়াছেন।
কদানুহং পব্বতকন্দারাসু একাকিয়োঅব্দুতিয়েঅ বিহসংসং অনিচ্চতো সম্বভবং বিপসসং তং মে ইদং তং নু কদা ভবিসংসতি!
কদা নুহং ভিন্নপটন্দরো মুনি কাস্বাখো অমমো নিরাসয়ো
রাগঘ্জ দোসঞ্চ অথেব মোহং হন্ত্বা সুখী পবনগতোবিহস্সং ।
কদা আমি পর্বতকন্দরে একা অদ্বিতীয় করিব বিহার,
অনিত্য সকল ভব হেরি
সে মোর এই শুভদিন তাও যে কবে হবে !
কদা আমি ছিন্নপট্টধারী মুনি কাসায়বসন অমম নিরাশয়
রাগহ দ্বেষ তথামোহনাশি সুখী উপবনগত করিব বিহার।

উদ্ধৃত শেলাকের দ্বিতীয়টিতে বাংলার শ্রেষ্ট নাট্যকবি গিরিশচন্দ্র ঘোষের দেশ বিখ্যাত বন্ধুদের চরিত নাটকের চল ভাই দেশ বিদেশে ঘরে ঘঞরে করি গহান পদযুক্ত শেষ গানটির প্রতিধ্বনি আছে।
আবুরখিলগ্রামের দণি ঢাকাখালী পল্লীবাসী কালীচরন ও পরমার পঞ্চম বা সর্বকনিষ্ঠ পুত্র ধর্মরাজ তাহাঁর সময়ে শুধু বৌদ্ধ সমাজে নয় সারা বাংলা দেশে পালি ভাষায় ও সাহিত্যে অদ্বিতীয় পণ্ডিত ছিলেন। বাংলা ভাষায়ও তাহাঁর অসামান্য ব্যুৎপত্তি ছিল, শব্দসম্পদও অসাধারণ, নবরাজের ন্যঅয তিনিবাল্যে ও কৈশোরো একজন কৃতী ছাত্র ও মেধাবী শিার্থী ছিলেন। সে কালের পে ইংরেজী ভাষায় ও তাহাঁর অধিকার কম ছিল না। তিনি চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলেল এন্ট্রান্স কাশহইতে নির্বাচন পরীা না দিয়া পালি ভাষা ও ত্রিপিটক অধ্যায়নের জন্যসিংহল যান এবং তথায় দীঘর্ঞছয় বৎসর কাল ঐ ভাষা ও সাহিত্য শিা করেন। পর স্বদেশে ফিরিয়াও কলিকাতা হইতেও পাথেয়ই পে যথেষ্ট অর্থসংগহ্রহ করিয়া, উক্ত বিষয়ে সাহিত্য অধ্যায়নের তিন বৎসর অতিবাহিত করিয়া স্বদেশে ও স্বগ্রামে প্রত্যাবর্তন করেন। তণ তাহার বয়স ছাব্বিশ কিম্বা সাতাশ বৎসর মাত্র। ঐ বৎসরেই পাঁচখাইন গ্রামের কাশীনাথ বড়ুয়ার জৌষ্ঠ কন্যা নবকুমারীর সহিত তিনি পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন। তখন হইতেই তিনি বাংলা ভাষায় বৌদ্ধ গ্রন্থ প্রণয়নের ব্রতী হন।

ধর্মূরাজকৃত প্রথম বৌদধগ্রন্থ সূতনিপাত পালি সুত্ত নিপাতের সরল ও বিশুদ্ধ বাঙ্গহালা পদ্যানুবাদ রূপে ২৪৩০ বুদ্ধাব্দে ১২৪৮ মগাব্দে ১৮৮৭ মগাব্দে খ্রীষ্টাব্দে কলিকাতা হইতে প্রকাশিত সংস্করণ।তৃতীয় গ্রন্থ সিঙয্গালকুসুত্ত পালি সিঙ্গালোবাদ সুত্তেরই বঙ্গরে মুদ্রিত সংস্করণ এবং শেষ গ্রন্থ সিঙ্গালকসুত্ত পালি সিঙ্গালোবাদ সুত্তেরই বঙ্গারে মুদ্রিত সংস্করণ এবং শেষ গ্রন্থ । সিঙ্গালসূত্র উহারই বাংলা অনুবাদ যাহা ১২৫১ মগান্দে ১৮৮৯ খ্রীষ্টাব্দে প্রকাশিত হয়। চতুর্থ গ্রন্থ হস্তসার ১মভাগ , ২৪৩৬ বুদ্ধাব্দে ১৮৯৩ খ্রীষ্টাব্দে মুদ্রিত উদানবত্থু অবলম্বনে রচিত। ষষ্ঠ গ্রন্থ জ্ঞানসোপন উহার পান্ডুলিপি মূল গ্রন্থকারে মুত্যুর পর হস্তগত করিয়া আবরুখিলবাসী জনৈক ভিক্ষু জ্ঞানের আলোকে জ্ঞানসোপন নাম দিয়অ নিজের নামেই ছাপ্য়াাছিলেন সপ্তম গ্রন্থ সত্যসার অষ্টম গ্রন্থ হস্তসার ২য়ভাগ, নবম গ্রন্থ হস্তসার ৩য়ভাগ, এবং দশম গ্রন্থ মাতৃদবেী ইহাদের কোনটাই মুদ্রিত হয় নাই এবং পান্ডুলিপি উধাও হইয়াছে।

পালি ভাষায় ধর্মারাজের কি অসাধারণ পান্ডিত্য ছিল এবং বাংলা সাহিত্যেই বা তাহার চিরস্থখায়ী দান কি? তাহা বিচার করিতে গেলে তাহাঁর প্রথম গ্রন্থ সুত্ত নিপাতের পদ্যানুবাদ সূত্র সৌন্দর্য যথেষ্ঠ অধুনা শ্রীমৎ ভিক্ষু শীলভদ্র উহার যে গদ্যঅনুবাদ করিয়াছেন, তাহা মূলের সৌন্দর্য মাধুর্য ও গার্ম্ভীয রা করিতে পারে নাই। পালি ত্রিপিটকের মধ্যেসুত্ত নিপাতের ন্যায় শক্ত বই নাই বলিলেও চলে। সাবলীল গতিতে মূলের শব্দ বিন্যাস ও অর্থ বাজয় রাখিয়া সূত্তনিরপাত পদ্যে ভাষান্ত

ঘোষণা এবং পরিশেষে শিষ্য আনন্দের উপর যাবতীয় ভার ন্যস্ত করিয়া তিরোভাব ইত্যাদ সমুদয় কথা সরল দদ্যে বর্ণিত হইয়াছে।”
রচনা হিসাবে “বৌদ্ধরঞ্জিকা” অনেকাংশে উন্নত হইতেও তাহা পূর্ববর্তী “মঘা খমুজা”রই ধুরবাহী ; ইহাতেও সেই চারিটি ছন্দের প্রাচুর্য। ইহার লঘুত্রিপদীতে রচিত “কল্পতরুর বর্ণনা” যেমন সরল ও সুন্দর ,তেমনই কবিত্বব্যঞ্জক ঃ-

“তরু মনোহর, দেখিতে সুন্দর, কাঞ্চন সদৃশ অঙ্গ।
বহু পল্লবিত, অতি সুশোভিত, বিহঙ্গাদি করে রঙগ॥
কুসুম সৌরভে, অলি মধুলোভে, পুঞ্জে পুঞ্জে কথ ।
কুকিলে কুহরে, ময়ূরি ময়ূরে , বিহরয়ে অবিরত ॥
সরসে সারতে, আছে রঙগরসে, শামাপাখি কত শত।
সারীসুক সুখে, বিরহে কৌতুকে, সংখ্যা বা করিব কত ॥

“মঘা খমুজা” এবং “বৌদধরঞ্জিকা” এই দুই পূর্বযুগের বাংলা বৌদধগ্রন্থের প্রধান অপূর্ণতার মধ্যে আমরা দেখি, বর্মিজ উচ্চারণ-বিকৃত পাশি নাম ও পরিভাষাগুলি তাহাতে আছে, যথা- আনন্দের স্থানে ‘আনাইংদা’ চেতিয়র (চৈত্যের) স্থানে ‘জেদি’ মহাথেরর স্থাসে ‘ক্ষ্মাথে’ কস্সপর (কাশ্যপর) স্থানে ‘খাচবা’, ককুচ্ছন্দর (ককুৎসন্ধর) স্থানে ‘খাকুচান্দ’।

ঐ যুগে ফুলচন্দ্র কবিত্বের সহিত ভিু পাতিমোরে গদ্যানুব্দ করিয়াছিলেন, যাহা পাদিমুখ নামে পরিচিত ও আদৃত হয়। পূজ্যপাদ জৈষ্ঠতাত পুরামন ঠাকুর (গৌরমোহন তালুকদার) তাহাঁর ১২৪৯ মগাব্দে, ১৮৮৭ খৃষ্টাব্দে লিখিত এক পুথিতে লিপিবদ্ধ করিয়াছেন যে ফুলচন্দ্র পাহাড়তলী মহানন্দ বিহারে বসিয়া “পাদিমুখ” প্রণয়ন করিয়াছিলেন এবং তিনি স্বয়ং সেখানে উপস্থিত ছিলেন। পরে চট্রল বৌদ্ধসমাজের নেতৃস্থানীয় পূজ্যপাদ হরগোবিন্দ মুৎসুদ্দি ও পাহাড়তলীবাসী পন্ডিত গোবিন্দচন্দ্র বড়ূয়া একত্রে উহার এক মার্জিত সংস্করণ প্রকাশ করেন। পূজ্যপাদ মহামহোপাধ্যয় ডক্টর সতীশচন্দ্র বিদ্যাভূষণ মহাশয়ও তাহাঁর “বুদ্ধদেবচরিত” প্রন্থে পাতিমোরে সরল বঙগানুবাদ প্রকাশ করিয়াছিলেন। এ সকল প্রচেষ্টার পূর্ণ পরিণতি হয় ধীরপ্রাজ্ঞ পন্ডিত বিধুশেখর ভট্রার্চায সঙকলিত ভিক্ষু ও ভিক্ষুনী পাতিমোক্ষ ফুলচন্দ্রের অনুবাদের দোষ হইল, তিনি পালি শব্দের উপযুক্ত বাংলা পরিভাষা দিতে পারেন নাই, নচেৎ তিনি যাঁহাদের জান্য লিখিয়াছিলেন, তাহা তাঁহাদের বহু উপকারে আসিয়াছিল। উদ্ধৃত নমুনা হইতে তাঁহার গদ্য রচনার পরিচয় মিলিবে ঃ-

“৪১। গ্রাস মুখের বারের নিকট নেওয়ার পর্বে করিবে না ৪২। মুখে গ্রাস দিবার সময় অঙগুলি প্রবেশ করাইয়া দিবে না । ৪৩। মুখে গ্রাস দিয়া কথা কহিবে না। ৪৪। মুখে প্রাস পেণ করিয়া খাইবে না।”
ধর্মরাজকৃত “হস্তসার” ১ম ভাগ, নিত্যপাঠ গ্রন্থরূপে বাংলার প্রতি বৌদ্ধগৃহে স্থান পাইয়াছিল। ব্রিমরণ, পঞ্চশীল, দশশীল, মঙগলসূত্র, রত্নসূত্র ও করণীয় মৈত্রীসূত্র প্রভুতি বৌদ্ধগৃহেস্থের উপযোগী পাঠ ও সূত্রসমূহ সান্বয় ব্যাখ্যা এবং সরল গদ্য ও পদ্যানুবাদ সহ উহাতে সন্নিবেশিত ছিল। এই “হস্তসার ” পড়িয়া বাংলার বৌদ্ধ নরনারী তাঁহাদের অবশ্য প্রতিপাল্য ধর্মের মহিমা ও উন্নত নৈতিক আদর্শ হৃদয়ঙগম করিয়াছিলেন। ইহাতে বৌদ্ধ জন সাধারণের মধ্যে ধর্ম রাজের অসাধারণ পান্ডিত্যের গৌরব প্রচারিত হইয়াছিল। যতদিন “হস্তসার” নামটি থাকিবে , ততদিন ধর্মরাজের পূন্যস্মৃতি বাংলার বৌদ্ধসমাজে দেদীপ্যমান থাকিবে।

ধর্মরাজের “হস্তসার” প্রকাশিত হইবার পূর্বে এবং ‘গুরুঠাকুরী’ যুগের শেষভাগে পাহাড়তলী প্রামবাসী স্বর্গত শরু পন্ডিত (শরচ্চন্দ্র বড়–য়া) পদ্যাকারে “মহামঙ্গলসূত্র” ছাপাইয়াছিলেন “বৌদ্ধমঙ্গল” নামে। ইনিও ভিুব্রত ছাড়িয়া পরে গৃহী হইয়াছিলেন। যে বৎসর “হস্তসারে”র প্রথম ভাগ মুদিত হয়, ঐ বৎসরেই অগৃগসার তাঁহার উপাদেয় প্রথম বই “বুদ্ধভজনা” প্রণজন করেন। পরবর্তীকালে “হস্তসারে’র অভাব পূরণের জন্য বর্ধিত আকারে সমণ পিয়সীলি বহুস্সূত পুন্নানন্দস্বামী “রতœমালা” আন্ধারমাণিক গ্রামবাসী বিমলানন্দ ভিু “সদ্ধর্মদীপিকা” এবং রেঙগুন বুদ্ধিষ্ট মিশনের প্রতিষ্ঠাতা বৈদ্যপাড়াগ্রামবাসী প্রঞ্জালোক স্থবির “সদ্ধর্মরত্নাকর” প্রণয়ন করেন। নবরাজকৃত “উবুকশীল” এবং বীরেন্দ্রলাল মুৎসসুদ্দিকৃত “উপোসথসহচর” এই শ্রেনীরই প্রন্থ। প্রথমোক্ত দুইটি গ্রন্থে আমারও যৎকিঞ্চিত সহযোগিত ছিল। ধর্মরাজ ও নব- রাজের শুষ্ক গদ্যরচনা সমস্তই বিদ্যাসাগরী।
ধর্মরাজ প্রনীত গ্রন্থগুলি পালি সুত্তপিটকের ধারায় বিরচিত হয়। “মঘা খমুজা”র ধারা পালি অপদান-সাহিত্যের। বংসজাতীয় ধারায় ফুলচন্দের “বৌদ্ধরঞ্জিকা”র এবং বিনয়পিটকের ধারায় “পাদিমুখ” গ্রন্থের উৎপত্তি। অভিধম্মপিটকের ধারায় এদেশে গ্রন্থ প্রণয়নের পে রামচন্দ্র ডাক্তারই পথপ্রদর্শক।

তাঁহার জীবনেতিহাঁসে আমরা দেখি, আশৈশব সদ্ধর্মে তাহাঁর অহৈতুকী রতি, রাল্যে ও কৈশোরে বিদ্যাভাস ও ব্রক্ষ্মচর্য পালনে, যৌবনে কবিরাজি ও ডাক্তারীতে অধীতবিদ্যতা, যৌবনে ও প্রৌঢ়ে দতা, প্রিতা, কর্তব্যনিষ্ঠা ও কৃতিত্বের সহিত সামরিক ও সিভিল মেগিকেল বিভাগে চাকুরী, ক্রমশঃ পদোন্নতি, বহুদর্শিতা এবং রুগ্ন ও আর্তের চিকিৎসা ও সেবা, এবং বার্দ্ধক্যে ধ্যানসমাধি, সমাজ-সংস্কার , লোকশিা ও গ্রন্থ-প্রণয়ন। তাহাঁর ঋষিতুল্য জীবনে দৃঢ় সংকল্প, বিপুল উৎসাহ , নির্ভীক সৎ-সাহস, নির্লেস হৃদয়, পাপবিরত ও প্রলোভনজয়ী চিত্ত, সক্ষ্ম দর্শন ও দূরপ্রসারী দৃষ্টি ছিল। শ্রামণের ও ভিু অবস্থায় উপাধ্যায় ফুলচন্দ্র মহাস্থবিরের সান্নিধ্য ও সঙ্গলাভ এবং কর্মজীবনে বা্গংালার দুর্ভি-পীড়িত জনগনের চিকিৎসা ও পরিচর্যা, দিবতীয় আফগান যুদ্ধের সময় উত্তরপশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে বিভিন্ন সামরিক হাসপাতালে নির্ভয়ে কর্তব্য সম্পাদন এবং পেলিটুয়ায় অস্থায়ীভাবে দীর্ঘ সাত বৎসর সিভিল সার্জনে ও জেল সুপারিন্টেল্ডেন্টের কাজ করিয়া ধর্মসাধনার জন্য অকাতরে ঐ উচ্চ পদত্যাগ উহাদের প্রত্যেকটিই আমাদের কাছে স্মরনীয় অবদান। তিনি তাঁহার জীবনে পর পর বহু পরীার সম্মুখীন হইয়া কৃতিত্বের সহিত সমস্ত উর্ত্তীণ হইয়াছিলেন। কিন্তু সবচেয়ে তাঁহার বড় কৃতিত্ব হইল এই যে , তিনি চরিত্রপরীায় জয়মাল্য পাইয়াচিলেন।

বৌদ্ধ প্রধান এবং অভিধর্ম ও ধ্যান শিার প্রধান ত্রে ব্রক্ষ্মদেশে যাইতে পারিলে তাঁহার জীবনের অভীষ্ট সিদ্ধ হইবে বিশ্বাস করিয়া তিনি রাওলপিন্ডি হইতে সুযোগ নিয়া তথায় ট্রান্সফার নিয়াছিলেন। ঐ দেশে তিনি অন্যুন দশ বৎসর অতিবাহিত করিয়াছিলেন। অবসর সময়ে বৌদ্ধ শাস্তজ্ঞ ও ধ্যামার্গে উন্নতী সায়াদ (আচার্য) গণের সাহর্চয লাভ এবং তাঁহাদের সহিত অভিধর্মাদি নিগূঢ় বিষয়ের আলোচনা করিয়া। তাঁহার শেষ কার্যস্বান হইয়াছিল আকিয়াবের পার্বত্য মহকুমার প্রধান শহর পেলিটুয়া। এই স্থানে অবস্থানকালেই ইংরাজীতে বিখ্যাত পালি ব্যাকরণ প্রণেতা ডাক্তার থাডুয়াইংএর পিতৃদেবের সহিত তিনি ঘনিষ্ঠভাবে পরিছিত হন , যিনি আকিয়ারের যেমন অভধর্মে. তেমনই ধ্যান সমাধিত পারদর্শী ছিলেন। তাহাঁরই নিকট কর্মস্থান (ধ্যেয় বিষয়) গ্রহন করিয়া তিনি কেয়ক্ত পোকাতলীর শমশান অনপ্রাণধ্যানে প্রবৃত্ত হন। ঐ সময় পাহাড়তলীবাসী ধ্যানপ্রিয় বিপ্রদাস বিপ্রদাস মুৎসুদ্দি এবং সদ্ধর্মসেবী মদীয় পিতৃব্য ধনজ্ঞয় তালুকদার তাঁহার বাসাহারের সুব্যবস্থা করিয়াছিলেন। উহারই পরিণতিতে তিনি ক্রমশঃ চাকুরীতে বীতশ্রদ্ধ হইয়া লোভনীয় সরকারী পদ পরিত্যাগ করিয়া অভিধর্ম ও ধ্যান সমাধি বিষয়ে নিপূণতা লাভের জন্য ব্রক্ষ্মদেশের নানা স্থানে পরিভ্রমণ করেন।

রামচন্দ্র তাঁহার সব গ্রামে অবস্থানকালে পরিণত বয়সে শিশু চিকিৎসা, বড়ুয়াদের ইতিহাস ও বিষয়ে তাঁহার প্রথম গ্রন্থ “শ্রমন কর্ত্তব্য” ১২৩৬ মগাব্দে ১৯৩১ সালে, দ্বিতীয় গ্রন্থ “অভিধর্মার্থ সংগ্রহ” ১২৭২ মগাব্দে ১৯৪১ সালে , তৃতীয় গ্রন্থ “নির্বাণ দর্শন কর্মস্থান” পরবর্তী বর্ষে সংগ্রহ’ ১৭৩২ মগাব্দে ১৯৪১ সালে, তৃতীয় গ্রন্থ “নির্ব্বাণ দর্শন কর্ম্মস্তান ” পরবর্তী বর্ষে মুদ্রিত হয়। তাঁহার চতুর্থ গ্রন্থ মহাসতিপটঠান সুত্তের বাংলা অনুবাদ এখনও মুদ্রিত হয় নাই। বিনয় পিটনের ধারায় “শ্রমণ কর্ত্তব্য” এবং অভিধর্ম ও সূত্রপিটকের ধারায় অবশিষ্ট বইগুলি লিখিত হয়।

অভিধর্ম ও ধ্যান সমাধি মনোবিজ্ঞানসম্মত ও নীতিপ্রধান হীনযান বৌদ্ধধর্মের অতি নিগূঢ় ও জটিল বিষয়। মূল অভিধর্ম পিটলের বইগুলি দেখিলে মনে হইবে , যেন উহাতে কতকগুলি দুরুহ শব্দের বিন্যাস ও সমষ্টি ছাড়া আর কিছুই নাই। পারিভাষিক শব্দের তালিকার পর পৃষ্টাকে প্রষ্ঠা চলিয়াছে অর্থ নির্দেশ ও অর্থ বিভাগ। এ হেন জটিল বিষয়গুলিকে বাংলার পাঠকগনের নিকট সুবোধ্য করিবার দুঃসাহস লইয়াই রামচন্দ্র তাঁহার গ্রন্থ প্রণয়ণ কার্যে ব্রতী হইয়াছিলেন। তাঁহার চেষ্টা যেমন সম্পূর্ন সফল হয় নাই, তেমন সম্পূর্ণ নিস্ফলও হয় নাই। প্রতি চেষ্টার ইতিহাসে প্রগতির ক্রম আছে। তাঁহার অকৃতকার্যতাও ক্রমে আমাদিগকে কৃতকার্যতার পথে আনিয়াছে। তাঁহার প্রধান ব্যর্থতার কারণ ছিল, পালি পরিভাষার অনুযায়ীব বাংলা পরিভাষার অভাব। এই ব্যর্থতা আলোচ্য বিষয়ের তাৎপর্য নহে, উহার বিশদ আলোচনায় ও খুুটিনাটিতে।

সতিপট্ঠানের অনুযায়ী বাংলা শব্দ স্মৃতি-প্রস্থান কিংবা স্মৃতি-উপস্থান। ইহা বুদ্ধ উপদিষ্ট ধ্যানযোগের ব্যাকরণ। অনপ্রাণ সাধনার মূল প্রাণায়াম অভ্যাস। পূর্বাচরিত প্রাণায়ামের মধ্যে বুদ্ধ যোগ করিলেন –স্মৃতির অনুশীলন। যখন যাহা করিতেছি, যখন যাহা দেখিতেছে, শুুনিতেছে, অনুভব করিতেছি, চিন্তা করিতেচি, যখন যাহা উৎপন্ন হইতেছে তখনই তাহা সেই সেই ভাবেই জানিতে হইবে। কাজেই এই স্মৃতির সহিত যুক্ত আছে অপর একটি প্রয়োজনীয় শব্দ, যথা-সম্প্রজ্ঞান, অর্থাৎ যথাযথ জানা। জহুরী সহজে রতœ চিনিতে পারেন। বৌদ্ধ ধর্মাঙকুর বিহার ও সভার প্রতিষ্টাতা কর্মবীর কৃপাশরণ মহাস্থবিরের অনুরোধে আমি ছাত্রাবস্থায় সতিপট্ঠান সুত্তের যে সামান্য অনুবাদ পুস্তকাকারে ছাপাইয়াছিলাম, অনায়াসে তাহার সারমর্ম গ্রহন করিতে পারিয়াছিলেন শ্রেষ্ঠ অজপা নাম সাধক, বিজয়কৃষ্ণের একান্ত অনুগত শিয্য, অমূল্য “শ্রীশ্রীসদগুরু প্রসঙ্গ ” প্রণেতা সবনামধন্য ব্রক্ষ্মচারী কুলদনন্দ।

পালি অভিধর্ম সাহিত্যের চরম পারিভাষিক গ্রন্থ আচার্য অনুরুদ্ধ কৃত অভিধম্মহুসঙ্গহ। ইহাকে আশ্রয় করিয়া সিংহলে পোরাণ টীকা ও বিভাবনী টাকা প্রনীত হয় এবং পরবর্তীকালে ব্রক্ষ্মদেশে এক বিরাট অভির্ধম সাহিত্য গড়িয়া উঠে। আধুনিক যুগে ইহার শেষ সবাধীন ভাষ্যকার ব্রক্ষ্মদেশের বিশববিশ্রতু লেডি সায়াডো, যিনি মগ গঙ্গ দীপনী প্রভৃতি বহুমৌলিক গ্রন্থের প্রনেতা। গভীর গবেষণাপূর্ন ভুমিকা ও টীকা টিপ্পনী সহ ইংরাজী ভাষায় উক্ত গ্রন্থের অনুবাদ করিয়া লেডি সায়াডোর শিষ্য স্থানীয় আরাকানবাসী সোয়েজান অংগ মরিয়াও অমর হইয়াছেন।
পালি টেক্সট সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা পূজ্যপাদ অধ্যাপক রীজ ডেভিডসের বিদূসী পতী মিসেস রীজ ডেবিডসই অভিধর্মনিহিত বৌদ্ধ চিন্তা ও জ্ঞানের প্রচারের পে প্রতীচ্যে পথ-প্রদর্শক। রামচন্দ্রের পর প্রবীন লেখক বীরেন্দ্রলাল মুৎসুদ্দি অনেকাংশ সুবোধ্য করিয়া অভিধর্মার্থ সংগ্রহ বাঙালী পাঠকের নিকট উপস্থিত করিয়াছেন সত্য, কিন্তু রামচন্দ্রই এ বিষয়ে বাংলায় পথ-প্রদর্শক। মুৎসুদ্দি মহশয়ও এতটা কৃতকার্যতা লাভ করিতে পারিতেন না, যদি তিনি ব্রক্ষ্মদেশে থাকিয়া পালি ও বার্মিজ ভাষার ব্যুৎপত্তি লাভ না করিতেন এবং ইংরাজীতে প্রকাশিত অভিধর্ম বিষয়ক গ্রন্থ ও সন্দর্ভগুলি অধ্যয়ন করিতে না পারিতেন। লেডি সায়াডো প্রণীত মগ গঙ্গদীপনী প্রভূতি দুই একটি বইএর ছায়া মাত্র অবলম্বনে আকিয়াবের চিকিৎসা বাসসায়ী বীরেন্দ্রলাল বড়–য়া বাংলা ভাষায় “আর্য্যাষ্টাঙ্গিক মার্গ ” নাম দিয়া একটি ছোট বই ছাপাইয়াছিলেন। যদিও তিনি ভুমিকায় লিখিয়াছেন যে পুস্তক নিহিত তত্ত্বকথাগুলি তাঁহার ধ্যানলব্ধ জ্ঞান, বস্তুতঃ তাহা অলীক না হইলেও নিতন্ত আস্পর্ধার কথা।

পালি অভিধর্ম-সাহিত্যে যাহা এখন আমরা দর্শনশাস্ত্র বা ম্যাটাফিজিক বলিয়া জানি, তাহার অতি অল্পই আছে। অভিধর্মর্থসংগ্রহ বর্ণিত শমথ ও বিদর্মন ভাবনা ঠিক দার্শনিক চিন্তা নহে, যেহেতু তাহাতে যুক্তি তার্কের অবতারণা নাই, আত্নসাধনাই ইহার উদ্দেশ্য। পালি অভিধর্মের চারি বিষয়বস্তু, যথা-চিত্ত, চৈতসিক, রূপ ও নির্বাণ।
মনোবিজ্ঞানসম্মত অর্থেই অভিধর্মের পরমার্থ। ইহাতে আছে বিশ্লেষণ ও অনেকগুলি ‘ধরাবাঁধা’ কথা, উহাদের যথার্থ দাশৃনিক বিচার নাই বলিলও চলে।

যেমন ভগবদ্গীতায় প্রকৃতির তম ও রজোগুণ অতিক্রম করিয়া এবং উহার সত্ত্বগুন বাড়াইয়া অধ্যাত্ম যোগসাধন দবারা আপন চরিত্র গঠন ও শ্রী-চৈতন্য সবরূপ পুরূষকে প্রকৃতির সান্নিধ্য হইতে মুক্ত করিবার কথা আছে অথবা জৈচনশাসেত্র ক্রমে উচ্চ হইতে উচ্চতর গুণস্থানে আরোহণ করিয়া ক্রোধ , মান, মায়া ও লোভ, এই চারিটি কথায় ও কমৃকেশ হইতে আত্নাকে অব্যাহতি দেওয়ার কথা আছে, তেমনই পালি অভিধর্মে লোভ, দেবষ ও মোহ, এই তিন অকুশন মূল হইতে চিত্তকে বিমুক্ত করিয়া, কুশলমূল ক্রমে বর্ধিত করিয়া, না-দুঃখ না-সুখ বেদনার পথে চালিত করিয়া, শমথ বা যাবতীয় কেশের উপশম সাধন করা এবং সকল জাগতিক বস্তুর অনিত্যতা, দুঃখ ও অসারতা দেখিয়া বিদর্শন ভাবনার পথে চালিত করিয়া, যাহাতে চিত্তা কিছুতেই কেশ ও অকুশলের অভিমুখী না হইতে পারে, তাহার সদুপায় বিধান করা। চব্বিশটি প্রত্যয় বা কার্যকারণ সম্বন্ধের ভাবে চিত্ত চৈতসিক এবং নামরূপের জটিল স্থূলে সূক্ষ্ম সম্বন্ধগুলি অনুভব করিয়া এবং জ্ঞানতঃ বুঝিয়া যে যে সম্বন্ধে আমরা সুখ-দুঃখ ও কুলাকুশলের অধীন হই, ঐ সকল সম্বন্ধ বর্জন করিয়া যে সে সম্বন্ধে আমাধের চিত্ত, স্বভাবে চরিত্র অধোগমনের অধীন হই, ঐ সকল সম্বন্ধ বর্জন করিয়া যে সে সম্বন্ধে আমাদের চিত্ত, স্বভাব চরিত্র অধোমনের পথে না গিয়া ঊর্দ্ধগামী ও সমুন্নত হয়, তাহার মনোবিজ্ঞান সম্মত ও ধ্যানসূলভ উপায় দ্ধারা তদনুযায়ী ইন্দ্রিয় ও বলগুলির উৎকর্ষ সাধন করা। আভিধর্মিক রামচন্দ্রের আবহাওয়া “গুরুঠাকুরী” রচনা “বিদ্যাসাগরী ” এবং ভাষা বহুস্থানে দুরুহ , তথাপি তাঁহার মূল বক্তব্য বিষয়গুলি অস্পষ্ট নহে।

সূদর্শন বিহার ও পালি টোলের প্রতিষ্ঠাতা অগগসার মহস্তবিরের তথা চট্ট্রগ্রাম শহরের বৌদ্ধবিহর প্রতিষ্টান নীরব কর্মী ও উদারচেতা ভগীরথ ডাক্তারের জন্মে হোয়ার পাড়া গ্রাম ধন্য হইয়াছে। “বুদ্ধ ভজনা” প্রকাশের পর অগগসার তাঁহার দ্বিতীয় গ্রন্থ সানুবাদ “গাথা সংগ্রহ ” সঙ্কলন করেন ১২৫৬ মগাব্দে ১৮৯৪ খৃষ্টাব্দে। বাংলা অর্থসহ তৃতীয় গ্রন্থ ‘পলি শব্দসংগ্রহ’ প্রনীত হয় ১২৬০ মগাব্দে ১৮৯৮ খৃষ্টাব্দে। চতুর্থ গ্রন্থ সিংহলী পূজাবলীল গদ্যানুবাদের রচনাকাল ১২৭৫ মগাব্দ ১৯১৩ খৃষ্টাব্দ এবং পঞ্চম এবং গ্রন্থ সানুবাদ ধম্মপদ- অটঠকথÍ সঙ্কলনকার ১২৭৮ মগাব্দ ১৯১৬ খৃষ্টাব্দ । বলা আবশ্যক যে , অগগসারের রচনাও সর্বাংশে “বিদ্যাসাগরী”। এ স্থলে পন্ডিত গোবিন্দচন্দ্র বড়ুয়াকৃত “প্রেতসূত্র” ও উল্লেখযোগ্য।

প্রগতির ধারা ফুলচন্দ্রের আরব্ধ কার্যের পরিণতির প্রয়োজন ছিল এবং এই বাঞ্চিত পারণতি সাধিত হইয়াছে কবি সর্বানন্দের লেখনীতে। কৃত্তিবাসের রামায়ণ ও কাশীরামদাসের মহাভারতের ন্যায় এবং উহদের পরিবর্তে বাংলার বৌদ্ধগণ প্রত্যহ পাঠ করিতে পারে, এমন এক অমিয়বুদ্ধ চরিতের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করিয়াছিলেন রানী কালিন্দী এবং ফুলচন্দ্রের “বৌদ্ধ রঞ্জিকা” অনেকাংশে ঐ অভাব দূর করিয়াছিল “গুরুঠাকুরী” যুগে। “বিদ্যাসাগরী” যুগে বুদ্ধ-পরিচয় রচনা করিয়াছিলেন নবরাজ। “নবীনসেনী ” যুগে লেখনী হাতে লইলেন সর্বানন্দ , যিনি বহুসসুত সমণ পুন্নানন্দের ভাষার বলিতে গেলে “আমাদের মধ্যে অদ্বিতীয় মনস্বী, কবি ও লেখক।” ইংরেজ কবি স্যার এডুইন আর্নল্ড বিরচিত “দি লাইট অফ এশিয়া”র অত্যুৎকৃষ্ট বাংলা পদ্যানুবাদরূপে “জগজ্জ্যোতি”, এবং উহারই সাধারণ পাঠকের উপযোগী সংস্বরণরূপে “শ্রীশ্রীবুদ্ধ চরিতামৃত” রচনার সমৃদ্ধিতে ও গৌরবে সর্বানন্দের কবি প্রতিভা উদ্ভাসিত হইল। একটি পালি অভিধানের প্রয়োজনও অনুভূত হইয়াছিল । নবরাজ ঐ অভাব মোচনের জন্য অমরকোষের আদর্শে সিংহল দ্বীপে রচিত অভিধানপ্পদীপিকার এক বাংলা সংস্করন প্রস্তুত করিয়াছিলেন। পরে শীলক গ্রামবাসী জ্ঞানানন্দ স্বামী (মহেন্দ্রলাল ভিু) ২৪৫৭ বুদ্ধাব্দে ১৯১৩ সালে উহার এক সুন্দর বাংলা সংস্করণ প্রস্তুত করিয়াছিলেন। সর্বানন্দ বিচার্ড চিলডার্স-কৃত ডিক্্রনারী অবলম্বনে পালি বর্ণমালার ক্রম অনুসারে শব্দগুলি সজ্জিত করিয়া পালি অভিযান প্রণযন করেন। “জগজ্জ্যোতি”র পান্ডুলিপি সর্বানন্দের সুযোগ্য পুত্র বঙ্কিমচন্দ্র চট্টগ্রামস্থ বুদিধষ্ট অর্বান কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্কের নিকট আমানত রাখিয়া কিছু টাকা কর্জ লইয়াছিল। আমার সংবাদ, বঙ্কিম তাহার দেয় ঋণ পরিশোধ করে নাই, অথচ উক্ত ব্যাঙ্কে গচ্ছিত পান্ডুলিপির সন্ধনও মিলিতেছে না, এ বলে ওর কাছে, সে বলে এর কাছে। পালি অভিধানের পান্ডুলিপিও পরহস্তগত হইয়াছে।

“দি লাইট অফ এশিয়া ” এবং “দি লাইট অফ দি ওয়ার্রড” নাম দিয়ে আর্ণল্ড যে দুইখানি অমিয় চরিত কাব্য লিখিয়াছিলেন, তাহাদের প্রথমমি বাংলা পদ্যানুবাদরুপেই রচিত হইয়াছিল নবীনচন্দ্র সেনের “অমিতাভ” এবং দ্বিতীয়টির অনুপ্রেরনায় রচিত হইয়াছিল তাঁহার “অমৃতাভ” বা চৈতন্য চরিত। ভগবান বুদ্ধ শুধু এসিয়ার আলো এবং যীশুখৃষ্টই জগতের আলো-আর্ণল্ডের এই তুলনাগত প্রভেদ মনোব্যথা পাইয়া সর্বানন্দ “জগজ্জ্যোতি ” নাম দিয়াই তাঁহার প্রথমোক্ত চরিত কাব্যের পদ্যানুবাদ করিলেন, যাহার পান্ডুলিপি পাঠ করিয়া নবীনচন্দ্র বলিয়া- ছিলেন-“সর্বানন্দ, তুমি তোমার জগজ্জ্যোতি লিখিতে জানিলে আমি আমার ‘অমিতাভ’ লিখিতাম না।”

আর্ণল্ডের ‘এশিয়ার আলোর’ বিষয়বস্তু ও রচনা অতি সুন্দর তাঁহার এই মনোহর চরিত কাব্য পড়িয়া সারা বিশ্বের শিতি সমাজ বুদ্ধ ও বৌদ্ধধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হইয়াছিল। কিন্তু মূলের তর্জমায় সর্বানন্দের অনুবাদ কোন অংশে ন্যূন নহে। ইহাতেও মুলের অনূরুপ শব্দবিন্যাস ও ব্যঞ্জনা, ছন্দের স্বচ্ছন্দ গতি ও মধুর ঝঙ্কার, সারল্য ও গাম্ভীর্য এবং বর্ণনা ও ভাবের চমৎকারিত্ব আছে। তথাপি ইহা অনুবাদগ্রন্থ এবং ইহার ছন্দও মিত্রার পয়ার যদিও তাহা মূলের ধ্বনিতরঙ্গ হিল্লোলে হিল্লোলিত। আমার বেশ স্মরণ আছে, তিনি তাঁহার অনুবাদ গ্রন্থে দীর্ঘ ভূমিকার পরিবর্তে শুধু এই কথাটিই লিখিয়াছিলেন-‘সুন্দর বস্তুর ছায়াও সুন্দর।’ কথাটিতে বস্তুগত দোষ আছে ; কেননা সুন্দর বস্তুর ছায়া সুন্দর না হইতেও পারে। উহাতে বস্তুগত দোষ থাকে না, উহা নির্ভুল যদি আমরা তাঁহার ছায়া শব্দে বুঝি আদর্শে প্রতিবিম্বিত চিত্র।ইহাই তাঁহার লতি অর্থ। এই অর্থ গ্রহন করিয়া আমরা বলিতে পারি যে, তাঁহার উক্তি যথার্থ। যিনি পূর্ণ অর্থবহ কোন সত্যকে পূর্ণাবয়বে অথচ একটি ‘ছোট্ট কথায়’ এত সুন্দর করিয়া ব্যক্ত করিতে পারেন, তিনি নিশ্চয় উচুদরের কবি ও লেখক।

সর্বানন্দ তাঁহার অনুবাদ গ্রন্থটিকে তাঁহার স্বর্গত পিতৃদেবের স্মৃতিঅর্ঘ্যরূপে উৎসর্গ করিয়াছিলেন। কাজেই এই উৎসর্গ অংশের কবিতা তাঁহার মৌলিক রচনা। ইহার চরণগুলি ঠিক আমার মনে পড়িতেছে না। তবে ইহাতে পিতাকে উদ্দেশ করিয়া বলিয়া গিয়াছেন-“পিত! তুমি আর মরদেহে বর্ত্তমান নহ। এখন আমি তোমাকে সমগ্র বিশ্বের দেখি (তোমায় হেরি বিশ্বময় ) । তোমার শুষ্কপ্রায় ডালে এক শাখাপল্লব মঞ্জুরিত হইয়া (মঞ্জুরিল) যে ফুলটি ফুটিল, তাহা তোমারই পবিত্র স্মৃতি অর্ঘ্যরূপে অর্পণ করিলাম্”

কল্পিত ভাবটি যেমন সুন্দর ও মহান, ইহার প্রকাশ ভঙ্গীও তেমন মনোহর। প্রকৃত কবিত্ব না থাকিলে এমন ভাবোদ্দীপক রচনা সম্ভব নহে।
গ্রন্থের উপসংহার অংশের কবিতাও তাঁহার মৌলিক রচনা। ইহাতে তিনি তাঁহার ধৃষ্টতার জন্য ভগবান বুদ্ধের নিকট মা ভিা করিয়াছেনঃ-
“মা কর, মা কর ধৃষ্টতা আমার,
নগন্য প্রতিভা মম মাপিল তোমার।”

ধৃষ্টতার কারণ এই যে, তাঁহার নগণ্য কবি প্রতিভা বুদ্ধের অপার করুণায় পরিমাণ করিতে গিয়াছে, অর্থাৎ উহার অসীমতা ও অপরিমিততা ঘুচাইয়াছে। কবির এই মা ভিার পশ্চাতে আছে মহাভারতকার ও পুরাণ উপপুরাণকার ব্যাসপ্রেক্ত দুইটি শ্লোক, যাহাতে তিনিও জগদীশ্বরের নিকট কৃত অপরাধের জন্য মা প্রার্থনা করিয়াছেন। তাঁহার তিন অপরাধ, যেহেতু তিনি তাঁহার ধ্যানে, স্তবস্তুতি ও বর্ণনাবৈচিত্র্যের দ্বারা ভগবানের নিরাকারত্ব, অনির্বচনীয়তা ও সর্বব্যাপিত্ব দূর করিয়াছেনঃ-

রূপং রূপবিবর্জতস্য ভবতো ধ্যানেন যৎ কল্পিতং
¯ত্তত্যা নির্বচনীয় তাখিল পুরো দূরীকৃতা যন্ময়া।
ব্যাপিত্বঞ্চ নিরাকৃতং ভগবতো যত্তীর্থত্রাদিনা
ন্তব্যং জগদীশ তদ্ভিকলতা দোষত্রয়ং মৎকৃতম।

“জগজ্জ্যোতি”র শেষ শ্লোকের প্রথম চরণে কবি নব ঊষার , অর্থাৎ ভগবান বুদ্ধের অপার করুণা-সিঞ্চিত ও অতুল মহিমামন্ডিত ভাবী বিশ্বের, ধীর আগমনের প্রতি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়া (হের ঐআসিতেছে ঊষা), উহার দ্বিতীয় চরণে যেন বেদান্তের ভাবেই বলিতে গিয়াছেন, তাখন তাহার জীবন অনন্ত সাগরে মিশিয়া যাইবে (মিশে যাবে অনন্ত সাগরে)। কবির এই শেষের উক্তির পশ্চাতেও আর্যভারতের দার্শনিক ঋষিমুখ-বিনিঃসৃত

উপনিষদের অমৃতবানীঃ-
যথা নদ্যঃ স্যন্দমানঃ সমুদ্রে
অস্তং গচ্ছন্তি নামরূপে বিহায়। (মুন্ডক, ২-৩-৮)

“গুরুঠাকুরী” যুগের “বৌদ্ধরঞ্জিকা”র পূর্ণ পরিণতি “নবীনসেনী” যুগের “শ্রীশ্রীবুদ্ধ-চরিতামূত”,যাহার মাত্র প্রথম গ্রন্থকার ছাপাইতে পারিয়াছিলেন। সৌভাগ্যক্রমে ইহার দ্বিতীয় খন্ডের পান্ডুলিপি খৈয়াখালীগ্রামবাসী রমেশচন্দ্র মহস্থবির সযন্তে নিজের কাছে রাখিয়াছেন। বৈষ্ণবগ্রন্থ “শ্রীশ্রীচৈতন্য চরিতামৃতের” নামানুকরণেই “শ্রীশ্রীবুদ্ধচরিতামৃত” কাব্যের নামকারণ। কবি সর্বানন্দের “শ্রীশ্রীবুদ্ধচরিতামৃত” কাব্যে মহাকবি অশ্বঘোষের কাব্যাদর্শ ও ধর্মভাব অতি সহজ সরল ও প্রাঞ্জল ভাষার পরিস্ফ’ট হইয়াছে, যদিও ইহাতে মাত্র পূর্বোক্ত চারিটি ছন্দেরই ব্যবহার আছে এবং এই কারণে ইহা গুরুঠাকুরী “ বৌদ্ধরঞ্জিকা”র সন্ততিই রা করিয়াছে।
অশ্বঘোষ এবং সর্বানন্দ, দুই বৌদ্ধ কবির ভাবে বৌদ্ধধর্ম মুখ্যত শরণাগতি এবং বুদ্ধও বৌদ্ধের মধ্যে উপাস্য-উপাসকের সম্বন্ধ। শরণাগতির মূল উৎস ভক্তি অর্থে ভাগবতী তদগত-চিত্ততা, তচ্চিন্তা ও তৎপরায়ণতা।উভয়েই পরাশ্রয়ে, অর্থাৎ ত্রিশরণপ্রভাবে নির্বাণ মুক্তিকামী। অতএব, উভয়ের পশ্চাঁতে আছে ভগবদ্গীতার শ্রীবাসুদেবোক্ত অধ্যাতœযোগ ও ভক্তিযোগ। বুদ্ধচরিত অভিশাপের বালাই নাই, অদৃষ্টবাদিতা না, অকুশলমূলতা নাই। সংস্কৃত কবি অশ্বঘোষের ভাবেই বাংলার কবি সর্বানন্দ বোধিসত্ত্বের আবির্ভাবে আদর্শ শাক্যরাজের বর্ণনা দিয়াছেনঃ-

“শান্তি প্রেমবাক্য আজ, অখন্ড ব্রক্ষ্মন্ড মাঝ,
সর্বজীবে করে উচ্চারণ।
কটুভাষা নাহি মুখে, সকলে পরম সুখে,
বুদ্ধগুণ করিল কীর্তন।
শত্র“ মিত্র সম হল ; শত্রুতা ঘুচিয়া গেল,
শত্রু মিত্র সঙ্গে সমস্বরে।
কাপাঁইয়া নভস্তল, করি সবে কোলাহল;
বুদ্ধগুণ গায় চরাচরে।”

মহাভারত বর্ণিত যাদব-আদর্শ ও পঞ্চপান্ডর-আদর্শের প্রতি বৌদ্ধ জাতককারের নিতান্ত বিরাগ। সে জন্য বাসুদেব বোধিসত্ত্বরূপে সম্মানিত হন নাই এবং কুরুরাজ্যাদর্শের প্রবর্তক যুধিষ্ঠিরগোত্রীয় রাজা অর্জনুকেও কাশীর রাজকুমারী কৃষ্ণার প্রণয়াসক্ত বিনিন্দিত পঞ্চপান্ডবের অর্জনু হইতে পৃথক করা হইয়াছে। কাজেই ঐ দুই আদর্শের উপর খড়গহস্ত হওয়া আধুনিক বৌদ্ধকরি সর্বানন্দের পে স্বাভাবিক। তিনি “শ্রীশ্রীবুদ্ধচরিতামৃতের” সূচনা ভাগে
লিখিয়াছিলেন ঃ- “জারজ পান্ডব বংশ অদর্মী কৌরব ,

পানদোষে কলূষিত পাপিষ্ট যাদব।
নানাবিধ দোষে দোষী ত্রিয় সকল,
শুধু শাক্যবংশ ছিল নিস্পাপ নির্মল।”

তথাপি যেমন রচনা , বর্ণনারীতি ও ভাবের দিক হইতে জাতবসাহিত্যে এবং অশ্বঘোসের কাব্যদ্বয়ে সংস্কৃত মহাভারত ও রামায়ণের সুস্পষ্ট, তেমনিই সর্বানন্দের বুদ্ধচরিতামৃতের পশ্চাতে আছে কাশীরাম দাসের মহামভারত ও কৃত্তিবাসের রামায়ণ, যাহা বাংলার বঙ্গভাষাভাষী বৌদ্ধগণের গৃহে গৃহে পঠিত হইত দিনের পর দিন, রাত্রির পর রাত্রি। নবীন সেনের প্রভাবও অস্পষ্ট নহে। তাঁহার কাপাঁইয়া নভস্তল বাক্যের পশ্চাতে আছে “পলাশীর যুদ্ধের” “কাপাঁইয়া নভস্তল, কাপাঁইয়া গঙ্গাজল।”

প্রাচীন মহাভারতে কৃষ্ণমহিমা কীর্তন এবং “শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃতোর” অবতারবাদের প্রভাবও সর্বানন্দ এড়াইতে পারেন নাই। তিনি লিখিয়াছিলেণঃ-“শুধু লোকাশিা আর সত্ত্ব পরিপাক,
মানব উদ্ধার হেতু নাশিয়া বিপাক;
ভুবনের হর্তা কর্তা হইয়া আপনি,
লোকশিা হেতু শুধু এসেছ ধরণী।” (শ্রীশ্রীবুদ্ধঃ, ১ম খঃ পৃঃ৬৭)

প্রাচীন বৌদ্ধসাহিত্যের কোথাও বুদ্ধকে বিশ্বের হর্তাকর্তা বলা হয় নাই, কারণ, তাহা বৌদ্ধচিন্তার বিপরীত ধারণা। ভগবান বুদ্ধ ভুলক্রমেও কৃষ্ণবাসুদেব অথবা প্রভু যীশুর ন্যায় নিজেকে অপরের ত্রাণকর্তা বলিয়া ব্যক্ত করেন নাই; তিনি শুধু পথ-প্রদর্শক। ঐ যুক্তি আছে গুপ্তযুগের মহাভারতের সভাপর্বে (৩৮-২৩) কৃষ্ণ সম্পর্কে ঃ-

কৃষ্ণ এব কি লোকানাং উৎপত্তিরপি চাব্যয়ঃ।
কৃষস্য হি কৃতে বিশ্বমিদং ভূতং চরাচরম্ ॥
ইহা নিশ্চিত যে, কবি সর্বানন্দ, মহাভারতাদি-প্রভাবিত অপোকৃত আধুনিক বৌদ্ধতন্ত্র সাহিত্য হইতেই উদ্ধৃত রচনার অনুপ্রেরণা পাইয়াছিলেন। প্রমাণ স্বরূপে একল্লবীর-চন্ড-মহ-রোষণ-তন্ত্রের নামোল্লেখ করা যাইতে পারে, যাহাতে বুদ্ধের মুখে নিম্নোদ্ধৃত উক্তিটি দেওয়া হইয়াছে ঃ-
সর্বোহহং সর্বব্যাপী চ সর্বকৃৎ সর্বনাশকঃ।
সর্বরূপধরো বুদ্ধে হর্ত্তা কর্ত্তা প্রভুঃ সুখী ॥
যেন যেনের রূপেন সত্ত্বা যান্তি বিনেয়তাং।
তেন তেনৈব রূপেণ স্থিতোহহং লোকহেতবে ॥

সর্বনন্দ বাংলার বুদ্ধ-কীর্তন এবং বৌদ্ধগান রচনা সম্পর্কেও পথ-প্রদর্শন করিয়াছিলেন। তাঁহার “শ্রীশ্রীবুদ্ধচরিতামৃত” রচনার পূর্ব হইতেই বাংলার বৌদ্ধসমাজে বুদ্ধসংকীতর্ন ও বৌদ্ধ গান রচনা আরম্ভ হইয়াছিল। ঠেগরপুণি গ্রামবাসী হ্রেফ গমধ বেসসন্তজাতকের উপাখ্যান অবলম্বনে সেকালের গাত্রার ধরণে “উইচান্দ্রা” নাটক লিখিয়াছিলেন গুরুঠাকুরী ভাষার। উহাতে কয়েকটি গানও সন্নিবেশিত ছিল। পাশ্চাত্যযুগে তাহারই পরিণতিতে পাহাড়তলীবাসী কিরণ বিকাশ মুৎসুদ্দি উন্নত ধরণে পঞ্চাঙ্ক নাটক “বেসসন্তর” রচনা করেন, যাহা “সংঘশক্তি” পত্রিকায় প্রাকশিত হয়। ১২৫৭ মগাব্দে, ১৮৯৫ খৃষ্টাব্দে আবুরখিলবাসী আন্তীয় বিশ্বম্ভর বড়–য়া অনেকগুলি “বুদ্ধ-সংকীর্তন” রচনা করেন, যাহাদের একটিও মুদ্রিত হয় নাই। চট্টগ্রাম শহরে মাঘোৎসবে গীত ব্রাক্ষ্মসংকর্তীকের রচনা করিয়াছিলেন। ঐ সময়ে রাঙ্গুনিয়া গ্রামের গুরুদাস কবিরাজও দুই একটি সংকীর্তন রচনা করিয়াছিলেন স্থানীয় কুমোরদের অনুকরণে। বীরেন্দ্রদাদার রচনায় ছিল সঙ্গীতের অভাব ও গদ্যের শুষ্কতা। তাঁহার রচিত এক সংকীর্তনের প্রথম পদ ছিল ঃ

“তোরা আয়রে পুরবাসিগণ. সবে করি বুদ্ধ-সংকীর্ত্তন।”
গোবিন্দচন্দ্রের রচনা কিছুটা সঙ্গীতের অভিমুখী হইলেও, তাহাতে পাই কষ্টকল্পনা ও সোজাসুজি আখ্যানের ভাব। উদাহরণ স্থলে ঃ-
“আজি শাক্যসিংহ চলে রে, আজি শাক্যসিংহ চলে রে,
জীবণের উদ্ধার তরে ।
পরিহরি রাজপুরী পিতামাতা সবারে।
মুকুলিতা স্বর্ণলতা দন্ডসুতা ছেড়ে রে।”
গুরুদাস কবিরাজের রচনার ছিল বুদ্ধের নাম-মাহাত্ম্য-প্রচার, যথা ঃ-
“অঙ্গুলিমাল ব্যাদ ছিল হে,
ওরে নামের গুণে তরে গেল, কি মধুর নাম।”
ঐ ধারায় মতিলালদাদা (মতিলাল তালুকদার) তাঁহার ১৯১৩ খীষ্টাব্দে প্রকাশিত বৌদ্ধ-ধর্মমূলক ুদ্র দৃশ্যকাব্য “শীলরেিত”র প্রস্তাবনায় ঈষৎ উন্নত ধরণে নিম্নোদ্ধৃত গান বা কীতনটি রচনা করিয়াছিলেন ঃ-

আয় রে ভাই সবে মিলে বুদ্ধনামের গুণ গাই।
বুদ্ধ নামে খঞ্জ ভান্ডার ; নিরবাণ শান্তির আগার ;
বুদ্ধনামের গুণে চল, সেই নিত্যধামে যাই।
তথা নিত্য শান্তি ভাই,-
রোগ শোক মনস্তাপ তথা নাহি পাই।
ঐ নামতরুর শান্তি-ছায়ার চল রে জীবন জুড়াই ॥”

আমার বিশ্বাস, মতিলালদাদার দ্বিতীয় গানটিতে হুবহুবীরেন্দ্রদাদার রচিত এক বিশিষ্ট সংকীর্তনের পদগুলির সদ্ব্যবহার করা হইয়াছে, যথা ঃ-
এস দয়াময়ে পূজি ভকতি-কুসুম লইয়ে।
হৃদয়ে হৃদয়ে এস রে মিলায়ে পড়ি তাঁর পদে লোটায়ে।
দয়াময় তিনি দয়ার আলয়, বিপদের বন্ধু সম্পদে আশ্রয়।
শুভ আশীর্বাদ মাগিগে উভয়ে নব প্রেমভূষা পরিয়ে।
সূর্য্যরশ্মি কিংবা বিমলচন্দ্রিকা নারে আলোকিতে হৃদয়ণিকা-
পারে শুধুতাঁর কৃপালোকে একা আলোকিতে হৃদি-আলয়ে।
এ আশীর্বাদ কর হৃদয়-রঞ্জন, পেয়ে সুদুর্লভ তনয়-রতন।
পাই যেন মোরা শান্তিনিকেতন যাব ভব ত্যজিয়ে।”

বীরেন্দ্রদাদার ‘মাগিগে সবাই‘র স্থানে ‘মাগিলে উভয়ে’ এবং “ধরম-রতন” স্থানে “তনয়-রতন” বসাইয়া মতিলালদাদার গানটি রচিত। বীরেন্দ্রদাদার “পারে শুধু তাঁর কৃপালোকে একা” পদটির পশ্চাতে ছিল ব্রাক্ষ্মদর্মের “ব্রক্ষ্মকৃপাহি কেবলম্” সত্যটি। পালি অধ্যাপক সুরেন্দ্রনাথ বড়–য়া তাঁহার এক অভিভায়ণে সাতবাড়িয়াবাসী শিক সঞ্জীব চৌধুরীরও কিছু কৃতিত্ব আছে বলিয়া স্বীকার করিয়াছেন, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এই অভিমতও প্রকাশ করিতে বাধ্য হইয়াছেন যে, কেহ যদি সাধনরস উৎসাহিত করিতেন, তবে কীর্তেন অভিব্যজ্ঞনার মর্মস্পর্শ করিতে পারিতেন।

শুনিয়াছি, উনাইপুরাবাসী জন্মেজয় পন্ডিত (জন্মেজয় বড়ুয়া) অনেকগুলি বুদ্ধসংকীর্তন রচনা করিয়াছেন। উহাদের নমুনা যাহা পাইয়াছি , তাহাতে মনে হয়, তাঁহার রচনার ধরণ অনেকাংশেই “গোবিন্দ পন্ডিতী”। পাহাড়তলীর মোহন মাষ্টার (মোহনচন্দ্র বড়ুয়া ) বুদ্ধের জন্ম,বিবাহ, সন্ন্যাস ও মারবিজয় , এই চারি স্তরে বিন্যাস্ত করিয়া স্বরচিত প্রতম খন্ড “বুদ্ধ-সংকীর্তন” ছাপাইয়াছেন। তাহা আমার হাতে এখনও আসে নাই। কেবল লোকমুখে জানিতে পারিয়েছি, তাঁহার রচনাভঙ্গী ও সুর সমস্তই বৈষ্ণব ধরণের। বৌদ্ধসঙ্গীতাচার্য পাচঁখাইনিবাসী উপেন্দ্রলাল চৌধুরীও বিভিন্ন সুরে ও রাগরাগিনীতে কতকগুলি বৌদ্ধগান বাঁধিয়াছিলেন অনেকটা বাংলা থিয়েটার ও বৈঠকের ধরনে। তাঁহার রছিত গানগুলি বৌদ্দ ধর্মাঙ্কুর সভার অধিবেশনগুলিতে বৌদ্ধ বালক সমিতি প্রায়ই গতী হইতে। ডি এল ধরণে ও সুরে রচিত দুইটি আধুনিক বৌদ্ধগানের কথা আমি জানি, একটি বীরেন্দ্রদাদার, যাহা “জগজ্জ্রোতি” পত্রিকার ৬ষ্ট বর্ষের ৬ষ্ঠ সংখ্যায় এবং অপরটি আমার, যাহা “বিম্ববাণী ” পত্রীকার ১ম বর্ষের ১ম সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। প্রথমটির পদঃ “বাজাও সকলে আশার রাগিনি গাও রে সকলে আশায় গান” এবং শেষের পদ “জাগিবে জাগিবে তাহারা জাগিবে হইলে শুধু তারা আগুয়ান। ” দ্বিতীয়টির প্রথম পদঃ “উঠির বিশ্বের সাম্য মন্ত্র গাহিতে সামবেদ।”

আমার চন্দননগর অবস্থানকালে শ্রদ্ধেয় হরিহর শেঠ ও বন্ধুবর নারায়ণ চন্দ্র দে-র সনির্বন্ধ অনুরোধে ১৯২৯ খৃষ্ঠাব্দে পাঁচ ছয়টি বৌদ্ধ গান রচনা করি স্বাধীন ভাবে। তাহাদের একটি হইল বৌদ্ধ জাগরণগীতি ঃÑ
“সুপ্ত ভারতে লূপ্ত গৌরব উঠিল পূনঃ জাগিয়া।
শুভ্র ঊষার স্নিগ্ধ কিরণ পূরিল বিশ্ব ভাতিয়া ॥
জয় জয় জয়, ভেরী নিনাদময়, মেদিনী উঠে কাঁপিয়ে।
অভয় অভয়, উঠে বিশ্বময়, স্থল-জল-ব্যোম ব্যাপিয়া ॥
ভুবন চক্রে বায়ু তরঙ্গ নাচে হিল্লোল সাথে মিলিয়া।”

এখন দেখিতেছি, আমার এই বৌদ্ধ জাগরণগীতি এবং মতিলালদাদার গান ও কীর্তযুক্ত “শীলরীত” নাটিকার বিষয়বস্তু সমস্তই সূললিত ভাষা পাইয়াছিল সর্বানন্দের শ্রীশ্রীবুদ্ধ-চরিতামৃতে বুদ্ধের মহিমা কীর্তনে ঃÑ
“কি সুখ সময়, হইল উদয়, অযুত ব্রান্ডে আজ।
নাচে দেগণ, শোকতাপচয়, আনন্দে কাটাব কাল ॥
গেল মৃত্যুভয়, শোকতাপচয়, আনন্দে কাটাব কাল।
মোহ যাবে দূরে, এ ভব সংসারে, ছিড়িবে মায়ার জাল ॥
কিবা শুভদিন, হইল বিলীন, হিংসা দ্বেষ শান্তি জলে।
‘অহিংসা’ এ বাণী, কি মধুর ধ্বনি, গাইবে সকলে মিলে ॥
কেহ না হিংসিবে, কেহ না কাঁদিবে, সকলে শান্তিতে রবে।
নাহিক ঘাতক, সকলি পালক, ঘুচিল শমনভয়।
জয় জয় জয় শ্রীবুদ্ধের জয়, হিংসা দ্বেষ হল য় ॥”
বৌদ্ধগান ও অধ্যাত্ম গীতিগাথার ধারা বহু প্রাচীন। ভারতীয় আর্যসংস্কৃতির ইতিহাসে ঋক ও সামের পরই পালি থের-থেরী গাথার স্থান। এই গীতি-গাথাসমূহে তালপুট এবং আম্রপালীর গাথাগুলি সুরতাল ও লয়যুক্ত অধ্যাত্মভাবের গান। আমরা দীঘনিকয়ের সক্কপঞ্হ সুত্তে বীণা-যোগে স্বর্গীয় গায়ক পঞ্চশিখ-গীত একটি দীর্ঘ দ্ব্যর্থক গান পাই, যাহার প্রথম দুইপদে আছে ঃ-
বন্দে ত পিতরং ভদ্দে তিম্বরুং সুরিয়াবচ্চসে,
যেন জাতাসি কল্যাণী আনন্দজননী মন।
যেমন ভারতচন্দ্রের “বিদ্যাসুন্দর” বিদ্যাপে বচনগুলি দ্বিবিধ অর্থ তেমন উদ্ধৃত গানে তিম্বরুপে ও সদ্ধর্মপে পদগুলির দুইটি স্বতত্র অর্থ।
আমরা সম্বুলাজাতকে পাই, নির্জনবনস্থিত আশ্রমে বিশ্বের সকলের নিকট শরণভিখারিণী দানবহস্তমুক্তা ও স্বামিপরিত্যক্তা সতী রাজদুহিতা সম্বুলার করুণগীতি ঃ-
সমনে ব্রাক্ষ্মণে বন্দে সম্পন্নচরণে ইসে।
রাজপুত্তং অপস্সন্তী তুয়্মহি সরণংগতা ॥
বন্দে সীহে ব্যগঘে চ যে চ অঞঞে বনে মিগা।
রাজপুত্তং অপস্সন্তী তুয়্হমহি সরণংগতা ॥
বন্দে ভাগীরথিং গঙ্গং বসন্তীনং পটিগগহং।
রাজপুত্তং অপস্সস্তী তুয়্হমহি সরণংগতা ॥
থের-থেরী গাথার ধারায় বহুশতাব্দী পরে রচিত হয় গবড়া, গুঞ্জরী, পটমঞ্জরী, দেবক্রী,দেশখ, ভৈরব ও কামোদ ইত্যাদি বিবিধ রাগে দ্ব্যর্থক ও অধ্যাত্মভাবদ্যোতক বহু পদাচার্যের বৌদ্ধ সহজিয়া মতের গান, যাহাতে আমরা পাই যেমন একদিকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রারম্ভ, তেমনই অপর দিকে হিন্দী ও উড়িয়া ভাষা ও সাহিত্যের আদি। সরপাদ গুঞ্জরী রাগে গাইলেন ঃ-
“অপনে রচি রচি ভবনির্বাণা
মিছে’ লোঅ বন্ধাবও অপনা ॥
অন্তে ন জানহ অচিন্ত জোই
জাম মরণ ভব কইসণ হোই ॥
জীবন্তে মঅলে নাহি বিশেষো ॥ (ধ্র“পদ)
উড়িষ্যার গড়জাত অঞ্চলের মহিমাধর্মী বৈষ্ণবগণ গুপ্ত মহাযানী বৌদ্ধ কিনা বলা শক্ত, কারণ তাঁহাদের “অর্জুন বুদ্ধ হইলে জীব, পরম হৈলে কৃষ্ণ” উক্তিতে “বুদ্ধ” অর্থে বদ্ধ। তবে প্রাচ্যবিদ্যামহার্ণব নগেন্দ্রনাথ বসুর পদত্ত পাঠ শুদ্ধ হইলে, তাহাঁদের ভজন গীতিতে বৌদ্ধ সহজিয়া মতের গানের ধারা অব্যাহত আছে বলিতে হয় ঃ-
“চাহি কলিমধ্যারে ভকতে ছন্তি রহি
বুন্ধ অবতার রূপ দর্শন না পাই
বিহারমন্ডলে শূণ্যগাদি তুলাইবে
সে অলেখ প্রভু ধুনিকুন্ডে গুপ্ত নিবে।
মায়ারূপে বুদ্ধ অবতারে নরদেহী
ভক্তজনহিতে ভক্ত উদ্ধারিবে পাই।”

এই ভজন পদগুলির মধোও আমি দেখি, “বুদ্ধ” শব্দটি বস্তুত ‘বদ্ধ’ ‘মায়াবদ্ধ’ অর্থেই ব্যবহৃত এবং তাহাতে কৃষ্ণের নরদেহধারী অবতাররপের কথাই আছে। বুদ্ধের সহিত মায়ারূপের সম্বন্ধ কল্পনা নিতান্ত অবৌদ্ধজনোচিত। আমরা পূর্বে “মঘা খমুজা” আলোচনা প্রসঙ্গে দেখিয়াছি, প্রভু নিরঞ্জন বা অলেখ বুদ্ধ নহেন, তিনি পূর্বে “মঘা খমুজা” আলোচনা প্রসঙ্গে দেখিয়াছি, প্রভু নিরঞ্জন বা অলেখ বুদ্ধ নহেন, তিনি জগতের সৃষ্টি স্থিতি ও সংহারকর্তা ঈশ্বর এবং তাঁহার সহিতই প্রকৃতি বা মায়ের সম্বন্ধ। এই সত্যটি প্রাচীন বৌদ্ধগানের ধারায় রচিত সাধু শিবচরণের “গোজেনের লামা” তেও সুস্পষ্ট, যথা ঃ-
“গোজেন মেইয়া (ঈশ্বরের মায়া) উদ (অন্ত) নেই,
বুঝি পারি কে ভাই সেই ?
পরম বৃে ভর দিয়া (দেহ ধারণ করিয়া)
বুঝি পারে কে তোর মেইয়া (মায়া)!”

যতই না কেন চেন্তা ও বেদান্তের ধারা একত্রে মিলিত হউক, বৌদ্ধরা জাে কোনটি কি। কাজেই গোলে হরিবোল দিয়া একের সহিত অপরের গোলোযোগ ঘটাইলে চলিব কেন ? এই ভাবেই সর্বানন্দ এবং বাংলার অন্যান্য বৌদ্ধ কবি ও লেখকগণের ভাবধারা গ্রহন করা আবশ্যক।
“জগজ্জ্যোতি” ও “শ্রীশ্রীবুদ্ধচরিতামৃত” ব্যতীত কবি সর্বানন্দের “ঋষি-সন্দর্শন” নামে অপর একটি অপ্রকাশিত পদ্য রচনার সংবাদ পাই। “সন্দর্শন” জাতীয় রচনার ধারাও আমরা বাংলার বৌদ্ধ কবি ও লেখকগণের মধ্যে দেখি “ঋষি-সন্দর্শনে”র পূর্বে নবরাজ রচিত “মহাবোধি সন্দর্শন” এবং পরে “তরুণ বৌদ্দ” পত্রিকায় প্রকাশিত অনুজ দীনেন্দ্রকুমারের “মহামুনি সন্দর্শনে ” শীষর্ক সুন্দর কবিতাটি।
পাঁচরিয়ার অঙ্কশাস্ত্রজ্ঞ বিপিন মাষ্টারের (বিপিনচন্দ্র ) সম্পাদকত্বে এবং পরে নিজ সম্পাদকত্বে “বৌদ্ধ পত্রিার’র প্রচার ও পরিচালন সর্বানন্দের কৃতিত্বের পরিচালক। তখন তিনি ছিলেন চট্টল বৌদ্ধ সমিতির বিরুদ্ধবাদী মোক্তার সর্বানন্দ। উক্ত পত্রিকার জন্মকাল ১৯০৬ সাল এবং পরমায়ু মাত্র দুই বৎসর। ইহাতেই ধারাবাহিকভাবে তাহাঁর “জগজ্জ্যোতি” প্রকাশিত হইতেছিল। “বৌদ্ধ পত্রিকা”র কঠোর মন্তব্য ও টিপ্পনীর ঠেলার স্থানীয় বৌদ্ধ সমিতি সতীশকাকার (সর্বজনপ্রিয় সতীশচন্দ্র বড়ুয়া) সম্পাদকত্বে সমিতির পূর্ব মুখপত্র “বৌদ্ধবন্ধু”কে পুনর্জীবিত করিতে বাধ্য হইলেন। এ স্থলে স্মরণ রাখা আবশ্যক, বাংলার বৌদ্ধগণের নবজাগরণের আদিতে তাহাঁদের অবিসম্বাদিত নেতা সাতবাড়িয়াবাসী কৃষ্ণ নাজির (কৃষ্ণচন্দ্র চৌধুরী)-ই উহার জনক ও পরিচালক। উহার পরপর বাংলা ও ইংরেজী সংস্করণ প্রকাশিত হইতে। “বৌদ্ধ বন্ধু” বহুবার মরিয়া বহুবার বাঁচিয়াছে। প্রতিদ্ভন্দ্বী “বৌদ্ধ পত্রিকা”র সঙ্গে মরিয়া বহুদিন পরে বৌদ্ধ ধর্মাঙ্কুর সভার মুখপত্ররূপে প্রকাশিত দীর্ঘকাল স্থায়ী “জগজ্জ্যোতি”র প্রতিদ্বন্দ্বিরূপে পুন্নানন্দ সামীর সম্পাদকত্বে পুনর্জীবিত হইয়া আবার অন্তর্দ্ধন করে বিপরে সঙ্গে সঙ্গে। পাচঁ ছয় বৎসর পূর্বে তাহা আবার জয়দ্রথ চৌধুরী ও প্রফুল্লকুমার বড়–য়ার যুক্ত সম্পাদকত্বে পুনর্জীবন লাভ করে বঙ্গীয় বৌদ্ধ সমিতি পরিচালিত “জগরনী”র প্রতিদ্বন্দ্বিরূপে এবং বর্ষকালের মধ্যেই পুনারায় অস্তমিত হয় “জাগরণী ” কে মোহনিদ্রাবিভোর করিয়া এমন কি অধ্যাপক প্রকৃতিরঞ্জন বড়–য়ার সুলিখিত “পাপলোভাতুর” গল্পটি সহ। খ্যাতনামা রাজদূত (রায় শরচন্দ্র দাস বাহাদুর) স্থাপিত বুদ্ধিষ্ট টেকষ্ট সোসাইটির বহু তথ্যপূর্ণ জর্ণেল, অণাগারিক ধর্মপাল স্থাপিত মহাবোধি সোসাইটির “দি মহাবোধি” আমার ও নেপালবাসী ধর্মাদিত্য ধর্মাচার্যের যুগ্ম সম্পাদকত্বে পরিচালিত এবং রেঙ্গুন প্রিন্টিং ওয়ার্কস হইতে প্রকাশিত “বৌদ্ধবাণী”, আবুরখিলবাসী নির্মলচন্দ্র বড়ুয়া সম্পাদিত “উয়য়” এবং ধীরেন্দ্রলাল বড়ুয়া ও গজেন্দ্রলাল চৌধুরীর যুগ্ম সম্পাদকত্বে “সম্বোধি” প্রভৃতি সমস্তই কৃষ্ণচন্দ্রের “বৌদ্ধবন্ধু”র পরবর্তী।

“বৌদ্ধ পত্রিকা”য় প্রকাশিত সর্বাশিত সর্বানন্দের মন্তব্য ও টিপ্পনীতে বৌদ্ধগণের চমক ভাঙ্গিয়াছিল, সকলেই যেন ঔৎকন্ঠার সহিত অপো করিত-না জানি এবার কাহার পালা। “লাল-দীঘির পাড়ে ত্রিমূত্তির্র আকির্ভব”, “বেনী আর কোষে ফটিক চাঁদ কোষাধ্য”, “কোথায় সে দিনের রসিকতা আর কোথায় এদিনের রসিকাত” ইত্যাদি হে’য়ালিপূর্ণ উক্তিগুলির কটা কাহার প্রতি ছিল, তাহা স্থানীয় বৌদ্ধ পাঠক সহজে অনুমান করিতে পারিতেন। ইহাতে সর্বানন্দের প্রতুৎপন্নমতিত্ব, অনুসন্ধিৎসা ও সৎসাহসের ছিল।

সর্বনন্দ মেধাবী ও কৃতী ছাত্র ছিলেন। বৌদ্ধছাত্রদের মধ্যে যাহাঁরা সেকালে এন্ট্রান্স পাশ করিয়া চট্টগ্রাম কলেজে এল-এ কাসে পড়েন, তিনি তাহাঁদের অন্যতম। কলেজে দুই বৎসর পড়িয়া তিনি নিলেন দারোগাগিরি। তাহা ছাড়িয়া নিলেন মহামুনি মধ্য ইংরেজী স্কুলের মাষ্টারী এবং শেষে তাহা ছাড়িয়া শহরে করিতে গেলেন মোক্তারী। দারোগা সর্বানন্দ উগ্রপ্রকৃতি ও ক্রোধী, মাষ্টার সর্বানন্দ কঠোর ও কোমল এবং মোক্তার সবার্নন্দ অন্যায়বিরোধী ও স্পষ্টবাদী। নির্ভীকতা এবং সত্যবাদিতাই তাঁহার চরিত্রের বৈশিষ্ট্য। তিনি একাধারে ছিলেন বুদ্র ও শিব। তবে দারোগা ও মোক্তার সর্বনন্দকে দিয়া কবি সর্বানন্দের অন্তর্জীবনের পরিচয় হয় না। কবি ছিলেন বহু ঊর্দ্ধে , বুদ্ধের নিতান্ত অনুগত ভক্ত ও সেবক।

তথাপি তাঁহার কবিজীবনের যোগসূত্র ছিল সুদূর অতীতের মধ্যে। আমরা জাতক প্রন্থে, ললিতবিস্তর ও বুদ্ধচরিত প্রভূতি প্রাচিন বৌদ্ধ প্রন্থাদিতে যে সকল বর্ণনা ও ভাব বৈচিত্র্য পাই, ঠিক তাহা পাই তাঁহার রচনার মধ্যে। বিশ্ব প্রকতির সহিত তাঁহার প্রত্য সম্বন্ধ এত অল্প যে তাহা নাই বলিলেও সামান্য। তাঁহার রসিকাতর মধ্যে পাই ব্যঙ্গোক্তি ও বিরক্তিকর তীব্রতা ; তেমন সরসতা ও নির্বিকার চিত্ততা উহাতে নাই। বুদ্ধাদর্শ তাহার মানস চে সব চেয়ে উজ্জ্বল হইলেও তিনি বৌদ্ধ প্রগতির ধারায় এ সকল অভাব ওত্র“টি পূরণের জন্য অপর লেখক , কবি ও সাহিত্যিকের প্রয়োজন ছিল। সেই সন্ধিণে বাংলার বৌদ্ধসমাজে উদিত হইলেন বীরেন্দ্রলাল মুৎসদ্দি।
বীরেন্দ্রদাদার যুগকে বলা যাইতে পারে বাংলার বৌদ্ধ সাহিত্যের এক নবযুগে। তিনি তাঁহার সহপাঠিদের মধ্যে রচনাপটুতার জন্য খ্যাতি অর্জন করিয়াছিলেন, তখনকার চট্টগ্রাম কলেজ ও কলেজধীন স্কুলের প্রিন্সিপ্যাল প্রমুখ শিকগণের চরিত্র বিচারে । যদিও পূজনীয় শিকগণের চরিত্র বিচারজনিত অপরাধের জন্য তিনি পরজীবনে লজ্জিত, তথাপি ইহাই তাঁহার প্রথম কবিতা রচনা বলিয়া তাহাঁরই অনুমতিক্রম বিনীতভাবে উহার কিয়দংশ উদ্ধৃত করিতেছি। তিনি ১৮৯৬ সালে লিখিয়াছেন ঃ-
“এ কে সেন লার্ণেগ ম্যান বাক্যবাণ বিষম,
এস কে রায় ফিসফিসায় ভীরুতায় পরম।
বেনীব্রাক্ষ্ম মৈত্রী সাম্য স্বাধীনতা লাভার।
বি কে মিত্র কৃষ্ণগাত্র অঙ্কশাস্ত্রে নিপুণ,
উমাকান্ত অতি শান্ত বয়সেও প্রাচীন।
পি লস্কর ভয়ঙ্কর মূর্ত্তি ধরে অল্পেতে,
কে কে চক্র কুব্জ বক্র ঘৃণা জাগে ভেটকিতে।
কৃষ্ণদাস বারমাস রোগারোগা চেহারা,
পূর্ণ দত্ত নিয়োজিত সপ্তমেতে পাহারা।
দুর্গাদাস অত্যুচ্চাশ বিনয়ের আগার,
আমিরালী একা খালি মোসলেম মাষ্টার।”

তাঁহার “আমার সংকল্প”, “সাসনা ” ও “জীবন” শীষর্ক চারিটি ককিতা, আমি পড়িয়াছি। চারিটিই “জগজ্জ্যোতি” পত্রিকার ১ম ও ২য় ভাগে প্রকাশিত হইয়াছিল। আমি তাঁহার কবি প্রতিভার পরিচয় পাইয়াছি “জীবন” নামীয় চর্তুদশপদী কবিতায়।বাংলা সাহিত্যে মাইকেল মধুসূদই প্রথম চতুর্দশপদী কবিতায় রচয়িতা। বীরেন্দ্রদাদার বিষয়বস্তু মাইকেল হইতে স্বতন্ত্র। তাঁহার প্রথম কবিতায় আছে বৌদ্ধ সন্ততির সত্যতা, যাহাতে ব্যক্তিগত জীবনধারার অর্থ ও পরিণতি সম্ভব হয়। দ্বিতীয় কবিতায় আছে মানজীবন ও চরিত্রের বিকাশ পদ্মের উপমায়। এই উপমা ও উদ্দিষ্ট সুন্দর ভাবটি বুদ্ধের উপদেশে সুলভ হইলেও কবিতায় তাহাঁর প্রকাশভঙ্গী ও বর্ণনারীতি নতুন এ হৃদয়গ্রাহী।

জীবন (১)“দৃষ্টির সীমান্তে হেথা সুনীল গগণ
ঢলিয়া পড়েছে নীল আকাশের গায়।
এথা শিলাময় তীরে শিলাময় শৈল
ধরি দেবমূর্ত্তি বুকে কিবা মোভা পায়।
সে দেবমূর্ত্তি বুকে কিবা শোভা পায়।
তরঙ্গের মাঝ দিয়া তরঙ্গ আকারে
উটিয়া মিলিয়া পুনঃ মিলিয়া উঠিয়া
আসিয়া মিলিছে এই শৈলময় তীরে-
কহিয়ে আমারে,-যেন বুঝি মনোভাব,
‘জীবন এমন তব জীবন এমন,
মোহ চক্রবাল হ‘তে লভিয়া জন্ম,
এই তরঙ্গের মত উটিয়া পড়িয়া
চলিয়াছে অবিরাম বহুজন্ম পরে
আপনি মিলিয়া যা‘বে নির্বাণের তীরে।”
(২) “সরোবরে পঙ্কমাঝে লভিয়া জন্ম
যেমন পঙ্কজ ওই ধীরে ধীরে ধীরে
শিকড়, মৃশাল, পত্র, পাপড়ি, কোরক
একে একে সন্তর্পণে করিয়া সঞ্চয়,
নিরমল বারিরাশি করি অতিক্রম
উদার আলোকরাজ্যে, উন্মুক্ত অনিলে
ফুটাইয়া আপনারে বিতরে স্ববাস
চারিদিকে ধরি হৃদে উষার শিশির’
তেমনি জীবন অবিদ্যর অন্ধকার
লভিয়া জনম সাধ্যু কর্ম্মে সাধ্যু কর্ম্ম
করিয়া যোজনা অপ্রমত্তে। দিনে দিনে,
বিকাশি আপনা জ্ঞানালোকে প্রেমানিলে।
করে দয়া বিতরণ ভুলিয়া আপনা,
নিরন্তর রাখি হৃদে অহিংসা করুণা।”

তাঁহার পূর্বে ও পরে এবং সবসময়ে বাংলার বৌদ্ধদের মধ্যে অনেকে গদ্য প্রবন্ধ ও বই লিখিয়াছিলেন, কিন্তু এ জাতীয় রচনা সাহিত্যে স্থান পায় না। উদাহরণ স্থলে, খুল্লমাতামহ কালীকিঙ্কর মুৎসুদ্ধি গদ্যে বহু সামাজিক প্রবন্ধ লিখিয়াছিলেন। তাঁহার রচনা স্তিরঙ্গ, উহাতে রচনা-বৈশিষ্ট্য নাই। বীরেন্দ্রদাদা “বৌদ্ধবন্ধু” ও “জগঞ্জ্যোতি” পত্রিকায় কয়েকটি গদ্য প্রবন্ধ ছাপাইয়াছেন। তাঁহার তিনটি রচনা প্রসিদ্ধ যথা, চট্টগ্রাম বেদ্ধৈ সমিতির এক বার্ষিক অধিবেশনে পঠিত অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতির অভিভাষণ এবং “সূবর্ণ মন্দির” ও “সর্বধর্ম” অনাত্মা” শীর্ষক প্রবন্ধ। উক্ত অভিভাষণ সম্বন্ধে “ধীরমতি” পিতৃব্য রেবতীরমণ বড়–য়া যে অভিমত প্রকাশ করিয়াছিলেন, তাহা এইঃ “ইহার ভাষা আড়ম্বরহীন। স্বচ্ছ, প্রবহমানা ও প্রসাদগুণবিশিষ্ট, এ রচনা-প্রণালী উন্দর, বিশুদ্ধ ও মর্যাদাসম্পন্ন: বর্ণনাভঙ্গী নিতান্ত আধুনিক, সর্বোপরি সাজাইবার সুন্দর কৌশল ইহাতে আছে। অতি অল্প সংখ্যক লোকই এই গুণেল অধিকারী।” এই সুচিন্তিত মন্তেব্যের অনূকূলে বীরেন্দ্রদাদার “সূবর্ণ মন্দির” সন্দর্ভের কিয়দংশ উদ্ধুত করিয়া ান্ত হইব। তিনি ইহার উপসংহার অংশে লিখিয়াছেনঃ “মন তখন লোভহীন, দ্বেষহীন, জ্ঞানময় হইয়া উঠে। বাহ্য ঘটনা তখন আর তাহাকে হেলাইতে পারে না। মন বুঝিয়াছে সমুদয় অনিত্য, কাহার প্রতি লোভ করিব, সকলেই দুৎখভোগ করিয়াতেছে,Ñআর দ্বেষ করিয়া কাজ নাই। অসত্যে মোহিত হইব না। দুঃসময়ে সংসারের দুঃখ লাঘব করিব, সকলকেই দয়ার শীতল ছায়ায় ঢাকিয়া রাখিব। এইরুপে সমস্ত দিনের সমস্ত চিন্তা জুড়াইয়া আর একটা নিত্য সত্য শান্তি-রাজ্যের অস্তিত্য উপলব্ধি করিয়া, সাদ্ধ-জীবন, প্রেম-জীবন যাপনের নিমিত্ত নবীন বল সঞ্চয় করিয়া আলো ভালোবাসিবার জন্য, আরো জীবহিত করিবার জন্য ব্যেদ্ধ নরনারী স্ব স্ব গৃহে প্রত্যাবর্ত্তন করেন। এই পূণ্যমূর্ত্তি সূবর্ণমন্দিরের পূণ্যময় ছায়াতলে দাঁড়াইয়া জীবনের এক পূণ্যময় মূহূর্ত্তে এই পূণ্য দৃশ্য দেখিতে দেখিতে আমার পণেও গাহিতে পারিয়াছিলঃ
উঠ এস ভাই; এথা নাহি উঠে ধূলা,
ফুলবাস বহিছে সুন্দর;
জীবন হইবে তব আনন্দের মেলা
শান্তিময়ী প্রেমের নির্ঝর।”

রেবতীকাকার অভিমত অনুযায়ী আরও দুইটি গদ্য রচনা পাই ঐ সময়ে গগনকাকার দুইটি ঠেৎছাট লেখাতে। দুইটিই “জগঞ্জ্যোতি” পক্রিকার প্রথস ভাগে প্রকাষিত হয়। একটির নাম “কি লিখিব ছাইভষ্ম” দ্বিতীয়টি “বুড়দাদার পত্র”। প্রথমটির শেষভাগে কাকা লিখিয়াছেনঃ “যে ভাষার ভাষ্য লিখিয়া বুদ্ধঘোষ অমর কীর্ত্তিলাভ করিয়াছেন, যাহা মহাজন বাক্য বলিয়া অর্চিত হইত, এখন তারা মৃতভাষা। সেই দেব ভাষা আজ উচ্চ মূল্যে শ্বেতদ্বীপ হইতে ক্রীত হইয়া থাকে। তাই বলি, আজ ভারত অন্তরতলে সেই ভষ্মরাশি কিয়দংশ চিরমলয়ানিলসঞ্জাত সিংহলদ্বীপে রতি হইয়াছিল বলিয়া তাহাও একটি পূণ্যত্রে পরিণত হইয়া আছে। রজতশুভ্র রাজনিকেতন হইতে এই ভষ্মরাশি বে করিয়া রাজপুত্র মহেন্দ্র ও রাজকন্যা সংধ্যমিত্রা উর্মিমালা অতিক্রম করিয়া এই রম্যদ্বীপে বৌদ্ধধর্ম প্রবর্ত্তন করিয়াছিলেন বলিয়া এখনও মহাবংস উজ্জল অরে গৌরব কীর্ত্তন করিতেছে। তাই কবি গহিয়াছেনঃÑ
“যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখ ভাই,
পাইলেও পাইতে পার অমূল্য রতন।”

ভীরেন্দ্রদাদার গদ্যপদ্য সকল রচনাই বৌদ্ধ কিয়বা বৌদ্বধর্ম সম্বন্ধে। যদিও ইংরেজী এবং বাংলা সাহিত্যের সহিত তাঁহার যথেষ্ট পরিচয় ছিল, তিনি বৌদ্ধগন্ডী ছাড়াইয়া বিশেষ কিছুই লিিিখতে যান নাই। এই সংকীর্ণ হন্ডী পরিহারের পথে কালীকিঙ্কর মুৎসুদ্দি লিখিত “চট্টলউল্লাস” এবং মতিলালদাদার কবিতাগুলি বিশেষ উল্লেখযোগ্য। পুণœানন্দ সামী মতিলালদাদার পরিচয় প্রসঙ্গে লিখিয়াছেন যে, তাঁহার কবিত্ব শক্তি উন্মেষের মূলে ছিল একদিকে পিতৃগুণ এবং অপর দিকে বীরেন্দ্রদাদার ছোট বাই রাজেন্দ্রলাল মুৎসুন্দির সহিত প্রতিযোগীতা।
আমার পূর্বে তাঁহার ুদ্র দৃশ্যকাব্য “শীলরেিতর বিষয় আলোচনা করিয়াছি, যাহার উপাখ্যান অংশ তিনি শীলকবাসী কবিরাজ নগেন্দ্রলাল বড়–য়ার “বৌদ্ধ কাহিনী সংগ্রহ” হইতে পাইয়াছিলেন। ইহার একটি সর্মস্পর্শী ঃÑ
“যেমন সবার প্রাণ উহারো তেমন।
যেই প্রাণ দিতে নারী, কেমনে কাড়িয়ে
স্বেচ্ছায় লইব তাহা, বলুন রাজন।”

তাঁহার রচিত কবিতাগুলি সমস্তই “নবীন সেনী”। অবকাশরজিনীর নামের সঙ্গে মিলাইয়াই তিনি তাঁহার কবিতাসংগ্রহের নামকরণ করিয়াছিণের “অবসরতোষিণী”। ইহার মাত্র একটি কবিতা আমার ভাল লাগিয়াছে-“উদ্যান ভ্রমণ প্রথম দিবস ও দ্বিতীয় দিবস।” কবি কল্পনার নাথে প্রকৃতির সকল বস্তু ও জীব নিরীণ করিয়া সকলের মধ্যে সৌন্দর্য ও শিণীয় বিষয় দেখিয়াছিলেন। পরে তিনি ব্রদেশে গিয়া “ব্র সুন্দরী” নামে এক কাব্য লিখিতে আরম্ভ করেন অমিত্রার ছন্দে। ইহার প্রারম্ভে তিনি বাগদেবীর অরাধনা করিলেন যাহাতে ব্রদেশের নরনারীর ব্যভিচার ও কুৎসিত জীবন বর্ণনা করিয়া ঐ বিষয়ে দেশবাসীকে নাবধান করিতে পারেন। ইহাতে বাণী তাঁহার প্রতি প্রসন্ন হন নাই এবং তাঁহার প্রথম সর্গ শেষ না হইতেই তাঁহার কাব্য-রচনা বন্ধ হইয়াছে। ব্রজাতির। সব কিছুতে কুৎসিতদর্শী “ব্র সুন্দরীর” ১ম সর্গের রচয়িতা “উদ্যান ভ্রমণ” এ প্রকৃতির সর্বত্র সৌন্দর্যদর্শী কবির প্রেতমূর্তী মাত্র।
তাঁহার পরে বাংলায় বৌদ্ধসমাজে দুই একজন সামান্য সামান্য কবি দেখা দিলেন যাঁহাদের প্রতিভার বিকাশ হইতে পারিল না পরমায়ুর অভাবে। আমরা তাঁহাদের রচনায় বৌদ্ধ এবং অপর বিষয়ের প্রতি সম অনুরাগ দেখি। আমার জানা দুই জন বৌদ্ধ কবি এই নতুন পথের পথিক। প্রথম, আব্দুল্লাপুরবাসী হরিরশচন্দ্র বড়–য়া, যাঁহার রচিত কতকগুলি কবিতা “বৌদ্ধবন্ধু”তে প্রকাশিত হয়; দ্বিতীয় সাতবাড়ীয়বাসী সহপাঠী বিমলবিনোদ বড়–য়া, যাঁহার উচ্ছাস, ভিুগণের প্রতি, ‘জীবন সঙ্গীতম বর্ষকথা, বন্ধুত্ব, আষা ইত্যাদি নানা বিষয়ে রচিত ছোট বড় কবিতাগুলি “জগঞ্জ্যোতি” পত্রিকার প্রথম বর্ষ হইতে প্রকাশিত হইতে থাকে। অন্যান্য বিষয়ের প্রতি তাঁহাদের আগ্রহাতিশষ্য থাকিলেও বিমলবিনোদের েেত্র একথা সত্য যে, তাঁহার বৌদ্ধ বিষয়ক ‘বন্ধুত্ব’ কবিতাটিই সর্বোৎকৃষ্ট ঃ
“ষান্ত স্নিগ্ধ তরু ছায়ে দাঁড়ায় আপনহারা-
গভীর ভাবনাবশে আধেক নয়ন মুদি
চিন্তিল যুবক যোঘী কেন ব্যাধি, মুত্যৃ জরা,
এ অনন্ত জগতের কোথা অন্ত কোথা আদি?”
মহিমদাদার (মহিরাঞ্জন বড়ুয়া), রেবতীকাকার, আমার এবং অপূর্বরঞ্জনের বি-এ ও এম-এ পাশের দিন হইতে বাংলার বৌদ্ধসমাজে ও সাহিত্যে পাশ্চাত্য যুগের সৃষ্টি হয় যাহার বর্তমান উচ্ছৃঙ্খল অধ্যায়ে শিতি বৌদ্ধদের অনেকেই বহির্মূখী। পূর্ব ও পরের মধ্যে সঙ্গতি রা করিয়া চলিয়াছে পূর্ব প্রিয়ছাত্র ও আত্মীয় শীলকনিবাসী কবি ও লেখক মুনীন্দ্রলাল বড়–য়া এম-এ। ‘সিদ্ধার্থের সাধনা’, ‘করুণা’, ‘মিলটির স্বষ্ম,(তরুণ বৌদ্ধ) ‘জুমিয়া সঙ্গীত’, ‘রবি-কল্যাণ-রবীন্দ্রনাথের প্রতি’, ‘ধমূপদ হইতে অনুবাদ’ (দেশ), নারীর আবরণ; অঙ্গুলিসাল, ‘অর্ন্ধকামী, আনোমা, ভিু, লীলাময়ী, রবীন্দ্র মহাপ্রয়াণে বুদ্ধের জীবনের কয়েকটি ঘটনা, কালি ও কলম (সংঘশক্তি), পথ ও শে দীা (বঙ্গশ্রী) তাঁহার রচিত কবিতাবলী। অকুতজ্ঞ (তরুণ বৌদ্ধ), মহাস্থবির কালীকুমার, বৌদ্ধ গার্হস্থ্য ধর্মের আদর্র্শ” (সংঘশক্তি), নাট্যচার্য অমুতলাল (শ্যামবাজার এ-ভি স্কুল ম্যাগাজিন) এবং বন্ধুবর্ণিত স্বাধীন জাতির আদর্শ’ (দেশ) তাঁহার গদ্য রচনাবলী। বীরেন্দ্রদাদা ও গগকাকার গদ্যের সন্ততিরুপে তাঁহার অমৃতলাল প্রবন্ধ পাই “মানুষের…….বড়ই একা ও দীন।”

আবুরখিলবাসী শশাঙ্কবিমল বড়–য়া স্বগ্রামের পথ প্রদর্শকত্রয়কে উদ্দেশ্য করিয়া লিখিয়াছেনঃ “হে..বা কম কিসে?” “নবযুগের প্রারম্ভ হইতে আজ পর্যন্ত বাংলা ভাষায় বৌদ্ধ সমাজে সাহ্যি রচনার প্রচেষ্টগুলিকে প্রধানত ছয়টি ধারায় বিভক্ত করা চলে। যথা Ñ (১) গদ্য ও পদ্র অুবাদ। (২) অপর গ্রন্থের সংপে কিংবা বিস্তার, (৩) সংগ্রহ, (৪) বিবিধ ব্যাখ্যা ও সন্দর্ভ, (৫) প্রতিবাদ ও সমালোচনা (৬) মৌলিক রচনা। মাতুল সৌরীন্দ্রমোহন মুৎসুন্দির ‘জাপানী বৌদ্ধ সম্প্রদায়’, প্রজ্ঞালোক স্থবিরের ‘মিলিন্দ প্রশ্ন’ জ্যেতিপাল ভিুর ‘উদ্যান’ মুনীন্দ্রপ্রিয় (প্রজ্ঞানন্দ) ভিুর সুবোধলঙ্কর, বিশুদ্ধানন্দ মহাস্থবিরের ‘কচ্চায়ন’, ‘কচ্চায়ন’ ‘বালাবতার’, ‘ প্রতিমো’; অর্যবংশ ভিুর সুবোধালঙ্কর’, বিশুদ্ধানন্দ মহাস্থবিরের ‘ভক্তি-শতক’ প্রথম ধারার অন্তর্গত। ধর্মতিলক ভিুর ‘সারসংগ্রহ’ ও কায়বিজ্ঞান’ এবং প্রজ্ঞালোক স্থবির কৃত’গৃহী কর্ত্তব্য, ভিু কর্ত্তব্য, দান মঞ্জরী’, ‘ধর্ম সংহিতা’ প্রভূতি দ্বিতীয় ধারার অন্তর্গত। কবিধ্বজ গুণালঙ্কারের ‘ধর্মপ্রসঙ্গ’ ; কালীকুমার মহাস্থবিরের চন্দ্রকুমার জাতক, কবিরাজ তারকবন্ধু বড়–য়ার ‘নাগলীলা’ এবং বিমলানন্দ ভিুর ‘বেশ্বন্তর’ প্রবূতি তৃতীয় শ্রেণীর অন্তর্গত। প্রজ্ঞানন্দ ভিুর বুদ্ধের অভিযান’, বংশদীপ মহাস্থবীরের ‘প্রজ্ঞাভাবনা’ সুবলচন্দ্র বড়ুয়ার ‘নামরুপ’ ধনঞ্জয় বড়ুয়ার ‘কর্মফল’ এবং জ্ঞানীশ্বর মহাস্খবীরের ‘পালি প্রবেশ’ প্রভূতি চতুর্থ ধারার সহিত যুক্ত। নারায়ণ পত্রিকায় মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী লিখিত ‘বৌদ্ধধর্ম’ শীর্ষক প্রবন্ধের প্রতিবাদে (বড়মামা দনিারঞ্জন মুৎসুন্দি লিখিত) এবং শনিবারের চিঠিতে রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র সেনের ‘শ্যামল ও কজ্জ্বল’ গল্প বইয়ে সমালোচনা পঞ্চম ধারার অন্তর্গত। বাগ্মী সুরেন্দ্রলাল মুৎসুন্দি রচিত ‘বৌদ্ধ নাটিকা’, (অধুনা অধ্যাপক) সুরেন্দ্রনাথ বড়–য়া রচিত ‘পরশমণি’ নামক ছোট নাটক, মোক্তার কিরণবিকাশ মুৎসুন্দি প্রনীত ‘বেস্সন্তর নাট ও কবিতা, পন্ডিত অনন্তকুমার বড়–য়া রচিত সম্বোধি শীর্ষক কবিতাটি রাজেন্দ্রলাল বড়–য়া বি-এল, নিবারণচন্দ্র বড়–য়া বি-এ, এবং মেসোমহাশয় পুলিনবিহালী চৌধুরী রচিত বিবিধ কবিতা, উমেশচন্দ্র মুৎসুদ্দির ‘মাতৃপূজা ও মানবধর্ম’ পন্ডিত গিরীশচন্দ্র বিদ্যাবিনোদের ‘অন্ধের দৃষ্টি’ এবং জ্যোতির্মালায় (জ্যেতির্ময়ী রায়চৌধুরীর) ‘সন্ধানে’ ‘বিলাত দেশটা মাটির’ ও ‘শকুন্তলার স্বপ্ন’ এই তিনটি উ্পন্যাস পঞ্চম ধারার অন্তর্গত। বিদ্যাবিনোদের ‘অন্ধের দৃষি।ট’ বস্তুতঃ তাঁহার আত্মজীবনী, ইহাবে ভাষা ও ভাব্যের সামঞ্জস্য অল্প। জ্যোতির্মালার কবিতাগুলির কল্পনা বর্ণনাভঙ্গী যেমন সুন্দর ভাবগুলি তেমনিই অস্পষ্ট।
যদি বাংলা সাহিত্যের বৌদ্ধ অবদান প্রগতির ধারা বর্ণনা করিতে গিয়া প্রত্যেক গুণীর গুণের সঙ্গে সঙ্গে দোষও প্রদর্শন করিয়া থাকি, তাহার কৈফিয়ৎ জীবনারম্ভেই ও সাদির ‘দি স্কলার’ কবিতার অধ্যয়ন শীর্ষক অনুবাদে দিয়া রাখিয়াছিঃ
“অতীতের সহবাসে যাপি এ জীবন
যখন যে দিকে চাই,
কেবল দেখিতে পাই
প্রাচীনের গত প্রাণ সাধ্ব সহাজন।
তাঁহাদের লয়ে মম কল্পনা চিন্তন
মহুকালগত ভবে করি বিচরণ।
তাঁহাদের গুণে ভজি
কেবল দোষেরে ত্যজি,
আশা ভয় সকলই তাদের মতন।”
আমার এই সামান্য বিবৃতিতে বহুক্বতী কবি, ধার্মিক, সাহিত্যিকের নামোল্লখ কির নাই। সে অপরাধ আমার অনিচ্ছকৃত। এ আমার কৈফিয়ৎ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের ভাষায়ঃ-
“বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি।
দেশে দেশে কত না নগর রাজধানী
মানুষের মত কীর্তি, কত নদী গিরি সিন্দু মরু,
কত না অজানা জীব কত না অপরিচিত তরু
রয়ে গেল অগোচরে। বিশাল বিশ্বের আয়োজন;
মন মোর জুড়ে থাকে অতি ক্ষুদ্র তারি এক কোণ।
সেই েেভ পাঁড় গ্রন্থ ভ্রমণ বৃত্তান্ত আছে যাহে
অয় উৎসাহে
যেথা পাই চিত্রময়ী বর্ণনার বাণী
কুড়াইয়া আনি।
জ্ঞানের দীনতা এই আপনার মনে
পূরণ করিয়া লই যত পারি ভিালব্ধ ধনে।”

বাংলার মুষ্টিমেয়, দুঃখদৈন্যগৃস্ত ও অসহায় বোদ্ধগণ গত একশত বৎসরের মধ্যে বাংলাভাষা ও সাহিত্যের পরিপুষ্টির জন্য যাহা করিয়াছেন, তাহা কম শ্লাঘার বিষয় নহে। তাঁহাদের পশ্চাতে এক দীর্ঘ আর্যসংস্কৃতির অবদান না থাকিলে তাঁহারা যাহা করিয়াছে তাহা করিতে পারিতেন কিনা সন্দেহ। যদি তাঁহাদের মধ্যে খুব বড় কবি, লেখক, সাহিত্যিক কিংবা দার্শনিক না জন্মাইয়া থাকেন, তাহাতে লজ্জিত হইবার কিছু নাই; কারণ, সারা বাংলায়, ভারতবর্ষে এবং পৃথিবীতেও বা এই সকল গুণী ব্যক্তি সংখ্যায় কয়জন! আমরা এইভাবে যাত্রা করিয়া এই পর্যন্ত আসিয়াছি; কিন্তু আমাদের চলার পথ শেষ হয় নাই। এবং কখনও শেষ হইবে না, আমরা চলিতে থাকিব ধীর মন্থর গতিতে; ভাষা, সাহিত্য, শিল্প চিন্তার নব নব আদর্শরুপে রচনা করিতে করিতে এই ভাবটি সতত স্মরণ রাখিয়া অগ্রসর হইলেই বাংলার বৌদ্ধগণের তথা আর সকলের প্রগতির ধারা অব্যাহত থাকিবে।

[ প্রখ্যাত ভারততত্ত্ববিদ ড. বেণীমাধব বড়ুয়ার এই নিবন্ধটি ১৯৪৬ সালের ৫ই মার্চ বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার অবুরখিল গ্রামে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের চট্টগ্রাম শাখা কর্তৃক আহুত এক বিশেষ সাধারণ অধিবেশনে সভাপতির অভিভাষণ। এই নিবন্ধে তিনি বাংলা সাহিত্যে বৌদ্ধ সাহিত্যিকদের শতবর্ষের (১২৫২-১৩৫২ বঙ্গাব্দ) অবদানের বিষয় বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয় সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকার ৫২শ বার্ষের ৩য় ও ৪র্থ সংখ্যায়। সাহিত্য পরিষৎ- এর সৌজন্যে এটি পুনমুদ্রিত করা হল।]

Additional Info

  • Image: Image