২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ১১ আষাঢ় ১৪২৪ বঙ্গাব্দ রবিবার, ২৫ জুন ২০১৭ইংরেজী
শনিবার, 15 মার্চ 2014 17:22

রবীন্দ্র মনন ও সাহিত্যে বৌদ্ধ চেতনা (৪)

লিখেছেনঃ বিজন গোলদার

রবীন্দ্র মনন ও সাহিত্যে বৌদ্ধ চেতনা (৪)

বিজন গোলদার

(পূর্ব প্রকাশের পর)

সাত

প্রাচীন বৌদ্ধ সাহিত্যের অন্তর্গত 'দিব্যদানমালা' গ্রন্থের ছত্রিশ সংখ্যাক আখ্যানের নাম মাকান্দিকাবদান বহুশাখাবিস্তৃত এই আখ্যানের একটি উপশাখা শ্যামাবতীর কাহিনী। সেই আখ্যানকে কেন্দ্র করেই রবীন্দ্রনাথ নির্মাণ করেছেন 'সামান্যক্ষতি'। শ্যামাবতীর কাহিনীতে আছে শ্যামাবতী ও পাঁচশত রমণীর জন্ম-জন্মান্তরের আত্মশুদ্ধির বর্ণনা; হীনকাজের ফলস্বরূপ কষ্টভোগ ও সত্যদর্শন লাভ। রবীন্দ্রনাথ জন্মজন্মান্তর ইতিহাসভিত্তিক দর্শনের তত্ত্বকে অনাগ্রহের কারণেই পরিহার করেছেন। মূল কাহিনীর শ্যামাবতীর আখ্যান অংশে আছে, বারানসীতে বহুকাল আগে ব্রহ্মদত্ত নামে এক রাজা ছিলেন। তিনি ছিলেন ন্যায়নিষ্ঠ, সম্পদশালী, দয়াবান ও ধর্মপ্রাণ। সে সময় একহারা রিক্ত অন্যমত প্রত্যেকবুদ্ধ বারানসীর এক কুটিরে এসে অবস্থান নেন। রাজা ব্রহ্মদত্ত তখন সপরিবারে অন্তঃপূরীবাসিগণ নিয়ে উদ্যানগৃহে গমন করেন। পুস্করিণীতে স্নান ও জলক্রীড়া শেষে অগ্রমহিষী ও অন্তঃপুরীবাসীরা তখন শীতার্ত। অগ্রমহিষী তখন একজন সহচরীকে উদ্যানসংলগ্ন কুটিরে আগুন জ্বালাতে নির্দেশ দেন। কুটিরে প্রত্যেকবুদ্ধের দর্শন পেয়ে সে রানীকে আগুন জ্বালানো থেকে নিবৃত্তির পরামর্শ দেয়। ক্রুদ্ধা রাজমহিষী তখন নিজেই কুটিরে অগি্নসংযোগ করেন। প্রত্যেকবুদ্ধ তখন ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন এবং আকাশমার্গে উপস্থিত হয়ে তাঁর দিব্যক্ষমতা প্রদর্শন করেন। তার অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা দর্শনে সকলেই তার পদমূলে পতিত হলেন ও ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। মূলের শ্যামাবতীর কাহিনী এখানে শেষ নয়। তার আত্মশুদ্ধির বিবরণ আরো বিস্তৃত।

রবীন্দ্রনাথের 'সামান্যক্ষতি' মূল আখ্যান হতে স্বতন্ত্র ও মানব মহিমার অকৃত্রিম সাধনার মধ্যেই তা প্রোজ্জ্বল ও অনন্য।

রাজমহিষী করুণা। বুদ্ধের ত্রয়ী আদর্শের অন্যতম করুণা। রবীন্দ্র কল্পনায় আশ্রিত রাজমহিষী হবে করুণার প্রতীক। তখন মাঘ মাস। বইছে শীতের ঠা-া বাতাস। স্বচ্ছসলিলা বরুণা প্রবাহিত। অন্তপুরীর দূরে নির্জন চম্পকবনের শিলাময় ঘাটে রামমহিষী করুণা শতসখীসনে স্নানে চলেছেন।

যাত্রাপথের কুটিরগুলো রানীর স্নান উপলক্ষে গরিব প্রজারা ছেড়ে গেছে। প্রভাতে পাখির কুঞ্জনধ্বনির নিস্তব্ধতা ভাংগার মধ্যেই রানীর স্নানবিহার। তখন উত্তরের বাতাসে উতলা তটিনী। প্রভাতী সূর্যের নবীন আলোকিত সোনালি ঢেউগুলো যেন নৃত্যপটিয়সী রমণীর আঁচলে লক্ষমানিকের মতো শোভা পায়।

প্রকৃতির এই ঐশ্বর্য ও বিভূতিকে হার মানায় নারীকণ্ঠের কাকলি। রমণীশরীরের মৃণালবাহুর ললিতবিলাসে নদীও উল্লাসে তাদের সাথী হয়। আকাশও নারীদের আহ্বানে ভূমিতলে নেমে এসে আকুলি বিকুলি করে। নদী, নারী ও প্রকৃতি বিশ্বজনীন চেতনায় আশ্রয়ী ও সহবাসী। রবীন্দ্রনাথ এখানে পরস্পরকে মিলিয়েছেন একে অন্যের পরিপূরক রূপে।

অতঃপর স্নান সমাপন। মহিষী সখীগণ সাথে কূলে ওঠেন। শীতে তার সমস্ত শরীর কম্পমান। অদূরেই তিনি দেখেন পর্ণ কুটির। তার প্রজ্বলিত অগি্নতেই তিনি সুখের সন্ধান করেন। দাসী মালতীর কণ্ঠে সংশয় থাকে কোন সাধু-সন্ন্যাসী, কোন-দীনজন বা পরবাসী এ ঘর বেঁধেছে। এতে অগি্নসংযোগে তার মানব হৃদয় বিদ্রোহী হয়। এতে রুষ্ঠা রাজমহিষী তাকে তাড়িয়ে দেন এবং নিষ্ঠুর কৌতুকে যৌবনের উন্মাদনায় শুভবোধ বিসর্জিত মহিষী করুণা অকরুণার মূর্তরূপেই কুটিরে অগি্নসংযোগ করেন। অগি্নর লেলিহান প্রসারণ তখন আকাশ ও বাতাসে। পাতাল ভেদিয়া বিষাক্ত সর্পিণীরা ফণা বিস্তারিয়া ধেয়ে যায় এক কুটির হতে অন্য কুটিরে। আনন্দরূপী আলোর আবাহনকারী প্রভাতের পাখীরা তাদের আনন্দ সংগীত থামিয়ে দেয়। অবশেষে প্রমোদে ক্লান্ত রানী শত সখী সাথে দীপ্ত অরুণ বসনে অন্তঃপুরে ফেরেন।

রাজা তখন রাজসভায় বিচার আসনে সমাসীন। গৃহহীন প্রজারা তখন দ্বিধাসংসয়, সংকোচ ও দুঃখে কম্পিত পদে রাজার চরণে তাদের কষ্টের বিবরণ করলো। লজ্জায় আরক্তিম রাজা ক্রোধে উত্তেজিত হয়ে অসময়েই মহারানীর অন্তঃপুরে প্রবেশ করলেন। মহিষীকে জিজ্ঞাসা করলেন_ কোন রাজধর্মে সে গরিব নিরিহ প্রজাদের ঘর জ্বালিয়েছে। মহিষীর রোষান্বিত উত্তর:

গৃহ কহ তারে কি বোধে।

গেছে গুটিকত জীর্ণ কুটির,

কতটুকু ক্ষতি হয়েছে প্রাণীর?

কত ধন যায় রাজমহিষীর

এক প্রহরের প্রমোদে।

প্রজাবৎসল রাজা রুদ্ররোষকে প্রশমিত করে রানীকে বললেন_ রাজরানীর ঐশ্বর্য নিয়ে প্রজার ক্ষতি বোঝার উপলব্ধি তার নেই। রাজাদ্দেশে কিঙ্করী এসে রানীদেহ থেকে সকল বসনভূষণ আবরণ খুলে তাকে ভিখারীর জীর্ণবাস পরিয়ে দেয় এবং এক বৎসর সময়কালের মধ্যে তাকে দুয়ারে দুয়ারে ভিক্ষা প্রার্থনা তারই কৃতক্ষতির প্রায়শ্চিত্ত তাকে করতে হবে এবং এ সকল কুটির নির্মাণই হবে তার শাস্তি থেকে মুক্তি।

বৌদ্ধসাহিত্যের এই প্রাচীন আখ্যান নির্মাণের মূলেই ছিল বুদ্ধের আলৌকিত্ব। প্রেম, মৈত্রী ও করুণার বন্ধনে তিনি বিশ্বজনকে আপন কৃতকর্মের সত্যজ্ঞানের পরশ দেন, এ জাতীয় বিশ্বাস বৌদ্ধ সাহিত্য ও দর্শনে সর্বত্র। বুদ্ধের এ দিকগুলো থেকে রবীন্দ্রনাথ সর্বদাই থেকেছেন দূরে, বরং এক্ষেত্রে তিনি নিরুত্তাপ ও আকর্ষণহীন। মানুষ বুদ্ধেই তিনি স্থিত। নিরলস কষ্ট, ত্যাগ, অকৃত্রিম সত্যসাধনা, মানবআর্তিকে পরমার্থ জেনে জগত সংসারকে প্রেম মৈত্রী ও করুণার আধারে তিনি বেঁধেছেন। সকল অহং বিসর্জন দিয়ে বিশুদ্ধ মানব মহত্ত্বেই তাঁর যাত্রাশেষ। রবীন্দ্রনাথের যাত্রাও সেই মানব মহত্ত্ব স্পর্শের উদ্দেশ্য। অহং-এর ঐশ্বর্যে অন্ধ, বিত্তের গর্বে দর্পী ও রিপুর আধিপত্যে উন্মত্ত রানীকে চিত্তশুদ্ধির পুনর্জাগরণের জন্য রাজা তাকে দেয় শাস্তি। রাজমহিষী শুধু রাজার প্রেয়সী নয়, তিনিম তো প্রজামাতা। প্রজাবৎসল রাজা সকলকে জানিয়ে দিলেন মাতৃরূপ প্রতিষ্ঠার জন্যই রানীর প্রতি রাজার এই বিধান এবং রানীর ক্ষেত্রে আইনের কোন তারতম্য নেই। রবীন্দ্রনাথ এখানেই বুদ্ধের মানব ধর্মের সারৎসার নিয়ে সকল আলো ফেলেছেন ন্যায়ধর্ম প্রতিষ্ঠার দিকে। ঔচিত্যবোধের এ কথাটি সর্বকালে ও সর্বযুগেই সত্য।

আট

বৌদ্ধ প্রাচীন সাহিত্য 'দিব্যাবদানমালা'র অন্তর্গত চূড়াপক্ষাবদানম। এই প্রাচীন আখ্যানকে কেন্দ্র করে পন্থক ও মহাপন্থক (পাঠান্তরে পঞ্চক ও মহাপঞ্চক) কাহিনী। রবীন্দ্রনাথের অচলায়তন নাটকটি পঞ্চক ও মহাপঞ্চক এর বিষয়বস্তুকে কেন্দ্র করেই বিনির্মিত।

মূল ঘটনায় আছে ভগবান বুদ্ধ তখন অনাথপি-দের জেতবনের উদ্যানগৃহে বিহাররত। তখন সেখানে বাস করতেন শ্রাবস্তীর অন্যতম এক প-িত ব্রাহ্মণ। তার দুটি পুত্র মহাপন্থক ও পন্থক বৌদ্ধ ভিক্ষুদের আশীর্বাদে জীবনলাভ করেন। মহাপন্থক বয়ঃপ্রাপ্তির সাথে সাথে বৈদিক জ্ঞান ও ব্রাহ্মণ শাস্ত্র অধ্যয়নে বুৎপত্তি অর্জন করতে থাকেন। কিন্তু পন্থক তার স্মৃতি দুর্বলতার কারণে সকল মন্ত্রই তার স্মৃতিতে হয় বিস্মৃত। তাদের পিতৃবিয়োগের পর তারা দীক্ষিত হয় বৌদ্ধধর্মে। মহাপন্থক সংসার বিরাগী সমদর্শী বিদ্যাভিজ্ঞ, ত্রিপিটজ্ঞ হয়ে মহাজ্ঞানী হন। কিন্তু পন্থক শত চেষ্টাতেও কোন গাথাই আয়ত্তে আনতে সক্ষম হলেন না। অবশেষে বুদ্ধর আশীর্বাদধন্য আনন্দর চেষ্টাও বিফল হলো। কিন্তু বুদ্ধের মতে তার বাল্যভাব থাকার কারণে প-িত এবং প-িতজনকে মান্য করেন বলেই বালস্বভাবের। তার এই বালস্বভাব ও অহংশূন্য চিত্তের বৈভব থাকায় বুদ্ধের আশীর্বাদে তিনি ছয়টি শ্রেষ্ঠ গুণ দান, শীল, ক্ষান্তি, বীর্য, ধ্যান ও প্রজ্ঞাশক্তি অর্জন করেন।

মূল আখ্যানের সাথে রবীন্দ্রনাথের মিল অপেক্ষা অমিলই বেশি। তবে নাটকের নামগুলো নির্বাচনক্ষেত্রে তিনি মহাপঞ্চক ও পঞ্চক কাহিনী আশ্রিত হন।

বুদ্ধ প্রচলিত ধর্ম বিশ্বাসে অবিশ্বাসী। সাধারণ মূল্যবোধে চালিত ধর্মপথের তিনি বিরোধী ও প্রচলিত বিধির নিয়মাচার ভাঙ্গনে বিপ্লবী। সার্বভৌম (সর্বশক্তিমানের) সার্বভৌমত্বের ক্ষমতার প্রশ্নে তিনি থাকেন ঋণাত্মক। তবে জড়বাদী হয়েও আত্মার সৌন্দর্যে তিনি দেখেন বিশ্বজগতের সৌন্দর্য। বিশ্বমানব মূর্ত হয় প্রেম মৈত্রী ও করুণার আদর্শে। অধিজৈবিক অবস্থান থেকে প্রেম ভালবাসা ও মৈত্রীর বাঁধনে সে হবে দুঃখমুক্ত মহাজ্ঞানী, স্বর্গবিমুখ ও সর্বজনেই তার মুক্তি।

ব্রাহ্মণ্যবাদের আচার সর্বস্বতা ও বর্ণবাদ ভিত্তিক বিভাজনের বিপক্ষে তিনি সাম্যবাদী। মন বিকাশের বিশুদ্ধতার পথে মানবের আত্মমুক্তি। তার এই আত্মমুক্তির পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় অবক্ষয়প্রাপ্ত বৌদ্ধধর্ম। সাম্যবন্ধন ও মৈত্রীর আদর্শ আলগা হতে হতে নীচুকে নীচুতে ফেলে অশুচিকে অসপৃশ্য করে। মানবকে অমানব করে মন্ত্র তন্ত্র ও পুঁথিকে করে সার্বভৌম।

অচলায়তন নাটকে রবীন্দ্রনাথ আচারসর্বস্ব ধর্ম ও অন্ধ সংস্কার ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানিক ধর্মতন্ত্রকে প্রলয়বেশী মুক্ত চেতনা দিয়ে বশ করেছেন ও প্রতিষ্ঠা করেছেন সত্যধর্মী সংস্কারমুক্ত মানবধর্ম।

নাটকে মহাপঞ্চক জীর্ণ, সামাজিক আচার নিষ্ঠায় অন্ধ ও স্থিত, মুক্তির সকল দুয়ার বন্ধ করে চেতনার বৈকল্যে তিনি আবদ্ধ। বিপরীতে পঞ্চক মুক্তিপিয়াসী মুক্ত মানবাত্মার প্রতীক।

নাটকের শুরুতে পঞ্চকে কণ্ঠে গীত হয়:

তুমি ডাক দিয়েছ কোন সকালে

কেউ তা জানে না,

আমার মন যে কাঁদে আপন মনে,

কেউ তা মানে না।

... ... ...

আকাশ করি ব্যাকুলতা,

বাতাস বহে কার বারতা,

এ পথে সেই গোপন কথা

কেউ তো আনে না।

পঞ্চক মন্ত্রের দাসত্বে আবদ্ধ নয়। মন্ত্র তন্ত্র ও গাথার দাসত্ব তার জীবনসত্যকে বাঁধতে অসমর্থ।

সংস্কার এর বন্ধনে সে অনভ্যস্থ। অচলায়তনে গুরুর আগমনকে সে আবাহন করে মুক্ত মনের স্বাভাবিক আনন্দেই। অন্ন যখন মুখের কাছে আসে তখন স্থির থেকে সেটাকে গ্রহণ করতে হয়। একভাবে প্রস্তুত হলে হয়তো অন্য দিকে ভুলগুলো ধরা পড়ে, দর্শনের এ স্বাভাবিক ধর্মেই তিনি বিশ্বাসী।

অচলায়তের মানুষগুলো মহাপঞ্চকের নির্দেশে 'ওঁ তট তট তোতয় তোতয়' দিয়ে শুরু করে চক্রেশ, মরীটি, মহামরীচি, পর্ণশর্বরী, ধ্বজাগ্রকেয়ূরী মন্ত্র উচ্চারণের মধ্য দিয়েই তাদের দিনাতিপাত, কালযাপন ও বয়ঃবৃদ্ধি। আর অচলায়তনের বদ্ধ দরজা খুলে পঞ্চক বাইরে আসে। মন্ত্র তন্ত্রের ছকবাঁধা নিয়ম ভেংগে সন্ধান করে:

দূরে কোথায় দূরে দূরে

মন বেড়ায় গো ঘুরে ঘুরে

যে বাঁশিতে বাতাস কাঁদে

সেই বাঁশিটির সুরে সুরে।

... ... ...

যে পথ বেয়ে কাঙাল পরাণ

যেতে চায় কোন অচিন পুরে।

আশ্রমিক সুভদ্র উত্তর দিকের অচলায়তনের জানালা খুলে মহাপাতক হয় মহাপঞ্চক ও আশ্রমিকদের কাছে। ওদের ধারণা এ জন্যে মহাসর্বনাশ হবে। আচার্য ও উপাধ্যক্ষ দীর্ঘকাল আশ্রমের মন্ত্র-তন্ত্রের বশ্যতা মেনে সত্যধর্মের সিদ্ধান্তদানে বিভ্রান্ত ও সংশয়গ্রস্ত। সুভদ্রের একমাত্র অবলম্বন হয় পঞ্চক। তিনশো পঁয়তালি্লশ বছরের মরা জলাশয়ে যে ঢেউ তোলাতে পারে সেতো অসামান্য। পঞ্চককে দেখে আচার্য তার সংশয়গ্রস্ত মন নিয়ে মুক্তিকে খোঁজে। পঞ্চকের মধ্যেই তিনি পান মুক্তির সন্ধান। মন্ত্রের চেয়ে মানুষের মন সত্য; হাজার বছরের প্রাচীন সংস্কারের অপেক্ষা তিনি বোঝেন মনশক্তির প্রচ-তার যথার্থতা।

পঞ্চক নীচ জাতের শোনপাংশুদের সাথে মেশে। ওদের চাষের খবর নেয়। ওদের ফসল ফলানোর খবর নেয়। অচলায়তনের আশ্রমিকেরা ওদের খাদ্যশষ্য খায়। কিন্তু চাষবাসকে ঘৃণা করে। ওরা লোহা গলিয়ে সভ্যতা সৃষ্টি করে। ঘুমে অচেতন লোহাকে আঘাতে আঘাতে জাগিয়ে তোলে।

দাদাঠাকুর সোনপাংশুদের আপনার জন। সে-সূত্রে পঞ্চকও তার আপনার হয়। দাদাঠাকুরের মধ্যে থাকে জ্ঞান, কর্ম ও ভক্তির সমন্বয়। অচলায়তনের বন্ধ দরজা খোলার জন্যে পঞ্চক তার সাথে মেলাতে চান আচার্যকে। বন্ধ কারার প্রাচীর ভাংগার জন্যে তার মন হয় উতলা। পঞ্চক তাকিয়ে থাকে বর্ষণের অপেক্ষায়। দাদাঠাকুর বলেন_ যেখানে আকাশ থেকে বৃষ্টি পড়ে না, সেখানে খাল কেটে জল আনতে হয়।

পঞ্চক দর্ভকদের সাথে মেশে। সেখানেও থাকেন দাদাঠাকুর। ওরা মন্ত্র জানে না। তবে গানে গানেই তাদের প্রার্থনা। ওরা সকলে মিলে গায়,

ও অকূলের কূল, ও অগতির গতি,

ও অনাথের নাথ, ও পতিতের পতি।

ও নয়নের আলো, ও রসনার মধু

ও রতনের হার, ও পরানের বঁধু।

ওরা শুদ্র বলেই মন্ত্রবিহীন। হয়তো একারণেই ওদের মুক্তি।

দাদাঠাকুর জ্ঞানী ও আনন্দময় স্বরূপে মূর্ত। সেই আনন্দের সাথে মিলনের আহ্বান থাকে দাদাঠাকুরের কণ্ঠে:

এ ঘনঘোর বর্ষার কালো মেঘে আনন্দ তীক্ষ্ন বিদ্যুতে আনন্দ, বর্জের গর্জনে আনন্দ। আজ মাথার উষ্ণীষ যদি উড়ে যায় তো উড়ে যাক, গায়ের উত্তরীয় যদি ভিজে যায় তো ভিজে যাক।

মহাপঞ্চকও অটল তার নিয়ম নিষ্ঠার। ধর্মে বিধান থাকায় বালক কুশলশীল অষ্টাঙ্গশুদ্ধি উপবাসে 'জল জল' করে পিপাসার জল না পেয়ে প্রাণত্যাগ করে। উত্তর জানালা খোলার অপরাধে সুভদ্রর শাস্তি ছয় মাস মহাতামস সাধনা। অচলায়তন দুর্গের তন্ত্রমন্ত্র নির্ভর নিয়ম সর্বস্বতা ও আচারবিধি কালো অন্ধপুরীকে করে পঙ্কিলে নিমজ্জিত ও অন্ধজনযুক্ত। অবশেষে সংশয় ও দ্বিধার অবসানে পঞ্চকের মুক্তি যখন একান্ত কাম্য তখনই গুরু এসে অচলায়তনের অন্ধকার দূর্গ চূর্ণ বিচূর্ণ করলেন।

যোদ্ধাবেশে গুরুরূপী দাদাঠাকুরের আগমনে অচলায়তনের গ্রাচীর ভেঙ্গে উন্মুক্ত দরজা জানালা দিয়ে আলো এলো, মহাপঞ্চক তার ইন্দ্রিয়ের সকল দরজা জানালা বন্ধ করেই বসে রইলেন। মহাপঞ্চক জানতেন না বন্ধ করা অন্ধকার ঘরের চাকাটা স্থির। নবীন আলোতে চাকাটা ঘুরলো। তিনি ক্ষুধাতৃষ্ণা লোভভয় ও জীবনমৃত্যু রহস্যের আবরণমুক্ত করার দায়িত্ব নিলেন। শোনপ্রাংশুরা এলো তাদের কর্মনিয়ে, ভক্তি নিয়ে এলো দর্ভকরা। মহাপঞ্চক তার জ্ঞান নিয়ে ওদের সাথে মিশলেন।

মুক্ত আলোতে দাদাঠাকুর, নতুন আচার্য, পুরানো আচার্য, পুরানো আশ্রমিকরা নতুনভাবে দাঁড়ালো। নতুন এ গুরুর রাজত্বে সকলেই মাতে নতুন আনন্দযজ্ঞে। জ্ঞান কর্ম ও ভক্তির মুক্তবাণীতে প্রকাশিত হয় কবিকল্পনা (ভিন্ন রচনা থেকে নেয়া)।

আমার মুক্তি আলোয় আলোয় এই আকাশে,

আমার মুক্তি ধুলায় ধুলায় ঘাসে ঘাসে

দেহমনের সুদূর পারে হারিয়ে ফেলি আপনারে,

গানের সুরে আমার মুক্তি ঊর্দ্ধেভাসে

আমার মুক্তি সর্বজনের মনের মাঝে,

দুঃখ বিপদ-তুচ্ছ করা কঠিন কাজে।

বিশ্বধাতার যজ্ঞশালা আত্মহোমের বহ্নি জ্বালা

জীবন যেন দিই আহুতি মুক্তি আশে (চলবে)।

Additional Info

  • Image: Image