২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ১২ শ্রাবণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ বৃহস্পতিবার, ২৭ জুলাই ২০১৭ইংরেজী
বৃহস্পতিবার, 20 মার্চ 2014 01:20

রবীন্দ্র মনন ও সাহিত্যে বৌদ্ধ চেতনা (৬)

লিখেছেনঃ বিজন গোলদার

রবীন্দ্র মনন ও সাহিত্যে বৌদ্ধ চেতনা (৬)

বিজন গোলদার

(পূর্ব প্রকাশের পর)

বার

বৌদ্ধ অবদান সাহিত্যের 'মহাবস্তু অবদান'-এর 'কুশজাতক' আখ্যানভাগকে কেন্দ্র করেই রবীন্দ্রনাথের 'রাজা' নাটকের বিনির্মাণ। মহাবস্তু অবদানের 'কুশজাতক' আখ্যান অনেক সুবিস্তৃত। তার একটি অংশ রাজা নাটকের বিষয়বস্তু।

মূল আখ্যানে ভগবান বুদ্ধ একদা বারানসী নগরের রাজা সুবন্ধু, তার পুত্র ইক্ষাকু এবং তার কদাকার ও কুৎসিৎ দর্শনের পুত্র কুশ সম্পর্কে সুবিস্তৃত বর্ণনা দেন ভিক্ষুদেরকে। তার বর্ণনায় কুৎসিৎ ভয়ানক ও অসুন্দর দর্শনধারী কুশের চরিত্র সম্পর্কে রূপদানের জন্যই আখ্যানের সমস্ত আয়োজন। রাজা সুবন্ধু ছিলেন পুণ্যকর্মা, মহাঐশ্বর্যশালী, ষষ্ঠিসহস্র হস্তী অধিপতি, মহাসৈন্য সমন্বিত, প্রজাকুলবৎসল এবং ষষ্ঠিসহস্র নগর শাসক। তার পুণ্যবলে ও অলৌকিক শক্তির দৈব অনুগ্রহে তিনি এক পুত্র সন্তানের পিতা হন এবং নাম রাখেন ইক্ষাকু। ইক্ষাকু পিতার মতোই পরাক্রমী বীর্যবান, ঐশ্বর্যশালী, পুণ্যবান ও প্রজাবৎসল। কিন্তু তার কোন পুত্রসন্তান ছিল না। অতঃপর রাজপুরোহিতদের পরামর্শে ও দৈব প্রভাবে পাঁচশত রানীর গর্ভে পাঁচশত পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। দেবরাজ ইন্দ্রের অসন্তষ্টির কারণে মহিষী শ্রেষ্ঠা অলিন্দা দেবীর পুত্র কুশবর্ণে ও রূপে হয় নিকৃষ্টতর। তবে ইন্দ্রের বরে সে হয় বলবান, জ্ঞানী, প্রজাহিতৈষী ও সিংহাসনের উত্তরাধিকারী। অন্য রাজকুমারেরা গুণে নয়, রূপে হয় সুন্দরতম। রাজা ইক্ষাকু অতি সচেতনে পুত্র কুশের দর্শনকে এড়িয়ে চলতেন। কুশের প্রতি রাজার অবজ্ঞা ও অবহেলা থাকে এবং রাজার অযত্ন ও অনাদরেই ঘটে অসুন্দর পুত্রের শরীর বর্ধন ও মানসিক শ্রীবৃদ্ধি। মা অলিন্দা দেবীই সহায় থাকেন একমাত্র পুত্রের। মায়ের যত্নেই অন্যের অমঙ্গলে দৃষ্টি ও ঈর্ষাপরায়ণতা থেকে আড়াল করে তাকে গড়ে তোলেন প্রজ্ঞাবান, জ্ঞানী, স্থিতিজ্ঞ ও প্রজাসাধারণের ধারণক্ষমতার সহমর্র্মীরূপে।

তবুও রাজা তাকে কুটকৌশলে হারিয়ে সিংহাসন বঞ্চিত করতে চাইলেন। কিন্তু সে খেলাতেও সকলকে হারিয়ে জয়ী কুশ ইক্ষাকুর উত্তরাধিকারী নির্বাচিত। অতঃপর কুশের বিবাহবন্ধন। বিবাহ দিলেন কাহ্নকুবুরাজ মহেন্দ্রক-এর অনিন্দ্য সুন্দরী কন্যা সুদর্শনার সাথে। বিয়ের পর বাসরশয্যা ও রাত্রিবাসের জন্য মাতা অলিন্দদেবীর পরামর্শে এটি নির্মিত হলো আলোকরশ্মি অনির্গত একটি অন্ধকার গৃহ। সুদর্শনা সেখানে রাজাকে শুধু অনুভূতিতে পায়। দর্শনের কোন সুযোগ থাকে না। তবুও অন্ধকারে তার গুণের প্রকাশে এক ধরনের আলো ছড়ায়। কিন্তু সে আলোতে তার তৃষ্ণা মেটে না। সূর্যের আলো ও জোৎস্নার আলোকেই সুদর্শনা রাজাতে দেখতে পায়। রূপের আকর্ষণী মোহ তাঁকে তাড়িয়ে ছোটায়। সে কুশকে ছেড়ে পিতৃগৃহে যায়। কিন্তু কোথাও তার শান্তি জোটে না। অবশেষে কুশের দিব্যজ্যোতির্ময় জ্ঞান ও আনন্দময় প্রকাশের কাছে সুদর্শনার সমর্পণ। কুশজাতক আখ্যানের বুদ্ধই ছিলেন পূর্বজন্মে কুশ, মহেন্দ্রক ছিলেন মহানাম, অলিন্দা মায়া, সুদর্শনা যশোধরা ও অন্য সাতরাজা ছিলেন তার সঙ্গী।

রবীন্দ্রনাথের রাজা নাটকের শুরুতেই মানবচিত্তের চিরন্তন আর্তি সুদর্শনার কণ্ঠে 'আলো, আলো কই। এ ঘরে কি একদিনও আলো জ্বলবে না।' রবীন্দ্রনাথ জাতকরহস্যের বিষয়ে বরাবরেই থেকেছেন নির্লিপ্ত ও অনাগ্রহী। তাই তো কূশজাতকের প্রথম অংশ রাজা নাটকে অনুপস্থিত। তাঁর হাতে বিনির্মিত রাজা শুধু ঘটনার পরম্পরায় আবদ্ধ নয়। সুদর্শনা তার হৃদয় স্বামীকে অনুভবে পেতে চায় হৃদয়ের অন্তরতম অন্ধকার ঘরে এবং বাইরের জগতের মাঝখানে।

রাজা মাটির আবরণ ভেদ করে পৃথিবীর বুকের মাঝখানে সুদর্শনার জন্য একটা ঘর নির্মাণ করেন। আলোর জগতের মধ্য দিয়ে রাজা অন্তর্জগতের সন্ধানে যখন বাহ্যতা থেকে অন্তরে যায়, তখন অন্ধকার কালো থাকে না। অন্ধকার তো ঘন দুর্ভেদ্য নয় যে, তাকে বোঝা যাবে না। বাইরে যখন রাজার বীণা বাজে তখন সুদর্শনার মনে হয়, সে তার বীণার সংগীত। আবার তার উত্তরীয়র স্পর্শ ও সুগন্ধ তার প্রেমকে করে রসময়। সুদর্শনার অন্তরাত্মা তার বহিরাত্মাকে ছুঁতে চায়, দেখবার জন্য ব্যাকুল হয়। তবে দেখে সে সামান্যই, অনুভবে নেয় অনেকটা। যারা মূঢ় তারা বহ্যিক দেখাকে 'দেখতে পাচ্ছি' বলে আত্মতৃপ্তিতে ভোগে। সে দেখার মধ্যে কি বহিরাত্মাকে ছোঁয়া; সুদর্শনা ভাবে_ নববর্ষার জলভরা মেঘ যখন বনপ্রান্তের নিবিড়তায় আশ্রয় খোঁজে, সে আশ্রয়ে চোখ জোড়ানো, ছায়ামাখা, হৃদয় ভরানো গভীরতার মাঝে রাজাকে দেখা যায়। শরৎ এর আকাশের দূরে সরানো পর্দাগুলো যখন চাঁদের জ্যোতিতে দ্যুতিময় করে কাঁশবনে জ্যেৎস্না খেলে, শেফালিরা স্নান করে প্রদোষের অপেক্ষায় থাকে; তখনই রাজা সাদা কাপড়ের উষ্ণীষ জড়িয়ে কুন্দফুলের মালা গলায় এদের জন্য প্রতীক্ষার ক্ষণ গোনে।

আর বসন্তকালে ফুলে ফুলে রাঙানো বনমাঝে রাজা কানে পরে কু-ল, হাতে অঙ্গদ, গায়ে বাসন্তী রঙের উত্তরীয়, হাতে তার অশোক মঞ্জুরী এবং তানে তানে রাণীর সবকটি সোনার তার হয় উতলা ও অধীর। এই সুঘ্রাণের আঘ্রাণ পেতে সুদর্শনা বাতায়নের ধারে বসে রাজার প্রতীক্ষায় থাকে। দিনের পর দিন রাতের পর রাত কোন অজ্ঞাত পথের সন্ধানে, কোন অনাঘ্রাত ফুলের গন্ধে তার মনটা কাঁদে। যখন সুদর্শনা এর সন্ধান পায়, তখন প্রিয়স্পদের সাথে শুভ্রতার মধ্যে চলতে চলতে কোন সিংহদুয়ারের পথে পৌঁছায়। এই শান্তিতেই থাকে বিনম্র সমর্পণ এবং সবকিছুতে একাকার হওয়া। প্রেমিকাহৃদয়ের সেটাই তো প্রত্যাশা। আর রাজা প্রেমের দেউলে সিক্ত ও তারই সি্নগ্ধতায় স্নান করান প্রেমিকাকে। প্রেমিক হৃদয় নিয়ে রাজা দেখে অনন্ত আকাশের অন্ধকার। তারই অনন্তের টানে ঘুরতে ঘুরতে কতো নক্ষত্রের আলো টেনে নিয়ে এক জায়গায় রূপ ধরে দাঁড়ায়, তার মধ্যে থাকে কতো যুগের ধ্যান, আকাশের পূর্ণ আবেগ এবং বহু বছরের ঋতুর ঐশ্বর্যময় রূপ লাবণ্য এবং তার মধ্যেই সে তার সুদর্শনাকে দেখে। নিজের আলোতে নিজেকে তো দেখা য়ায় না। সুদর্শনাকে বলে_ আমার চিত্তের মধ্যে যদি দেখতে পাও তো দেখবে, সে কত বড়ো। আমার হৃদয়ে তুমি যে আমার দ্বিতীয়, তুমি সেখানে কি শুধু তুমি।

আবার রাজা যখন বাসরঘরের সুখশয্যা ছেড়ে লোকালয়ে প্রজাকূল মাঝে, তখন তিনি থাকেন প্রজাবৎসল রাজা, নিষ্ঠায় বজ্রকঠিন ও অবিচলিত এবং দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধে নিষ্ঠুর। প্রজাসাধারনের কল্যাণে রাজা নিজেকে বিলোন নিঃস্বার্থে ও অন্যায়কারীর রাজনিগ্রহ প্রদানে তিনি থাকেন অনুদার। সুরঙ্গমার কাছেও রাজা নিষ্ঠুর, ভয়ংকর, অবিচলিত কঠোরতার প্রতীক। মাতৃহীন সংসারে পিতা তার রূপকে ব্যবহার করতো উপার্জনের উপায়ে। রাজা এর শাস্তি দিতে পিতাকে পাঠালেন নির্বাসনে। রাজা তাকে অন্ধকার জগত থেকে মুক্তি দিলেন। সে অন্ধকারে আবদ্ধ জগতে অনেকেই ছিল সুশ্রী, বহিরাবরণের চোখের দর্শনে তারা সুন্দর । তবুও তারা ছিল অসুন্দর ও কুৎসিৎ। পঙ্কিলতা ও নোংরা জীবনের অভ্যস্থতা থেকে সুন্দরতম প্রাপ্তির জন্যই সুরঙ্গমতার প্রতি রাজার ছিল নিদারুণ নিষ্ঠুরতা এবং সেই নিষ্ঠুরতাতেই সুরঙ্গমার সমর্পণ। ভয়ানকের মধ্যেই সুরঙ্গমার মুক্তি।

রাজা সুন্দরের উপাসক। সুন্দরের প্রতিমূর্তি। তবে শুধুমাত্র সুন্দরের ধ্যানে তাকে পাওয়া যায় না। অনেক সত্যের মধ্য দিয়েই তাকে পাওয়া। সে সত্যের মধ্যে থাকে অনেক নিষ্ঠুরতা। ভয়ংকরের মধ্যদিয়েই সিদ্ধিলাভ। সুরঙ্গমা তা রানীকে বারবার বোঝাতে চেয়েছে লোকে যাকে সুন্দর বলে রাজা তা নয়, বরং তিনি ভয়ংকর দেখতে। তিনি নিষ্ঠুর ও চরিত্রে তার অবিচল নিষ্ঠুরতা। সুদর্শনা রাজকন্যা। তাইতো রাজার সংশয়_ তার এই ভয়ংকরতার মুখোমুখিতে তাকে হারানো। সুদর্শনার অভ্যস্থ জীবনের সহনশীলতায় রাজার ভয়ংকরকে সহ্য করার মনোবৃত্তির উপস্থিতি তার মধ্যে না থাকাই স্বাভাবিক। তার ইচ্ছে হয় রাজা যেমন করে তাকে দেখে তেমনি করেই তার কাছে একবার তিনি নিজেকে চিনিয়ে দিক। তার সংবেদনশীল অন্ধকারের রাজাকে ভয় করে। কঠিন কালো লোহার মতো, ঘুমের মতো, মূর্ছার মতো, মৃত্যুর মতো অন্ধকারে রাজার সাথে তার মিলন অসম্ভব করে তোলে। সুদর্শনা তাকে গাছপালা, পশুপাখি, মাটি পাথর ও চির পরিচিত প্রকৃতির মাঝেই দেখতে চায়।

সুদর্শনা রাজাকে দেখবার ইচ্ছেতে অটল। রাজাও অবশেষে সম্মতি জানান_ বসন্ত পূর্ণিমার উৎসবে দক্ষিণের কুঞ্জবনে যখন পঞ্চমে বাঁশি বাজবে, ফুলের কেশরের ফাগ উড়ে জোৎস্নার ছায়ার সাথে যখন লুকোচুরি খেলবে, তখন সহস্র লোকের মাঝে রাজা থাকবে। সুদর্শনা যখন প্রাসাদের শিখরে দাঁড়াবে, রাজা তখন বাগানে সহস্র লোকের মধ্যে সকল দিক হতে দেখা দেবে। রাজা চাইলেন সুদর্শনার অন্তরাত্মা রাজাকে যেন দেখতে পায়। হৃদয়ের অন্তপুরে সে যেন লাভ করতে পারে তার পরমকে। হৃদয়ের প্রেমের বাঁশিতে তিনি তো নিজেই ধরা দেয়। সুদর্শনা তখন দেহগত সৌন্দর্য ও অন্তরলোকের সৌন্দর্যের সমন্বয় দেখতে চান রাজার মধ্যে। কিন্তু রাজা সুদর্শনার সমর্পণ প্রত্যাশী এবং নিশ্ছিদ্র ও একান্তভাবে রাজাতেই সমর্পণে অভিলাষী।

বসন্ত উৎসব সমাগত। দেশ বিদেশের বহু রাজা ও হাতি ঘোড়ায় উৎসবের প্রকৃতিগত আবেদনকে নিষপ্রাণ করে। এর মধ্যে সকলেই রাজার নাস্তিত্ব খোঁজেন। আবার ঠাকুরদার কণ্ঠে শোনা যায়_ 'আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে'। এ রাজার রাজত্বে ছোটর কারণে তুচ্ছতা নয়, ছোট বড় সকলেই একই পথের যাত্রী। মুক্ত জীবন সত্যই রাজার প্রতীক। এই সত্যানন্দেই পরম মুক্তি, পরম আনন্দ। সকলের অন্তর্দৃষ্টিতে তার স্বরূপ হয় প্রকাশিত:

আমার প্রাণের মানুষ আছে প্রাণে,

তাই হেরি তায় সকল খানে।

ঠাকুরদা মোহমুক্ত। সন্তান হারানোতে তার নিত্য আনন্দ চিত্তের কোন ছন্দ হারায়নি। তাই তো তিনি গাইতে পারেন:

নাচে জন্ম, নাচে মৃত্যু পাছে পাছে

তাতা থৈথৈ তাতা থৈথৈ তাতা থৈথৈ।

কী আনন্দ, কী আনন্দ, কী আনন্দ_

দিবারাত্রি নাচে মুক্তি, নাচে বন্ধ, (চলবে)

Additional Info

  • Image: Image