২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ৬ শ্রাবণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ শুক্রবার, ২১ জুলাই ২০১৭ইংরেজী
রবিবার, 30 মার্চ 2014 03:40

রবীন্দ্র মনন ও সাহিত্যে বৌদ্ধ চেতনা (৮)

লিখেছেনঃ বিজন গোলদার

রবীন্দ্র মনন ও সাহিত্যে বৌদ্ধ চেতনা (৮)

বিজন গোলদার

(পূর্ব প্রকাশের পর)

পাপিষ্ঠা শ্যামার প্রতি কঠোরতম দ- বিধানই হবে পাপঋণ থেকে তার মুক্তি: বজ্রসেনের এ মুক্তি হৃদয়বৃত্তির প্রবণতা লোপ করার মধ্যেই সম্ভব। কিন্তু বজ্রসেন একজন বিবেকতাড়িত মানুষ এবং মনজগতে সে প্রেমিক। তার এ অনুভূতিকে বুঝবার জন্যেই হয়তো শ্যামার বেঁচে থাকা।

বজ্রসেন শ্রেয় ও প্রেয়র সংঘাতেই আবর্তিত। শ্রেয়কে বেছে নিয়ে সে দুর্লভ প্রেমকে হারায় আবার প্রেয়কে হারানোর বেদনায় তার অন্তরদ্বন্দ্ব।

হৃদয়চিত্ত তার অশান্ত ও হৃদয় যন্ত্রণায় থাকে হারানোর বেদনা।

এই দারুণ রৌদ্রে, এই তপ্ত বালুকায়

তুমি কি পথভ্রান্ত।

দুই চক্ষুতে এ কি দাহ

জানিনে, জানি নে, জানি নে, কিযে চাই।

বজ্রসেনের তাপদগ্ধ প্রেমিক হৃদয় প্রেমিকাকে খোঁজে উদভ্রান্তের মতো উতলা হয়ে। শ্রেয় থেকে প্রেয়তে পৌঁছে তার উদ্বেলিত প্রেম আর্তচিৎকারে পরলোকে প্রেমিকাকে ডাকে:

এসো, এসো, এসো প্রিয়ে

মরণ লোক হতে নতুন প্রাণ নিয়ে।

এ আবেদনে সাড়া দেয় জীবিত শ্যামা। কিন্তু শ্যামাকে দর্শনমাত্র প্রেমিকের বাঁচিয়ে রাখা হৃদয়ের পেলবতার সিগ্ধতা মুহূর্তেই কঠিনতর হয়। ক্ষণতরের আলিঙ্গনে বাঁধন ছিন্ন হলো তার। মুখ ফিরিয়ে নেয় বজ্রসেন, যেন এ মুখ দেখার যোগ্য নয়, শুধু থাকে ঘৃণা। এ সবই কি সত্য অথবা মনমধ্যে নিষ্ফল যাতনা।

নারী নতশিরে

ক্ষণতরে রহিল নীরবে। পরক্ষণে

ভূতলে রাখিয়া জানু যুবার চরণে

প্রণমিল, তার পরে নামি নদীতীরে

আঁধার বনের পথে চলি গেল ধীরে,

শ্যামার চলে যাওয়াকে দেখে বজ্রসেন। একবার তার ফিরে দাঁড়ানোতে_ 'যাও যাও যাও যাও, চলে যাও' বলে নির্দেশ।তবুও বজ্রসেন কি পেরেছে স্থিরবুদ্ধির প্রাজ্ঞতা থেকে শ্যামাকে অস্বীকার করতে? 'পাপীরে দিতে শাস্তি শুধু পাপেরে ডেকে এনেছি'_ এ কথায় কি থাকে শুধু মানসিক যন্ত্রণার কাতরতা? মানুষ বজ্রসেন ন্যায়নিষ্ঠা সমুন্নত রেখে প্রেমের বাণীকে ব্যর্থ করে। তার ন্যায়নিষ্ঠতা কি প্রেমের বলহীনতার কাছে পরাজিত হয়? প্রেমিকের হৃদয় যন্ত্রণা প্রশমণের আশ্রয় কি নিরাশ্রয় হয় ন্যায়নিষ্ঠার কাছে? শ্যামার এ দুর্লভ প্রেম অমূল্য থেকে অসার্থক হয়। শ্রেয়বোধের প্রাপ্তির মূল্যটা পেলে পাওয়াটা ভারি হতো। শ্যামার নৈতিক বলহীনতায় সে পাপী ও মর্মযন্ত্রণায় কাতর; প্রেমের বলহীনতায় বজ্রসেনের আত্মার বাণী থাকে নিরাশ্রয়ী ও দিকভ্রান্ত। তাইতো বজ্রসেন হৃদয়ের অন্তরজ্বালায় সর্বক্ষণ খুঁজবে শ্যামা প্রেমের নিগূঢ়তাকে এবং শ্যামার মতো পাপীকে ক্ষমা না করতে পারার অন্তর্দাহে জ্বলবে তার হৃদয়যন্ত্রণা।

এ দহনে মাত্রা বাড়ে বা সান্ত্বনা মেলে, যখন ভাবে পাপিষ্ঠা শ্যামাকে সৃষ্টিকর্তা হয়তো ক্ষমা করবেন; কিন্তু ন্যায়নিষ্ঠ বিবেকী বজ্রসেনের কোন ক্ষমা নেই স্রষ্টার চরণে। প্রেমের আর্তি যখন ন্যায়বোধকে ছাপিয়ে জয়ধ্বনি দেয়, হৃদয়ের বাণী তখন শ্রেয় ছেড়ে প্রেয়-এ আশ্রিত হয়। এখানে রবীন্দ্রনাথের বিষয়বস্তুতে অভিনবত্ব, চিন্তার সাহসিকতা ও চেতনায় বৈদগ্ধের আধুনিকতা।

দশ

কাব্যনাট্য 'মালিনী' রবীন্দ্রনাথের এক অদ্ভুত স্বপ্ন হতে জন্ম। তাঁর কাব্যনাট্যের সাথে ভিন্নভাবে মিলে যায় প্রাচীন বৌদ্ধ সাহিত্যের 'মহাবস্তু অবদান' এর 'মালিনী' কাব্যনাট্যের আখ্যানভাগ।

রবীন্দ্রনাথের একদিন নিমন্ত্রণ ছিল লন্ডনের প্রিমরোজহিলে তারক পালিতের বাসায়। সেখানেই তার রাত্রিবাস এবং রাত কাটে অনেকটা নির্ঘুমে। এর মধ্যে একটা স্বপ্ন দেখেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁর সম্মুখেই দেখেন একটা নাটকের অভিনয় চলছে। বিষয়বস্তুতে থাকে বিদ্রোহের চক্রান্ত। দুই বন্ধুর মধ্যে একজন বন্ধু সে বিদ্রোহের সাথে যুক্ত এবং অন্যজন কর্তব্যবোধে তাড়িত হয়ে রাজাকে সেটা জানিয়ে দেন। মৃত্যুদ-প্রাপ্ত বিদ্রোহী বন্ধুকে রাজার সামনে বন্দী করে আনা হলো। মৃত্যুর পূর্বে তার শেষ ইচ্ছা পূরণকল্পে যখন অন্য বন্ধুকে আনা হয়, তখনই বন্দী তার শেকলের আঘাতে মুক্ত বন্ধুকে হত্যা করে। এই স্বপ্নই এক পর্যায়ে জন্ম দেয় মালিনী কাব্যনাট্যের।

মহাবস্তু অবদানের মালিন্যবস্তু আখ্যানের মালিণী জন্মজন্মান্তরের মধ্য দিয়ে কুসংস্কারাচ্ছন্ন ব্রাহ্মণ্যবাদের আবরণ উন্মোচন করে বুদ্ধের মানবধর্মের জয়গান করেছেন। আখ্যানের বর্ণনায় আছে_ একদা এক প্রত্যেকবুদ্ধ ভিক্ষার জন্য বারানসী নগরীতে প্রবেশ করেন। তার শূন্য ভিক্ষাপাত্র একটি বালিকা দেখে তাঁকে নিজগৃহে নিয়ে উত্তম আহারাদি প্রদান করে। অতঃপর তার দেহান্তে দেহাবশেষের উপর একটি স্তূপ নির্মিত হয়। বালিকাটি প্রত্যহ গন্ধদ্রব্য ও পুষ্প দিয়ে ঐ স্তূপটি সুসজ্জিত করতো। তার ইচ্ছে জাগে_ প্রতিটি জন্মে যেন সে একগাছা পুষ্পমালা নিয়ে আবির্ভূত হয় এবং তার সে ইচ্ছা পূর্ণ হয়। অতঃপর জন্মান্তর ধারায় বারানসীর মহারাজ কৃকির কন্যা মালিণীরূপে মানবধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য তার জন্মগ্রহণ। ব্রাহ্মণ্যবাদের অন্তঃসারশূন্য মন্ত্রনির্ভর ধর্ম ও কুসংস্কারে যখন ধর্ম হয়, মানবতা তখন বর্জিত, বিবেক চেতনা হয় অপসৃয়মান, আচার সর্বস্ব ধর্ম যখন সকল শুভ বোধকে বিলুপ্ত করে, তখনই বুদ্ধের বাণীতে অন্ধকার আলোকিত হয়। রাজকন্যা মালিণী সেই আলোকবর্তিকা হাতে নিয়ে এগিয়ে গিয়ে সকলের মাঝে দীপশিকা প্রজ্বলিত করলেন। ব্রাহ্মণ্যবাদকে প্রতিরোধ করে রাজশাসনকে অমান্য করে বিদ্রোহী হয় রাজকন্যা এবং জয় হয় মানবধর্মের। এখানে এর কেন্দ্রীয় চরিত্রে মালিনীর উজ্জ্বল প্রকাশে কাহিনীর আলৌকিক শক্তি মহিমা, বিনয়ধর্মের দীক্ষা ও ব্রাহ্মণ-শ্রমণ বিরোধকে ধারণ করায় আখ্যানের সাথে শুধু ধর্ম যোগ হয় না, যোগ হয় ইতিহাসের একটি বিশেষ অধ্যায়।

রবীন্দ্রনাথ মালিনী কাব্যনাট্য রচনাক্ষেত্রে মহাবস্তু অবদান সাহিত্য দ্বারা প্রভাবান্বিত হয়েছিলেন সেটা অপ্রমাণিত। তবে বুদ্ধ ভাবাদর্শ ও তার হৃদয়ের বাণী সাকার প্রভাবিত মূর্তিতে নিবিষ্ট হয়ে কবিকে সামপ্রদায়িক ধর্মবিশ্বাসী করেনি। কোন দেববাণীর আকর্ষণ তাকে গৃহহীন সন্ন্যাসী করেনি। বরং যার অন্তরের সত্য, হৃদয়ের করুণা ও মৈত্রীতে যিনি জগৎ সংসারকে আলোকিত করেছিলেন, যিনি সকল আনুষ্ঠানিকতার ঊর্ধে উঠে ধর্মের বাণীকে সর্বমানবের হৃদয়বাণীর মধ্যে রূপ দিয়েছিলেন। তার কাছেই রবীন্দ্রনাথ বারবার সমর্পণ করেছেন নিজেকে। হয়তো তাঁর এই সমর্পণ ও স্বপ্নের মধ্যেই মানবলোকের রসায়নে 'মালিণী' কাব্যনাট্য বিনির্মিত।

ত্যাগ করো, বৎস্যে, ত্যাগ করো সুখ-আশা

দুঃখভয়; দূর করো বিষয় পিপাসা

ছিন্ন করো সংসার বন্ধন;

মালিনীর প্রতি ভগবান কাশ্যপের এ আহ্বানের মধ্য দিয়েই রবীন্দ্রনাথের 'মালিনী' কাব্যনাট্যের শুরু। মালিনী কাশ্যপের কাছে দীক্ষা নেয় নবধর্মের। কাশ্যপের আশীর্বাদে তার সন্মুখে থাকে মুক্তির দিশা। তাঁর আশীর্বাদে থাকে_ রাতের অন্ধকার ছিন্ন করে জ্ঞানলোকে যে সূর্য উদয় হবে এবং সে মহাক্ষণের প্রত্যাশা জাগরুক করেই তার তীর্থ পর্যটনে যাত্রা।

ব্রাহ্মণ্যবাদ তখন ভেদবাদী আচারসর্বস্ব ধর্ম। ধর্মের হৃদয়ের বাণী তখন মানবমনে থাকে স্পর্শহীন। ভিতরের অন্তঃসার শূন্যতা নিয়ে কোনভাবে দাঁড়িয়ে থাকে ব্রাহ্মণ্যবাদের ধর্মীয় কাঠামো। তবুও তাঁরা তাকে রং লাগিয়ে মসৃণ করে চকমকি করে। একে ধারন করে নিজেদের শ্রীবৃদ্ধি করে, নিজেদের শ্রেণীস্বার্থ অক্ষুণ্ন রাখে এবং সামপ্রদায়িক স্বার্থকে পুষ্ট করে, তারা এটাকে ঠিক রাখতে মূলার, গদার সমরাস্ত্রে সঞ্চিত হয়। হিংসার আশ্রয়ে অহিংস বধে উন্মত্ত হয়। আবার প্রান্ত ও প্রাণহীন দর্শনে যারা আস্থাশীল, তারা সেটাকে গ্রহণ করে পরম্পরার অনুকরণে, ঐতিহ্য ও যুগের অনুসরণে, বর্মরূপী ধর্ম রক্ষার্থে তারা যুক্তিবোধের শ্রেয়তাকে অস্বীকার করে, অন্ধকার প্রকোষ্ঠে আবদ্ধ থেকে জীঘাংসী হয় এবং সকল বিরোধী মত ধ্বংসে হিংসার পথকেই একমাত্র অবলম্বন জানে।

মালিনীর ধর্ম বেদবিরোধী, ব্রতক্রিয়াবিরোধী। আচার সংস্কার তিরোহিত বৌদ্ধধর্ম তখন ব্রাহ্মণ্যমতে পিশাচী ও প্রেতসিদ্ধ পর্যায়ভুক্ত। নারীর ধর্ম থাকে ব্রতনিষ্ঠায় ও পতিপুত্র সেবায়। আবার মালিনী রাজধর্মবিরোধী বুদ্ধ আশ্রয়ী। ধেয়ে আসে সনাতন ধর্মী ও রাজধর্মের ব্রাহ্মণ গুরুরা, সাথে থাকে বুলি শেখানো প্রজাকুল। তারা রাজকন্যা মালিনীর নির্বাসন চায়। ক্ষমতা ও ভোগে আসক্তিহীন মালিনী রাজ অন্তপুরী ছেড়ে বেরিয়ে আসে ব্রাহ্মণসভায়। প্রকৃতির রূপলাবণ্য বৈভবের আবরণে সাজে মালিনীর সর্বশরীর। প্রদোষ ভাংগার নির্মল সূর্যালোক তাকে আভরণ দেয় জ্যোতির্ময়ী আলো দিয়ে। নতুন সূর্যের তরুণ আলোর জ্যোতি উৎসারিত সি্নন্ধতা ও জ্ঞানদীপ্ততার করুণায় উদ্ভাসিত নবধর্মের প্রভাস তখন মালিনীর সর্বশরীরে। প্রেম, মৈত্রী ও করুণা আশ্রয়ী মালিনীর মাঝে প্রকৃতির শান্ত, সৌম্য ও সি্নগ্ধতায় গড়া প্রিয়দর্শিনী রাজকন্যাকে দেখে বিদ্রোহীদের চেতনা মুগ্ধতায় হয় অবসিত।

(চলবে)

Additional Info

  • Image: Image