২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ১২ চৈত্র ১৪২৩ বঙ্গাব্দ রবিবার, ২৬ মার্চ ২০১৭ইংরেজী
সোমবার, 17 মার্চ 2014 18:56

রবীন্দ্র মনন ও সাহিত্যে বৌদ্ধ চেতনা (৫)

লিখেছেনঃ বিজন গোলদার

রবীন্দ্র মনন ও সাহিত্যে বৌদ্ধ চেতনা (৫)

বিজন গোলদার

(পূর্ব প্রকাশের পর)

নয়

প্রায় দু'হাজার বছর আগেকার শ্যামাজাতক আখ্যানের মূলে 'মহাবস্তু অবদান'। প্রাচীন আখ্যানের শ্যামাজাতক কাহিনী বেশ সুদীর্ঘ। এই সুদীর্ঘ আখ্যানকে কেন্দ্র করেই রবীন্দ্রনাথের শ্যামানৃত্যনাট্য বা পরিশোধ কবিতা। একদা তক্ষশীলা নগরে বজ্রসেন নামে অশ্ববণিক অশ্ববাণিজ্য উপলক্ষে বারানসী আগমন করেন। তখন দস্যুদের দ্বারা বজ্রসেনসহ অন্যান্য বণিকেরা আক্রান্ত হয়। অনেকেই হয় আহত এবং নিহত। বজ্রসেন নিজের জীবন রক্ষার্থে এক মৃত ব্যক্তিকে শরীরের উপর শুইয়ে রক্তাক্ত শরীর নিয়ে দস্যুদের হাত হতে কোনভাবে বেঁচে যায়। দস্যুরা রাজভা-ার থেকেও চুরি করে। তখন রাজপ্রহরীরা বজ্রসেনকে সন্দেহ বশে চোর প্রতীয়মাণ করে এবং তাকে জীবিত অবস্থায় শূলে বিদ্ধ করে হত্যা করার রাজনির্দেশ জারি হয়। তাকে বধ্যভূমিতে নিয়ে যাওয়ার পথে বজ্রসেনের দেহসৌষ্ঠবের প্রতি আকর্ষিত হয় বারানসীর প্রধান গণিকা শ্যামা। শ্যামা সুন্দর তুল্যে অসামান্যা। বিশেষ কোন পুরুষে তার গতি সীমাবদ্ধ নয়। যার প্রতি সে আসক্ত হতো, রূপ ও ছলনায় তাকে বশ করা ছিল শ্যামার স্বভাবজাত অভ্যাস। অনাকাঙ্ক্ষিত প্রেমিককে সরিয়ে দিতে ছলনার ছন্দ কৌশলেও সে ছিলো সুদক্ষ, নিপুণা ও নিষ্ঠুর। তার মুগ্ধতা বজ্রসেনের সৌন্দর্যে, তার পরম প্রার্থিত ও কামনার পুরুষটি তখন নগর কোটালের হাতে বন্দী। প্রাণনাশের দ্বারপ্রান্তে সে। বজ্রসেনকে ছাড়িয়ে আনার জন্যে তার বিশ্বস্ত দাসীর মাধ্যমে প্রস্তাব পাঠায় বহুমূল্যহিরণ্যের বিনিময়ে তার প্রেমিক পুরুষের মুক্তি। প্রেমিকার তুষ্টে তার অন্যতম এক অনুরাগী শ্রেষ্ঠীপুত্র উত্তীয় মৃত্যুকে গ্রহণ করে আপন ইচ্ছাতে। বধ্যঘাতকদের হত্যায় প্রেমের স্বীকৃতি মিললো এবং হৃদয়ের ঐশ্বর্যে মহিমান্বিত উত্তয়ীর প্রেম বধ্যঘাতকদের স্পর্শাতীত থেকে অবিনশ্বর হলো। অতঃপর শ্যামার কাছে সমর্পিত হয় শৃংখলামুক্ত বজ্রসেন এবং শ্যামার আসক্তিতে তার নিবৃতি। তবুও শ্যামায় সে পূর্ণ সমর্পিত নয়। উত্তীয়র প্রতি অমানবিক আচরণ বজ্রসেনের মনে ঘৃণা ও ক্ষমাহীন করে শ্যামার বিরুদ্ধে।

তাই তো কোন এক সুযোগে প্রেমের অভিযাত্রীর অভিনয়ে শ্যামাকে সংজ্ঞাহীন অচৈতন্য অবস্থায় ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। মূল আখ্যান অনুযায়ী পূর্বজন্মে বুদ্ধই ছিলেন সেই বজ্রসেন এবং শ্যামা পরজন্মের বুদ্ধস্ত্রী যশোধরা যাতে তিনি ত্যাগ করেন।

রবীন্দ্রনাথের শ্যামা মূল কাহিনীর ভাবগত দিক থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। আখ্যানের শ্যামা এক কামার্ত অগ্রগণিকা। বাসনা তার নিবৃত্তিহীন। প্রেম লালসা, ছলনা ও ভোগরসে পূর্ণ। ভোগ এখানে বিরতিহীন ও ক্লান্তিকর এবং অবসাদগ্রস্ত। কামনার তীব্র দহনে সংরাগের আহুতিতে তার অবসতার গ্রাহ্যতা থাকে; বৈরাগ্যের সি্নগ্ধ প্রশান্তির আনন্দলোকের স্পর্শ থাকে অনাস্বাদিত।

রবীন্দ্রনাথের শ্যামা রাজনটি, সুন্দরীশ্রেষ্ঠা, নৃত্যগীতে অসাধারণ গুণবতী। তার ব্যক্তিত্ব প্রেমের উপকরণে পূর্ণ। প্রেমের গরবেই গরবিণী সে। ভোগবিলাস ও যৌবনের উন্মাদনায় সে নয় আত্মবিস্মৃতা। আত্মসচেতন ও আত্মমর্যদাবোধে সে পৌঁছায় না আত্মকেন্দ্রিকতায়। প্রেমের দেউলেই সে বিসর্জিত। বজ্রসেনকে দর্শনমাত্র তার তৃষ্ণার্ত হৃদয়ে জাগে প্রেমের রোমান্টিকতা, কামনার আকাঙ্ক্ষায় সে ক্লেদাক্ত নহে। 'পরিশোধ' কবিতায় শ্যামার কণ্ঠে আবেদনে থাকে:

মহেন্দ্রনিন্দিত কান্তি উন্নতদর্শন

কারে বন্দী করে আনে চোরের মতন

কঠিন শৃঙ্খলে! শীঘ্র যালো সহচরী,

বল্ গে নগরপালে মোর নাম করি

শ্যামা ডাকিতেছে তারে, বন্দী সাথে লয়ে

একবার আসে যেন এ ক্ষুদ্র আলয়ে

দয়া করি!

বজ্রসেনের উন্নত দর্শনে প্রকাশ থাকে তার হৃদয় সৌন্দর্য ও চরিত্রের বলিষ্ঠতা। প্রথম দর্শনেই শ্যামা বোঝে যার জন্য যৌবনের শুরু থেকে প্রতীক্ষা, তিনিই এই উন্নতদর্শন দেবদর্শী পুরুষ। যাকে শরীর ও মনের সর্বস্ব দিয়ে, নিজের সুখদুঃখের সকল সমর্পণের ভিতরে অশেষের যাতনার দুঃখ গ্রহণের জন্য তার এই ব্যাকুল প্রতীক্ষা। বাহ্যিক ঐশ্বর্যের অলংকারাদিতে সে মোহহীন ও পরম পুরুষের সকল দায় নিজে নিয়েই শ্যামা মুক্তিপ্রার্থিনী।

মোর অঙ্গের স্বর্ণ-অলংকার

সপি দিয়া শৃঙ্খল তোমার

নিতে পারি নিজ দেহে।

তার পিপাষার্ত হৃদয় পেলো জলের সন্ধান। বজ্রসেনের মধ্যে দেখলো এতদিনের না পাওয়ার শূন্যতার অপূর্ণতা থেকে পূর্ণতা প্রাপ্তির প্রত্যাশা। তাকে পাওয়ার আশায় শ্যামার দেহমনের প্রতিটি অণুপরমাণু হলো অধীর, উতলা ও মত্ত। প্রেমের এ উন্মাদনা ও উন্মত্ততাই মানবহৃদয়ের সকল সত্তায় সর্বগ্রাসী সাম্রাজ্য খোঁজে পরস্পরে। আবার কখনো এক পক্ষীয় প্রেম যখন অন্যজনের কাছে থাকে প্রত্যাখ্যাত, তার স্বরূপে থাকে নিজের সর্বস্বত্যাগ, পৃথিবীর সকল বিসর্জনের মধ্যে শুধু নিজেরই সমর্পণ ও নিজ প্রাপ্তির ঐশ্বর্যতেই থাকে তা শোভাম-িত ও অলংকারযুক্ত। কখনো কখনো তা হয় মানবতাবর্জিত, মানববিমুখতা ও মোহাবিষ্টতায় আত্মসুখ।

উত্তীয়র প্রেম শ্যামার কাছে প্রত্যাখ্যাত। তার আবেদনে শ্যামা নির্বিকার ও অনুচ্চারিত। তবুও শ্যামার প্রেমাস্পদের জন্য উত্তীয়র আত্মবিসর্জন। শ্যামার দেয়া রাজ অঙ্গুরী ধারণ করে চোর সেজেই তার আত্ম বলিদান। এ বিসর্জনে তার নিবেদনে থাকে।

ন্যায় অন্যায় জানিনে, জানিনে, জানিনে,

শুধু তোমারে জানি

ওগো সুন্দরী।

চাও কি প্রেমের চরম মূল্য দেব আনি,

দেব আমি ওগো সুন্দরী।

প্রিয় যে তোমার, বাঁচাবে যারে,

নেবে মোর প্রাণঋণ,

তাহারি সঙ্গে তোমারই বক্ষে

বাঁধা রব চিরদিন

মরণডোরে।

বজ্রসেন উত্তীয়র কাছে অপ্রাসঙ্গিক। ন্যায় অন্যায়ের বিচারক সে নয়, সে প্রেমিক। তার আত্মদান প্রেমের দেউলে। সে জানে শ্যামার ভালবাসার বক্ষে উত্তীয় উপেক্ষিত। তবুও কিন্তু তার মৃত্যু শ্যামার কাছে হবে মৃত্যুঞ্জয়ী। উত্তীয় নিজ মৃত্যুর অস্তিত্বের মধ্যে শ্যামার ভালবাসার পরশ পায়। কল্পনায় সে শ্যামা ও বজ্রসেনের মিলনে শ্যামার মধ্যে ভালবাসার জায়গা খোঁজে। মৃত্যুর মধ্য দিয়েই প্রেমিক উত্তীয় শ্যামাকে দেখে। উত্তীয়র চরম দান গ্রহণ করে শ্যামা। তবে প্রতিদানে প্রেম থাকে না উত্তীয়র প্রতি, থাকে শুধু অন্তরের পরিপূর্ণ শ্রদ্ধা ও চরণে বিনম্র প্রণাম।

উত্তীয়ের প্রেমের ব্যর্থতার নিদারুণ নিরাশায় তার আত্মহনন। আত্মহননের জৈবিক প্রক্রিয়ার মৃত্যুপূর্ব অনুভূতিতে তার ত্যাগের মূল্যের অনুভূতিতে শ্যামাকে পাওয়া, তার অন্তর্জ্বালায় তাকে পাওয়া ও তার প্রেমিকের মধুর আলিঙ্গনের পরম পাওয়ার মাঝে তাকে পাওয়া। তার সকল পাওয়ার পিছনে অস্তিত্বে থাকে উত্তীয়র অশরীরী স্পর্শ। এখানেই তার সার্থকতা। বিপরীতভাবে উত্তীয়র মর্মান্তিক মৃত্যুতে মানবতার পরাজয় এবং মৃত্যু ব্যর্থতার অনুসারী। তাই তো সখীদের বিলাপে থাকে:

মধুর দুর্লভ যৌবনধন ব্যর্থ করিলি

কেন অকালে

পুষ্পবিহীন গীতিহারা মরন মরুর পরে,

ওরে সখা।

উত্তয়ীর আত্মদানে শ্যামা হয় আত্মদগ্ধ। কল্যাণবোধে তাড়িত হয়ে সে উত্তীয়কে বাঁচাতে চায়। হয়তো তার এ ব্যাকুলতা প্রেমের অংশমূল্যে নগণ্য।

অতঃপর প্রেমের বেদীতে উত্তীয়র সমর্পণ। উত্তীয়র এ আত্মত্যাগে প্রেমের ঔজ্জ্বল্য হয় দীপ্তমান।

কোন্ অপরূপ স্বর্গের আলো,

দেখা দিল যে প্রলয়রাত্রি ভেদি

দুর্দিন দুর্যোগে,

মরণমহিমা ভীষণের বাজালো বাঁশি।

অকরুণ নির্মম ভুবনে

দেখিনু একি সহসা_

কোন্ আপনা-সমর্পণ, মুখে নির্ভয় হাসি

উত্তীয়ের আত্মাহুতিতেই বজ্রসেনের মুক্তি। তাইতো অশেষ কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ বজ্রসেন শ্যামার বাহুপাশে। সে প্রেমিক হিসেবে ধরা দেয় শ্যামার বাহুপাশে। তার সমর্পণে থাকে প্রণয়, কৃতজ্ঞতা, আন্তরিকতা ও সমর্পণ। শ্যামার মনে দ্বিধান্বিত শঙ্কা থাকে, সংকুচিত আশঙ্কায় থাকে_ 'সদাভয়, হারাইয়া ফেলি চকিতে।' তার প্রেমের আহ্বানে থাকে_

'তোমা-সাথে এক স্রোতে ভাসিলাম আমি

হে হৃদয়স্বামী,

জীবন মরণে প্রভু।'

শ্যামার প্রতি বজ্রসেনের জাগে অপার্থিব করুণা ও মিলন ভালবাসায় তাকে পাওয়ার জন্যে প্রেমের আকাঙ্ক্ষা। তার মনে হয় অন্ধকার কারা প্রকোষ্ঠ থেকে বের করে নতুন জীবনের অমৃতসুগন্ধ দিয়েছে যে নারী, সে তো লক্ষ্মী স্বরূপা দয়াময়ী। প্রেমের মূল্যে তার কলঙ্ক ও পাপ অমৃত বরষণে ধুয়েমুছে শুদ্ধ এবং পবিত্র হয়। তার বাণীতে থাকে:

প্রেমের জোয়ারে ভাসাবে দোঁহারে

বাঁধন খুলে দাও, দাও দাও।

ভুলিব ভাবনা পিছনে চাবনা,

পাল তুলে দাও, দাও দাও।

মিলন গ্রন্থির অশক্ত বাঁধনের মিলনতরীতে তারা ভেসে চলে। অলক্ষে অদৃষ্ট হাসে। নিবিড় ভালবাসার এ প্রেমের মিলনে হারাতে হারাতেই বজ্রসেন জানতে চায় মুক্তিমন্ত্রের রহস্য। শ্যামা জানায়_ তার সত্যকে। তার প্রেমের মূল্যে বজ্রসেনের জীবন বাঁচাতে যে কাজ শ্যামা করেছে তা নির্দয় ও নিষ্ঠুর এবং আরো সুকঠিন বজ্রসেনকে বলা। তবুও শ্যামাকে জানাতে হয় নিষ্ঠুর সত্যকে। উত্তীয় নামীয় শ্যামা প্রেমে ব্যর্থ কিশোর বালক তার অনুরোধে চুরির অপবাদ গ্রহণ করে আত্মঘাতি হয়। তার এই প্রেমের উন্মত্ততায় প্রেমিকার প্রতি আত্মৎসর্গের মধ্যেই বজ্রসেনকে পাওয়া। শ্যামার এ নিষ্ঠুরতায় বজ্রসেন হয় নিষ্করুণ ও মর্মাহত। বজ্রসেনের প্রতিক্রিয়ায় থাকে:

কাদিতে হবে রে, রে পাপিষ্ঠা,

জীবনে পাবি-না শান্তি

ভাঙিবে ভাঙিবে কলুষনীড় বজ্র-আঘাতে।

শ্যামার আশাহত বেদনা ও তার প্রকাশে থাকে প্রেমের আর্তি:

তোমার কাছে দোষ করি নাই,

দোষ করি নাই।

দোষী আমি বিধাতার পায়ে,

তিনি করিবেন রোষ_

সহিব নীরবে।'

... ... ...

ছাড়িব না ছাড়িব না, ছাড়িব না।

তোমা লাগি পাপ নাথ,

তুমি করো মর্মাঘাত।

ছাড়িব না।

বজ্রসেন তবুও ক্ষমাহীন। শ্যামাকে ধিক্কার জানাতে গিয়ে সেও হয় আত্মধিকৃত। পাপ মূল্যেই তার জীবন কেনা। তার ক্রোধান্বিত মনে প্রেমিকা হয় আশ্রয়হীন, প্রেমিক সমর্পিত হয় বিবেক ও ন্যায়নিষ্ঠ মানুষে। মানুষে ও প্রেমিকে তখন দ্বন্দ্ব চলে। প্রেমিকা তখন পার্থিব সকল বন্ধন ঘুচিয়ে শুধু হয় প্রেমিকের দয়া প্রার্থনার করুণাপ্রার্থী। প্রেমিক বিচারকের আসনে বসে প্রেমিকার বুকে হানে মৃত্যু আঘাত এবং তাকে মৃত জেনে কোন কল্যাণব্রত সাধিত হয়েছে ভেবেই তার প্রস্থান। তাইতো প্রেমের অমৃতপাত্র অনাস্বাদিত থাকে প্রেমিকের কাছে।

(চলবে)

Additional Info

  • Image: Image