২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ৩ কার্তিক ১৪২৪ বঙ্গাব্দ বুধবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৭ইংরেজী
বৃহস্পতিবার, 06 মার্চ 2014 19:37

রবীন্দ্র মনন ও সাহিত্যে বৌদ্ধ চেতনা (২)

লিখেছেনঃ বিজন গোলদার

রবীন্দ্র মনন ও সাহিত্যে বৌদ্ধ চেতনা (২)
বিজন গোলদার
(পূর্ব প্রকাশের পর)

দুই.

তখনকার বিদ্যমান সমাজ ও ধর্মে আত্মা নিত্য কুটস্থ, অবিচল ও অপরিবর্তনীয় এবং বস্তুবাদী দর্শনে শরীর বিনাশের সাথে সাথে আত্মার বিনাশ_ এই দুই পরস্পরবিরোধী দর্শনের মধ্যম মার্গকে বেছে নেন বুদ্ধ। তিনি দেখেন চিত্ত বিজ্ঞান ও আত্মা একই বস্তু। তার মতে পঞ্চইন্দ্রিয় তাদের নিজস্ব অনুভূতি শক্তি ও জ্ঞানকে একটি জায়গায় পৌঁছে দেয়, তার নিয়ন্ত্রণে ও অনুশাসনেই গ্রহণ, চিন্তন ও নির্ণয় স্থির হয় এবং সে নিয়ন্ত্রক সত্তাই মন। জীবনপ্রবাহ সৃষ্টি হয়, তৃষ্ণা থেকে স্বার্থপরতা থেকে। মনরূপী আত্মা এই জীবন প্রবাহের মধ্য দিয়ে বিবর্তিত হয়। স্বার্থপরতার মোহ ছেড়ে যখন তৃষ্ণা অনন্তে পৌঁছে, তখন তার কোন বন্ধন থাকে না, দুঃখমুক্তি ঘটে। ব্যক্তি তখন স্বার্থমুক্তিতে পৌঁছে লোক হিতার্থে মঙ্গল চেতনায় এক হয়। অর্থাৎ পূর্বযামের প্রদীপটি মদ্যমযামে ও পশ্চিমযামে প্রবহনের যে যোগ, সে যোগেই অস্তিত্ব প্রবাহ, সন্তান সন্ততির প্রবাহ, মন বিকাশ ও পূর্বাপর ভিন্নরূপে আত্মার বিবর্তন।

প্রাচীন অবদান সাহিত্যের সমস্তটা জুড়েই বৌদ্ধ দর্শন ও তার দর্শনভিত্তিক সাহিত্য। রবীন্দ্রনাথ মানবকল্যাণী বুদ্ধকেন্দ্রিক প্রাচীন সাহিত্যের বেশ কিছু আখ্যানকে বেছে নিয়ে তার বিশাল সম্ভারের সাথে যখন যুক্ত হন তখন তা দেশকালের গ-ি পেরিয়ে বিশ্বের অন্তরলোকে পৌঁছায়। এ ক্ষেত্রে আখ্যানের বুদ্ধ দর্শনের আত্মা, মোক্ষপ্রাপ্তি বা দর্শননির্ভর বুদ্ধকে না দেখে মানব প্রেমিক বুদ্ধকে নিয়েই তার সাহিত্য।

আত্মার বিবর্তন ও মোক্ষপ্রাপ্তির উপর অবদান সাহিত্যের 'কল্পদ্রুমাবদান' গ্রহের অষ্টম বর্গে বর্ণিত সুপ্রিয়া আখ্যান। মূল কাহিনীতে আছে সুপ্রিয়া নামে অনাথপি-দের এক কন্যা জন্মগ্রহণ করে। যে জন্মের পর থেকে গাথা উচ্চারণ করত। সে ছিল জাতিস্মরা। পূর্ব জন্মের কথা বলতে পারত। পূর্বজন্মে ভগবান কাশ্যপ তাকে ধর্মশিক্ষা দেন। তিনি দশ হাজার বছর ধরে ভিক্ষুদের ভৈক্ষ্য দান করেন। তার প্রার্থনায় অরণ্য দেবতা তার ভিক্ষা পাত্রকে সুধায় পূর্ণ করেন এবং তা দিয়ে তিনি বুদ্ধ ও তার অনুগামীদের আতিথ্য সৎকার করেন।

সুপ্রিয়ার মোক্ষপ্রাপ্তিই মূল কাহিনীতে মহাযানী বৌদ্ধ সমপ্রদায়ের ধর্মীয়বোধ চূড়ান্তভাবে লক্ষ্যণীয়। জন্মজন্মান্তর, সুকৃত শুভাশুভ কর্মফল ভোগ ও নিজগুণে মহত্ত্ব অর্জনে নির্বাণপ্রাপ্তি ও শ্রেণী ভেদহীন মনুষ্যত্বের জয়গান রয়েছে বুদ্ধের বাণী ও আখ্যানে।

রবীন্দ্রনাথ 'নগরলক্ষ্মী' কবিতায় মূল আখ্যানের জন্মজন্মান্তরের তাত্তি্বক দিকটা পরিত্যাগ করেছেন। তিনি বুদ্ধ ও সুপ্রিয়াকে কেন্দ্রে রেখে বুদ্ধ অনুগামীদের মহিমার দিকটাই প্রোজ্জ্বল করে তুলেছেন। মূল কাহিনীর সাথে কবিতার যোগ সামান্যই। শুরুর আবহটা একেবারেই ভিন্নভাবে। সমস্ত শ্রাবস্তী নগরীতে তখন দুর্ভিক্ষের হাহাকার। নির্বাণপিয়াসী বুদ্ধ মানবকল্যাণমুখি চেতনায় বিচঞ্চল এবং ভক্তশিষ্যদের নির্দেশ দিলেন আর্তসেবায় উৎসর্গ করতে। বুদ্ধের আহ্বানে বিত্তবান ব্যবসায়ী রত্নাকর শেঠ জানায় তার অক্ষমতা। সামন্ত জয়সেন ও ধর্মপাল বুদ্ধের আহ্বানে মুখ ফিরিয়ে নেয়। অসাম্যের সমাজ ও রাষ্ট্রে বিত্তবান ব্যবসায়ী ও সামন্তরা সর্বদাই জনগণের স্বার্থবিরোধী ও স্বার্থান্ধ এবং কল্যাণব্রতে এরা নিষ্ক্রিয়, ইতিহাসের এ শিক্ষা প্রকাশে কবি নির্মোহ। হতাশার এই চরম মুহূর্তে বুদ্ধের ব্যথিত হৃদয়ের ছবি প্রকাশ পায়ঃ

বুদ্ধের করুণ আঁখি দুটি

সন্ধ্যাতারাসম রহে ফুটি।

বুদ্ধের করুণ আহ্বানে সম্পদশালীরা যখন সম্পদরক্ষী হয়ে আর্তসেবায় থাকে পরান্মুখ, তখন প্রচ- আত্মিক চেতনায় সমৃদ্ধ, ভক্তির প্রাধণ্যে, দুঃসাহসিক স্পর্ধায়, স্বার্থান্ধ মানবকর্তব্যবিমুখ মানুষদের ধিক্কার দিয়ে সকল কতর্ব্যের দায়ভার গ্রহণ করেন বিদ্রোহিনী সুপ্রিয়া। দুর্ভিক্ষপীড়িতদের মুক্তিতে সুপ্রিয়ার দুঃসাহস অদম্য, বিস্ময়কর ও নাটকীয়।

ভিক্ষুনীর অধম সুপ্রিয়া

তব আজ্ঞা লইল বহিয়া।

কাঁদে যারা খাদ্যহারা আমার সন্তান তারা,

নগরীরে অন্ন বিলাবার

আমি আজি লইলাম ভার।

আর্তের সেবায় তাদের যাতনা ও কষ্টকে এক করে দেখার সে অনুভূতি, সম অংশীদারিত্বের যে চেতনা ও বিত্তের মাঝে অবিত্তের যে প্রতিজ্ঞা সেটাই এই কবিতার মুখ্য প্রাণ।

ভিক্ষুকন্যার আকুতি থাকে সর্বজনের কাছে। মুষ্টিমেয়ের দাক্ষিণ্যে করুণা থাকে। থাকে স্বার্থপরতা। দেয়ার বিনিময়ে নেয়া। সমষ্টির প্রতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি তার চাওয়ার মাঝে। আত্মশক্তির প্রাবল্যেই ঘটে সমষ্টি চেতনার প্রতিষ্ঠা।

কহিল সে নমি সবা কাছে,

শুধু এই ভিক্ষাপ্রাত্র আছে।

... ... ...

আমার ভা-ার আছে ভরে

তোমা-সবাকার ঘরে ঘরে।

তোমরা চাহিলে সবে এ প্রাত্র অক্ষয় হবে।

ভিক্ষা-অন্নে বাঁচাব বসুধা_

মিটাইব দুর্ভিক্ষের ক্ষুধা।

তিন

অবদান শতকের মূল আখ্যানে আছে_ অনাথপি-দ ছিলেন বুদ্ধের অন্যতম প্রিয় শিষ্য। তিনি সম্ভবত বুদ্ধের গৃহী শিষ্যদের অনতম। এ কারণেই গৃহপতি অথাপি-দ নামেই তার পরিচিতি। একদিন তিনি মহাপুণ্যের আশায় শ্রাবস্তীবাসীর শ্রেষ্ঠদান গ্রহণ করে তথাগতের চরণে নিবেদনের কথা ঘণ্টাধ্বনি ঘোষণা করে জানালেন। তিনি ভিক্ষায় বেরোলেন। কেউ-দিল কণ্ঠহার, অঙ্গুলিমুদ্রা, মুক্তাহার, হিরন্য ও সুবর্ণমুদ্রা। তিনি সকল দান গ্রহণ করলেন। দাতৃগণের মধ্যে এক রমণী তিন মাস কৃচ্ছ্রসাধন করে একটি কাপড় ক্রয় করে। তার পরিধানের সে একমাত্র কাপড়টি গাছের আড়ালে নিজেকে ঢেকে অনাথপি-দকে ছুড়ে দেয়। অথাপি-দ বুঝলেন এই দরিদ্র রমণী তার সর্বস্বই ভিক্ষা দিয়েছেন বুদ্ধের চরণে। অনাথপি-দ তাকে নানা বস্ত্রে ও আভরণে আবৃত করলেন। স্বল্পায়ু সে রমণী কালগতা হয়ে দেবকূলে জন্ম নেয় ও তথাগত বুদ্ধ তাকে শ্রেষ্ঠ ভিক্ষার মহিমায় চারটি আর্যসত্য দান করেন।

রবীন্দ্রনাথের কবিতা 'শ্রেষ্ঠভিক্ষা' মূল কাহিনী থেকে পরিবর্তিত, তাৎপর্যপূর্ণ, মহিমান্বিত ও স্বতন্ত্র। অনাথপি-দ গৃহবন্ধনমুক্ত নিষ্কাম প্রেমের ভিক্ষু। শ্রেষ্ঠদানই তিনি গ্রহণ করবেন, হয়তো এর পিছনে থাকে আগত বুদ্ধের শ্রাবস্তীপুর বাসীর ত্যাগের পরীক্ষা নেয়া। 'প্রভু বুদ্ধ লাগি আমি ভিক্ষামাগি' প্রদোষ্ঠের অরুণ তখনো তরুণ। তার সলাজ আলো পূরবাসীর চোখচুম্বন করে কখনো বলেনি চোখ খোলো।' সুপ্তিময় ইবতালিকরা তখনো নিদ্রায়, ধরেনি কোন মাঙ্গলিক গান, দ্বিধাসংকোচে কোকিলের কণ্ঠ উচ্চকিত। পূরজনবাসী তখনো ঘুমের আবেশে।

সর্বত্যাগী সন্ন্যাসীর কণ্ঠে শোনা যায় প্রভু বুদ্ধ লাগি আমি ভিক্ষা মাগি, সব ধর্মমাঝে ত্যাগধর্ম সার ভুবনে, পূরবাসী জেগে ওঠে। সন্ন্যাসীর আহ্বানে ওরা ধনের অসারত্ব বুঝে সাড়া দেয়। বুদ্ধের আহ্বান ভিক্ষুর কণ্ঠে_ জাগো ভিক্ষা দাও' জনশূন্য রাজপথে একাকী চলেছে সন্ন্যাসী। কোন বালিকা করে অকারণ অশ্রু বিসর্জন। বিগত যামিনীর ললিতসুখ কোনো বিলাসীর কাছে ছিন্নমালাভ্রষ্ট কুসুমের মতো পতিত মনে হয়। সন্ন্যাসী একা, শূন্য রাজপথে ভিক্ষাপাত্র হাতে। ধনী বণিকেরা দিল মুঠিমুঠি সোনা, রত্ন মাণিক্য, কেহ কণ্ঠহার, ধনীর দান থালাভর্তি সোনার ভূষণ। এসবই প্রত্যাখ্যান করে সন্ন্যাসী। শুধু বলে, 'ভিক্ষা আমার প্রভুরে দেহো গো'। স্বর্ণ মানিক্যের বৈভব নিয়ে নিজেকে ধনী করার উদ্দেশ্যে তো তার নয়। তিনি তো হৃদয়ের ঐশ্বর্যে ঐশ্বর্যশালী। পূরবাসীর কাছে তার ঐকান্তিক আবেদন:

ওগো পৌরজন, করো অবধান,

ভিক্ষুশ্রেষ্ঠ তিনি বুদ্ধ ভগবান,

দেহো তাঁরে নিজ সর্বশ্রেষ্ঠ দান

যতনে।

এ পরীক্ষা আত্মিক ঔৎকর্ষের, চিত্ত বিকাশের। চিত্ত শুদ্ধতা প্রমাণের জন্যই হয়তো সন্ন্যাসীর ছদ্মবেশে বুদ্ধের ভিক্ষাগ্রহণ। তাই শ্রেষ্ঠদান বিত্তে পরিমাপযোগ্য নহে।

ওরা দান করে, দানের পরিমাপ করে, বিত্তের ঐশ্বর্যকে দেখায়, জাগ্রত অহংকে গর্ভভরে প্রকাশ করতে চায়। জীবনের অর্জিত সর্বস্ব ত্যাগের বিসর্জনে মুক্ত আত্মার অহং। অবশেষে সন্ন্যাসী কোন যোগ্য দান না পাওয়ায় অতৃপ্ত মনে নগরী ত্যাগ করে যোগ্যতম দানের আশায় প্রবেশ করেন নগর প্রান্তে কাননে। সেখানেই জোটে তার পরম অর্ঘ্য।

দীন নারী এক ভূতলশয়ন

না ছিল তার অশনভূষণ,

সে আসি নমিল সাধুুর চরণ

কমলে।

অরণ্য আড়ালে রহি কোনোমতে

একমাত্র বাস নিল গাত্র হতে,

বাহুটি বাড়ায়ে ফেলি দিল পথে

ভূতলে।

ভিক্ষু উর্দ্ধভূজে করে জয়নাদ_

কহে, ধন্যমাতঃ করি আশীর্বাদ,

মহাভিক্ষুকের পুবাইলে সাধু

পলকে।

অশন ভূষণ বিহীন রমণী, যার একমাত্র সম্বল একটি কাপড়, সেটাও সে ত্যাগ করছে প্রভুর চরণে। চিত্তের উৎকর্ষ, প্রাণের ঔজ্জ্বল্যে অহং এর অস্তিত্ব বিলোপে সে রমণী তখন সকলকে ছাড়িয়ে ত্যাগের মহিমায় প্রতিষ্ঠিত হয়। এখানেই কবিতার নাটকীয় চমৎকারিত্ব এবং মূল কাহিনী থেকে বিচ্যুতি ঘটিয়ে কবি সত্য, প্রেম ও অহং ত্যগের জয়গান করেছেন। এখানেই তার চৈতন্যের প্রকাশ, চিত্তবিকাশ ও আত্মার মুক্তি।

(চলবে)

Additional Info

  • Image: Image