২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ বৃহস্পতিবার, ২৫ মে ২০১৭ইংরেজী
শুক্রবার, 04 এপ্রিল 2014 22:08

রবীন্দ্র মনন ও সাহিত্যে বৌদ্ধ চেতনা (৯)

লিখেছেনঃ বিজন গোলদার

রবীন্দ্র মনন ও সাহিত্যে বৌদ্ধ চেতনা (৯)

বিজন গোলদার

(পূর্ব প্রকাশের পর)

মালিনী নিজইচ্ছায় নির্বাসন প্রত্যাশী। তার হৃদয়মাঝে বারবার অনুরণিত হয় সকল গৃহে মুক্ত দ্বারে তার জন্যেই সকলের প্রতীক্ষা। নির্বাসন দিয়ে যে তাকে পর ভাবে সেই তো তার আপন। তার আনন্দ তখন আর ব্যক্তিসুখ নিবৃত্তির মধ্যে আবদ্ধ থাকে না। (ভিন্ন কবির রচনা হতে সংকলিত)

আমার এ ঘর ভাংগিয়াছে যেবা আমি বাঁধি তার ঘর

আপন করিতে কাঁদিয়া বেড়াই যে মোরে করেছে পর।

এ চেতনা যখন বৌদ্ধের মানব দর্শনে আবিষ্ট হয় তখন রাজনন্দিনী মালিণী আর অন্তপুর বাসিনী সৌন্দর্যবতী রাজদুহিতা থাকে না, একক হয় সমগ্রর অংশ। মালিনীর প্রকাশে থাকে:

আজি মোর মনে হয়

অমৃতের পাত্র যেন আমার হৃদয়_

যেন সে মিটাতে পারে এ বিশ্বের ক্ষুধা,

যেন সে ঢালিতে পারে সান্ত্বনার সুধা

যত দুঃখ যেথা আছে সকলের' পরে

অনন্ত প্রবাহে।

বিদ্রোহীরা প্রিয়দর্শিনী দেবকন্যাসম মালিণী দর্শনে হয় অবিভূত ও অনুতপ্ত এবং কৃতকর্মের জন্য ক্ষমাপ্রার্থী। কিন্তু বিদ্রোহের নেতা ব্রাহ্মণশ্রেষ্ঠ ক্ষেমংকর তার সিদ্ধান্তে অটল। তিনি ব্রাহ্মণ্যবাদের কঠোর অনুশাসন ও শাস্ত্রবিধির দাসত্বে আবদ্ধ। সুদীর্ঘ কালের ব্রাহ্মণ্যবাদে গড়া সংস্কৃতি, মন্ত্র-তন্ত্রের ধর্ম অপচয়িত হয়ে তার ধমনীতে প্রবিষ্ট। সে চেতনাতেই তিনি মোহচ্ছন্ন ও আবিষ্ট। বন্ধু সুপ্রিয় যুক্তিবোধের স্বচ্ছতায় নতুনের প্রগতিশীলতাকে গ্রহণে ইচ্ছুক এবং যুক্তির নিষ্ঠতায় ক্ষেমংকরের লৌহনির্মিত ইমারতের গায়ে মাঝে মধ্যে সামান্য যে আঘাত আসে, সেটা তিনি তার ব্রাহ্মণ্য শাস্ত্রদর্শনের সংস্কার ও অনির্বাণ বিশ্বাসের জোরেই লৌহ প্রাচীর তুলে অক্ষুণ্ন রাখেন।

আবার ক্ষেমংকরের বন্ধু সুপ্রিয় ব্রাহ্মণ্যবাদের আচারসংস্কারমুখি অচলায়তনিক ধর্ম অপেক্ষা প্রাণধর্ম ও প্রেমধর্মের প্রতি ছিলেন অধিক অনুরক্ত। তিনি আগ্রহী ছিলেন যুক্তিধর্মের প্রগতিশীলতা গ্রহণে। মালিণীর প্রেম, মৈত্রী ও করুণার বাণীতে সকল প্রাণে তরঙ্গ তোলে। সুপ্রিয়ও মনে মনে শ্রদ্ধা করে মালিনীকে এবং তার নবধর্মকে। ক্ষেমংকর তখন একাকী লৌহ প্রচীরে আবদ্ধ। রাজ্যের অনেকেই সদলে দীক্ষা নেয় নবধর্মে। বিক্ষুদ্ধ ক্ষেমংকর যুদ্ধ বিজয়ের মাধ্যমে নতুনধর্মের বিনাশের লক্ষ্যে বিদেশে যান সৈন্যসংগ্রহের জন্য। এদিকে রাজ উপবনে প্রত্যহ চলে সুপ্রিয় ও মালিনীর মধ্যে নবধর্মের প্রাণসারত্ব নিয়ে সুগভীর আলোচনা ও যুক্ততর্ক। এর মধ্যে মনের অজান্তেই পরস্পর পরস্পরের প্রতি থাকে বাক্যহীন হৃদয় সমর্পণ।

ক্ষেমংকর সৈন্যসংগ্রহ করে রাজাকে পরাজিত করে বৌদ্ধধর্ম ধ্বংস ও মালিনীকে হত্যার জন্য। গোপন চিঠি পাঠায় বন্ধু সুপ্রিয়কে। মালিনীর জ্যোতির্ময়ী আলোতে এর মধ্যেই ধুয়ে মুছে গেছে সুপ্রিয়র পা-িত্যের অহংকার। 'সর্ব জীবে দয়া'-এ চিরন্তন বাণীকে যিনি হৃদয়অমৃতে দেবশিশুকে স্তন্যদানের মতো লালন করেন এবং যে ধর্ম হিংসা, বিদ্বেষ, ঘৃণা, স্বার্থপরতা ও সর্বগ্রাসী অহং-এর বিরুদ্ধে পুন্যালোকের সন্ধান দিয়ে মানব আত্মাকে অমৃতপথ দেখিয়ে সর্বমানবকে মহাসত্য করে, তার ধ্বংস তো সুপ্রিয়র মর্মে বাঁধে। তিনি তাই শ্রেয় ও প্রেয়র মাঝে শ্রেয়কে বেছে নেন। রাজাকে জানিয়ে দেন ক্ষেমংকরের গোপন দুরভিসন্ধি।

অতর্কিত আক্রমণে বন্দী হয় ক্ষেমংকর। মালিনীর ক্ষমা ধর্ম ক্ষেমংকরের মুক্তি প্রার্থনা করে। তবে ক্ষেমংকর অনড় ও অটল থাকে তার কর্তব্যপালনে। সরাসরি রাজাকে জানায় মুক্তির পর নবধর্ম ধ্বংস ও মালিণী হত্যাই হবে তার প্রতিজ্ঞা। অতঃপর রাজা তাকে হত্যার আদেশ দেন এবং মৃত্যুর পূর্বে কোন আকাঙ্ক্ষা থাকলে তা পূরণের সদিচ্ছা প্রকাশ করেন।

ক্ষেমংকরের ইচ্ছা_ সুপ্রিয়েরে শুধু দেখিবারে চাহি। এটাই তার শেষ প্রার্থনা। অজানিত আকাঙ্ক্ষায় কাঁপে মালিনীর প্রেমার্দ হৃদয়। ক্ষেমংকরের ভয়ংকর বজ্রসম কঠোরতা মালিনীকে করে ভীত ও আতংকিত। সুপ্রিয়কে তার সামনে না আনার জন্যে অনুরোধ জানায় মালিণী।

তবুও সুপ্রিয় যায় বন্ধু ক্ষেমংকরের কাছে। সুপ্রিয় উপস্থিত হলে, সে জানতে চায়_ এতোদিনের প্রিয় বন্ধুর প্রতি কেন তার বিশ্বাসঘতকতা। উত্তরে সুপ্রিয় জানায়:

বন্ধু এক আছে

শ্রেষ্ঠতম, সে আমার আত্মার নিশ্বাস

সব ছেড়ে রাখিয়াছি তাহারি বিশ্বাস

প্রাণসখে_ ধর্ম সে আমার।

ক্ষেমংকরের প্রত্যুত্তরে থাকে তীব্র শ্লেষ, কটাক্ষ ও বিদ্রূপ। তার অভিযোগ_ সুপ্রিয় পিতৃধর্মের চর্তুবেদকে আহুতি দিয়েছে অন্তর্জ্যোতিময়, মূর্তিময়ী ও প্রিয়মুখ তার প্রেমিকার কাছে।

ক্ষেমংকরের বক্রোক্তিতে মালিণীর প্রতি সুপ্রিয়র অনুরাগ ও মুগ্ধতার ধনাত্মক বিষয়ের প্রোজ্জ্বলতা নষ্ট হওয়ায়, সুপ্রিয় মুক্ত ও উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে স্বীকার করেন নবধর্মের প্রতি তার আস্থা ও মালিণীর প্রতি তার সশ্রদ্ধ অনুরাগের কথা। প্রেম ও করুণার মহাসত্যের মাঝেই মালিনীর প্রতি তার অনুরাগের বন্ধন। প্রাণহীন শাস্ত্রে প্রাণপ্রতিষ্ঠায় তিনি প্রেম, ভালবাসা, স্নেহ, দয়া, মমতা, মেত্রী ও করুণার বাঁধনে মানুষকে বেঁধেছেন। জীবনবিহীন ধর্মে করেছে প্রাণপ্রতিষ্ঠা। প্রেমের বাঁধনে নিখিলজগতের মানব হৃদয়কে যে আপন করে, সেই ধর্মই তো সুপ্রিয়র ধর্ম ও দীন মর্তলোকের সেই অবতীর্ণা নারীমূর্তিরই সে সাধক ও প্রেমিক। এরপর নির্দয়, ভয়ংকর ও কপট ক্ষেমংকর আলিঙ্গনের ছলে হাতের শেকল দিয়ে অতর্কিতে সুপ্রিয়র মাথায় আঘাত করে হত্যা করে। ক্ষেমংকর হিংসায় উন্মত্ত ও অন্ধ এবং চিন্তার সকল দুয়ার রুদ্ধ থাকায় তার অন্ধত্বকেই সত্য জানে। তাইতো বন্ধুকে হত্যা করে বলে_

ডাকো, ডাকো ঘাতকেরে।'

মহারাজ গর্জন করে হুকুম করেন_ খড়গ আনার।

আর মালিণী_ মহারাজ, ক্ষমো ক্ষেমংকরে

মালিণীর এই ক্ষমার মধ্যেই আছে আত্মোৎকর্ষতার সমুজ্জ্বলতা। সুগভীর আত্মানুভবের ঔজ্জ্বল্যে সে বোঝে প্রেম, মেত্রী ও করুণার আদর্শেই ঘটে মানবের প্রকৃত মুক্তি। হিংসার বিরুদ্ধে হিংসা নয়। হিংসাথেকে মুক্তির পথ প্রেম এবং প্রেমই একমাত্র সত্য। কবিও এখানে মালিনীর মধ্য দিয়ে নিজের কথাটা বলে দিলেন জগৎবাসীকে।

এগারো

রবীন্দ্রনাথের 'কথা' কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত পূজারিণী কবিতার উৎস 'অবদানশতক'-এর 'শ্রীমতীতি' আখ্যান। ১৩০৬ বঙ্গাব্দে 'শ্রীমতীতি' আখ্যানের শ্রীমতীকে কেন্দ্রে রেখে তার উপর বিনির্গত আলোকরশ্মির প্রবাহমানতাই পূজারিণীর নির্মাণ। তার ছাবি্বশ বছর পর 'পূজারিণী' কবিতার নাট্যসংস্করণ আকারে প্রকাশিত হয় 'নটরিপূজা'।

মূল কাহিনীতে শ্রীমতি আখ্যান অত্যন্ত বিশদ ও বহুশাখায়িত বৈচিত্র্যের মধ্যে বিম্বিসার-অজাতশত্রু-শ্রীমতি কহিনীই সবিশেষ আকর্ষণীয়। একদা শ্রাবস্তী নগরীতে রাজত্ব করতেন রাজা বিম্বিসার। জনহিতকর, ন্যায়পরায়ণ ও প্রজাকল্যাণকামী রাজা ছিলেন বুদ্ধের উপাসক। কোন এক সায়ংকালে তথাগত শ্রাবস্তী নগরীর রাজগৃহের বেনুবনে বিহার করেন। মহারাজা তখন অন্তঃপুরবাসী পরিবৃতা মহারানীসহ তথাগতের দর্শন প্রার্থনায় উদ্যানভূমিতে গমন করেন এবং রাজ অন্তপুরে আরাধনার জন্যে তাঁর কেশ ও নখ প্রাথনা করেন। তথাগত বুদ্ধ তাদেরকে তার কেশ, নখ দান করেন এবং রাজ অন্তপুরে তথাগতদত্ত কেশনখস্তূপ প্রতিষ্ঠার পর দীপ, ধূপ, পুষ্পমাল্য, চন্দনে তা হয় সুশোভিত।

পুত্র অজাতশত্রু রাহ্মণ্যবাদে প্রভাবিত। ব্রাহ্মণ্যবাদ তখন হিংসাশ্রয়ী, স্বার্থান্ধ ও হিতাহিত জ্ঞানশূন্য। অজাতশত্রু হত্যা করে ধার্মিক ও ধর্মরাজ পিতা বিম্বিসারকে। পিতাকে হত্যা করে সিংহাসনে বসেন অজাতশত্রু এবং রাজাদ্দেশে রাজ্য থেকে বৌদ্ধ ধর্ম হয় বিসর্জিত। রাজঅন্তঃপুরে স্তূপমার্জনা ও পূজার্চনা নিষিদ্ধ হলো। সে নিষেধকে অমান্য করে শ্রীমতি নামের অন্তঃপুরবাসী স্তূপমার্জনা ও দীপমালায় সুসজ্জিত করেন। অজাতশত্রুর জিজ্ঞাসার জবাবে সে জানায়_ বিম্বিসারের শাসনের প্রতি তার আনুগত্য, অজাতশত্রুকে নয়। তখন ক্রোধান্বিত অজাতশত্রুর চক্রক্ষেপণে তাকে হত্যা করা হয়।

অনন্তর শ্রীমতি দেবকূলে দিব্যপ্রভায় উদ্ভাসিত জ্যোতির্ময়ীরূপে জন্মগ্রহণ করে ভগবান বুদ্ধের অনুগ্রহ প্রার্থনা করেন। বুদ্ধ তাকে চারটি আর্য সত্যে দীক্ষা দেন। তথাগতর দীক্ষাদানে শ্রীমতি জ্ঞানসাধনায় সর্বোচ্চে পৌঁছে তাঁর ঘটে মানব জীবনের দুঃখমুক্তি ও মোক্ষপ্রাপ্তি।

রবীন্দ্রনাথের 'পূজারিণী' প্রাচীন আখ্যানের মূল কাহিনীর সাথে মিল অপেক্ষা অমিলের ভাগই বেশি। কবি এখানে বিম্বিসার, অজাতশত্রু ও শ্রীমতি কেন্দ্রিক সংক্ষিপ্ত বিষয়ভাবকে গ্রহণ করে অবদান শতকের ছায়া অবলম্বনে করেছেন কবিতার কায়ানির্মাণ। আখ্যানভাগে শ্রীমতির দুঃখমুক্তি ও মোক্ষলাভেই পরমার্থপ্রাপ্তি। কবি এখানে ব্রাহ্মণ্যবাদ ভিত্তিক ভেদবাদি ধর্মের বিপরীতে মানবের সাম্যতাভিত্তিক তথাগতের প্রাণধরম প্রতিষ্ঠাকে স্বীকৃতি দিয়েছেন এবং অহিংস মন্ত্রের দীক্ষা, প্রেম-করুণা রসে সিক্ত হৃদয় মাধুর্য ও তেজোস্বতায় বুদ্ধে সমর্পিত যে শ্রীমতিকে কবি রূপ দিয়েছেন তার মধ্যে তিনি মানবতাকেই মহাসত্য করে গড়ে তুলেছেন। শিল্পের সুষমাতেও তা থাকে অনন্য। মূল কাহিনীতে মোক্ষপ্রাপ্তির চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছাতেই শ্রীমতির জন্ম জন্মান্তর ও আত্মত্যাগ। তবে হিংসার বিরুদ্ধে হিংসানয়, আত্মদান, ক্ষমা, প্রেমের বিমূর্ত চরিত্রাঙ্কন কবির পূজারিণী।

নরপতি বিম্বিসার বুদ্ধের উপাসক। পুত্র অজাতশত্রু ব্রাহ্মণ্য ধর্মের পূজারী। ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিন্নতার কারনেই পিতা পুত্রের বিরোধ ও সংঘাত। পিতা ধর্মকে বোঝেন অহিংসমন্ত্রের ভক্তিরসে ও মানবতার দর্শনে। বৌদ্ধধর্ম তখন প্রবল বাঁধার সম্মুখীন ব্রাহ্মণ্যধর্মের কাছে। অজাতশত্রু বৌদ্ধ বিদ্বেষী, ধর্মান্ধ, বর্ণবাদের তীব্র সমার্থক, ভেদবাদ সমাজের অহং এ তুষ্ট, স্বার্থচেতনায় সন্মুখস্থ সকল বাঁধা বিনাশে সে হিংসাশ্রয়ী ও উন্মত্ততায় তার সকল শুদ্ধ ও সত্য চেতনা ছিল অবলুপ্ত। এই অন্ধ চেতনার মোহগ্রস্ততায় আত্মার বৈকল্যে ব্রাহ্মণ্যধর্ম হয় প্রাণরসশূন্য নিয়মসর্বস্ব আচারিক এবং বিরুদ্ধবাদী সকল দর্শনের অগ্রযাত্রায় হয় বিনাশী।

কবির কবিতায় নৃপতি বিম্বিসার ভগবান বুদ্ধের নিকট মূল কাহিনীর কেশনখের পরিবর্তে পদনখ প্রার্থনা করেন ও প্রাসাদের নিভৃতকাননে বুদ্ধস্তূপ নির্মাণ করে তা সুশোভিত করেন। রাজঅন্তঃপুর বাসিনী ও নৃপতি সে স্তূপে হৃদয়ের অর্ঘ্যে তাদের ভক্তির বেদীকে গড়ে তোলেন প্রেম মৈত্রী ও করুণার আদর্শে।

ব্রাহ্মণ্যধর্মের প্রতিভূ অজাতশত্রু পিতাকে হত্যা করে রাজা হন। রক্তের রুধিতে নির্বাসিত হয় পিতৃধর্ম। অগি্নকা-ে তিনি ভষ্মীভূত করেন বৌদ্ধশাস্ত্রাদি এবং বেদ ও ব্রাহ্মণ্যবাদ পুনঃস্থাপিত হয় রাজঅন্তঃপুরে। ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধবাদিতা ও বৌদ্ধ উপাসকদের শাস্তি ঘোষিত হয়_ মৃত্যুদ- অথবা নির্বাসন। অজাতশত্রুর নিষ্ঠুরতা প্রাচীন ভারতের একটি বিশেষ কালের ইতিহাসের অধ্যায়; মূল কাহিনীর এ অপ্রকাশিত অংশ রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও নাটকে তা প্রকাশের মাধ্যমে বিষয়ের ঘনিষ্ঠতায় ঘটনা প্রবাহকে করে তোলে প্রাণস্পর্শী এবং কালের বিচারে বিরচিত হয় ইতিহাসের অংশ হিসেবে।

অজাতশত্রুর পিতৃহত্যা যুক্তির বিচারে গ্রাহ্যতা পায় ব্রাহ্মণ ধর্মে। কারণ বিম্বিসার তার পিতৃদত্ত ধর্ম ভুলে বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষিত হন এবং সকলকে উদ্বুদ্ধ করেন বৌদ্ধের বেদবিরোধী ধর্ম গ্রহণে। ব্রাহ্মণ্যবাদের দৃষ্টিতে তার পিতার অপরাধ হত্যাযোগ্য, হোক না তা সন্তানের হাতে। উপালী সুনন্দ ও সুনীত তিনজনই জাতিতে নীচ এবং তারা সকলেই বৌদ্ধের সমত্ববাদীতায় বিশ্বাসী হয়ে দ্বারে দ্বারে প্রেম করুণা ও মৈত্রীর বাণী বিলায়। রাজাদেশ অমান্য করায় তাই উপালীকে হত্যা করে পথের পাশ্র্বে ফেলে রাখা হয়। বৌদ্ধরা বেদবিরোধী এবং বর্ণবাদের অস্তিত্বে অবিশ্বাসী। ওদের সাম্যতা বিনাশে অজাতশত্রু ব্রাহ্মণ্যবাদের পক্ষে অস্ত্র ধরেন। ব্রাহ্মণ্যবাদের ধর্মবিদ্বেষ তখন আগুনের লেলিহানে গ্রাস করে বুদ্ধ চিন্তার বিশুদ্ধতাকে। ওরা যখন একটা গতিশীল ধর্মের মনগত শুদ্ধতাকে বিনাশে অক্ষম, তখন অস্ত্রবলে রক্তস্রোতে তারা সকল বিরুদ্ধবদিতার অবদান ঘটায়। নটীর পূজার দেবদত্ত ব্রাহ্মণবাদের ব্রাহ্মণসেজে ক্ষত্রিয়ের অস্ত্র নিয়ে হত্যা করে বৌদ্ধ সাধক ও সধিকাদের। অজাতশত্রুর শাসনাধীনে অন্যায় ও অত্যাচারের দুর্বিসহ যন্ত্রণা নিয়ে যখন রাজান্তপুরের অধিবাসীদের দিনাতিপাত, তখন মৃত্যুর সিংহদ্বার দিয়েই রাজঅন্তঃপূরবাসী শ্রীমতি শুরু করে তার নবজন্মের জয়যাত্রা।

হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী, নিত্য নিঠুর দ্বন্দ্ব,

ঘোর কুটিল পন্থ তার লোভ জটিল বন্ধ।

নূতন তর জন্ম লাগি কাতর সব প্রাণী

কর' ত্রান মহাপ্রাণ, আন' অমৃতবাণী,

বিকশিত কর' প্রেমপদ্ম চির-মধুনিষ্যন্দ,

শান্ত হে, মুক্ত হে, হে অনন্তপুণ্য,

করুণাঘন, ধরনীতল কর' কলঙ্কশূন্য।

অজাতশত্রুর অত্যাচার ও হিংসান্মোত্ততায় রাজপথের সর্বত্র যখন শোণিতের দাগ, রাজন্যপুরবাসীরা দগ্ধ অনলে যাতনাক্লিষ্ট তখন শ্রীমতি শোনালেন বুদ্ধের করুণাঘন অমৃতবাণী। বুদ্ধের পূজার অর্ঘ্য হাতে দ্বারে দ্বারে পরিভ্রমণে নামে শ্রীমতি। জগৎ দেখে তার জ্যোতিনময়ী রূপ। তার বাণীতে থাকে না কোন হিংসা, দ্বেষ ও বিভেদের পৃথকমাত্রা।

অমৃতবারি সিঞ্চন, করে

নিখিল ভুবনময়।

মহাশান্তি মহাক্ষেম

মহাপুণ্য মহাপ্রেম।

জ্ঞান সূর্য-উদয়ভাতি

ধ্বংস করুক তিমিররাতি।

শ্রীমতীর পুণ্য আহ্বানের মধ্য দিয়ে সে পরিণত হয় ভয়শূন্য এক পুণ্যাত্মায়। তার মধ্যকার শূন্যজ্যোতির আভায় বিস্ময়বিমুগ্ধতা থাকে রাজমহিষী অমিত ও শুক্লার চোখে। তারা আতংকে অন্ধকারকে স্পর্শ করে শিউরে ওঠে, পুণ্যজ্যোতির দীপ্তপ্রভা তাদের হৃদয় থেকে তখনো অপসৃয়মানের মধ্যেও আলোকিত।

রাজার আদেশ আজি কে না জানে,

এমন করে কি মরণের পানে

ছুটিয়া চলিতে আছে।

কিন্তু শ্রীমতিরে প্রেমধর্মের ভক্তিরস, প্রবল আত্মবিশ্বাস ও হিংসা ধর্মের বিরুদ্ধে অহিংসবাণীতে জগৎবাসীকে পুণ্যালোকে পরিশুদ্ধ করাতে তার যে আত্মত্যাগ ও আত্মমহিমা, সেখানেই কবির শ্রীমতী দর্শণ। তার আনুগত্য ভক্তিমোহের প্রাবল্যের অন্ধত্বে নয়, চিত্তমুক্তির শুদ্ধতার বিশ্বাসেই তার প্রাণের শক্তি। সে শক্তির জোরেই তার মুক্তি। শুদ্ধতার প্রতিকূলে রাজশক্তির রাজাদ্দেশও তার কাছে তুচ্ছ ও অগ্রাহ্য। হিংসার বিরুদ্ধে হিংসার প্রজ্জ্বলন নয়। প্রেম, মৈত্রী, করুণা ও ক্ষমাই হয় হিংসাগি্ন নির্বাপণের মূল মন্ত্র। কবি এখানে শ্রীমতীর মধ্যদিয়েই বিশ্ববাসীকে তার মনের কথাটি জানিয়ে দিলেন। শ্রীমতির ভক্তিরস পুণ্যালোকে আবদ্ধ থেকে দিশা দেয় মানব মুক্তির এবং পরম প্রাপ্তিতে সে সর্বস্ব দেয়। তখন সে ভক্তিবাদ প্রেমের পূর্ণপ্রাজ্জ্বেলতায় মৈত্রী ও করুণায় আশ্রয়ে খোঁজে জগৎবাসীর অন্তরআত্মায়।

রাজার মন্ত্রণাসভা শেষ হয়। সূর্য তার দিনের আলোকে নিবিয়ে দিয়ে সন্ধ্যা নামায়। অজাতশত্রুর এমন সময়কে আরো কালো করে তখন সন্ধ্যা নামে, বুদ্ধের স্তূপপদমূলে রাজার তমসভেদি আলোকে দেখবে বলে শ্রীমতি সারি সারি প্রদীপের মতো আলো প্রজ্জ্বলিত করে। আঁধারের ঘোর তমসায় তখন সকল আলোক রশ্মি বিচ্ছুরিত হয় শ্রীমতির দিকে। সশস্ত্র পূর রক্ষকদের নিষেধের গ-িকে উপেক্ষা করে ভয় লেশহীন হয়; অবিচল ও স্থির থাকে বুদ্ধপ্রাণা। মৃত্যুমুখে তার কণ্ঠনির্গত সুমধুর শান্ত বিমোহিত একটি ক্ষুদ্র বাকের পূর্ণ্য প্রবাহের তাৎপর্যপূর্ণ আলোকরশ্মি দেখলো জগৎবাসী।

আমি বুদ্ধের দাসী

এবং এ বাক্য উচ্চারণের সাথে সাথে অন্ধকার বিদূরিত আলোতে মূর্ত হলো :

সেদিন পাষাণ ফলকে

পড়িল রক্ত লিখা।

সেদিন শারদ স্বচ্ছ নিশীথে

প্রাসাদ কাননে নীরব নিভৃতে

স্তূপপদমূলে নিবিল চকিতে

শেষ আরতির শিখা।

নটীর 'পূজা'য় শেষ অংকে থাকে নাটকের নাটকীয়তা। শ্রীমতির শেষ প্রার্থনায় থাকে বুদ্ধ মন্ত্রের উচ্চারণ এবং রাজাদ্দেশে রক্ষীর অস্ত্রাঘাতে শ্রীমতিকে হত্যা। রাজমহিষী তখন অহিংসমন্ত্রে জানুপেতে বুদ্ধের প্রার্থনায় রত। রত্নাবলী ব্যতীত সকলের কন্ঠে উচ্চারিত হয় বুদ্ধমন্ত্র। মহারাজ অজাতশত্রু শ্রীমতির রক্তদর্শনের ভয়ে তাকে দেখবার শক্তি হারায়। তার নির্বাক চরিত্রের বলিষ্ঠতা ও প্রেম, মৈত্রী ও করুণার আদর্শ যখন হিংসামন্ত্রের শক্তির কাছে হয় বিজয়ী, তখন রত্নাবলীর মনোজগতেও আলো ফেলে শ্রীমতির বুদ্ধবাণী এবং রাজান্তপূর বাসিনী অন্যদের মতো তিনিও জানুপেতে তার পদস্পর্শ করে নিজের অজান্তেই সমর্পিতাপ্রাণে বুদ্ধ চেতনায় আশ্রয় খোঁজে।

বুদ্ধং সরনং গচ্ছামি

ধম্মং সরনং গচ্ছামি

সংঘং সরনং গচ্ছামি। (চলবে)

Additional Info

  • Image: Image