২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ১০ বৈশাখ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ রবিবার, ২৩ এপ্রিল ২০১৭ইংরেজী
বৃহস্পতিবার, 06 মার্চ 2014 02:48

রবীন্দ্র মনন ও সাহিত্যে বৌদ্ধ চেতনা

লিখেছেনঃ বিজন গোলদার

রবীন্দ্র মনন ও সাহিত্যে বৌদ্ধ চেতনা

'একদিন বুদ্ধ গয়াতে গিয়েছিলাম মন্দির দর্শনে। সেদিন এই কথা আমার মনে জেগেছিল_ যাঁর চরণ স্পর্শে বসুন্ধরা একদিন পবিত্র হয়েছিল, তিনি যেদিন সশরীরে এই গয়াতে গমন করেছিলেন, সেদিন কেন আমি জন্মাইনি, সমস্ত শরীর মন দিয়ে প্রত্যক্ষ তাঁর পুণ্যপ্রভাব অনুভব করিনি?' রবীন্দ্রনাথের এ কথাগুলো গৌতম বুদ্ধকে স্মরণ করে, যাঁকে তিনি বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ মানবের স্বীকৃতি দিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ যে বুদ্ধকে অর্ঘ্য দিয়েছিলেন; মানবতার পূর্ণ মহিমায় বিকশিত সে মহামানব, যিনি ক্ষুদ্র একটি পার্থিব রাজ্য বিসর্জন দিয়ে মৈত্রী, প্রেম ও করুণার আদর্শে বিশ্বমানবের হৃদয় সাম্রাজ্য অধিকার করেছিলেন চিরকালের জন্য, তাঁর প্রতি ছিল কবির অন্তরের সমর্পণ।

বাঙালি আর্যেতর রক্তসদ্ভূত জাতি ও আদি শিব শক্তির উপাসক ও আগম নির্গমের পথেই তাঁর অস্তিত্বের ইতিহাস। খৃস্টপূর্ব তিন চার অব্দে অর্থাৎ মৌর্য সম্রাটদের আমলে উত্তর ভারত থেকে বাংলার মাটিতে আসে বৌদ্ধ ধর্মের অভিঘাত এবং খিস্টীয় চার-পাঁচ অব্দে অর্থাৎ গুপ্ত সম্রাটদের আমলে আসে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রভাব। এই দুয়ে মিলে বাংলার সমাজে সাত আটশো বছরে যে চেহারা থাকে, তার কেন্দ্রস্থানে থেকে যায় সেই পুরনো তান্ত্রিকতা ও লোকায়ত চেতনার ধর্ম। তবে গুপ্তযুগের অন্তর্বর্তী সময়টা বাদ দিলে অশোক থেকে হর্ষবর্ধন পর্যন্ত হাজার বছরের অধিককাল বৌদ্ধধর্ম রাজধর্ম হিসেবেই বহাল ছিল এবং এ ধর্মের বিপ্লবী চেতনা ভোঁতা করার জন্য রাজণ্যবর্গ, ব্রাহ্মণ ও শ্রেষ্ঠীরা দলে দলে ঢোকেন সংঘরামে। অতঃপর নবম শতাব্দীতে শংকরাচার্যের নেতৃত্বে হিন্দু পুনর্ভ্যুদয়ে বৌদ্ধধর্মের ভিত্তিমূল খসে পড়ায় বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত অব্রাহ্মণ হিন্দুরা পুনরায় হিন্দুধর্মে ফিরে গিয়ে পূর্বাবস্থা অপেক্ষা নিম্নস্তর বর্ণে অচ্ছুৎ হিসেবে বিবেচিত হয়।

কিন্তু উনিশ শতকে বাংলায় যে বৌদ্ধমতের পুনরুজ্জীবন হয় তা সিদ্ধযোগী ও অবধূতদের মতো গুহায়িত বৌদ্ধধর্ম নয়। রাজেন্দ্রলাল মিত্র, অক্ষয় কুমার দত্ত, রামদাস সেন, অঘোরনাথ গুপ্ত, রমেশচন্দ্র দত্ত, সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর অনেকেই বুদ্ধকে গ্রহণ ও বিশ্লেষণ করে নৈষ্ঠিক শাস্ত্র ও টিকা-টিপ্পনী অনুসরণ করে। আবার হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, যিনি চর্যাপদের আবিষ্কারক এবং কাহ্নপাদ, ভুসুকুপাদ, হাড়িপা, সিদ্ধাই, মচ্ছেন্দ্রনাথ ও গোখনাথাদির আদি স্বরূপের ব্যাখ্যা করেন। অর্থাৎ দেড় হাজার বছরের অধিককালব্যাপী ভারত ও ভারতের বাইরে বুদ্ধকে ঘিরে মহাযান, হীনযান, বহুযান ও সহজানের যে নানামুখি বিকাশ ঘটে তা নিয়ে প-িতজনের মাঝে চলে অন্তহীন চর্চা, আলোচনা ও গবেষণা। আবার সাধারণ বাঙালিরা বুদ্ধদেবকে গ্রহণ করে অবতাররূপে। বাঙালা সাহিত্যে বুদ্ধের উপর অবতার আরোপের জন্য গিরিশ ঘোষ লেখেন, 'বুদ্ধদেব চরিত' এবং নবীন চন্দ্র সেনের 'অমিতাভ'। রমেশচন্দ্র দত্ত, বিবেকানন্দ ও বঙ্কিমচন্দ্রের কণ্ঠে থাকে এর ধারাবাহিক সমর্থন। সাধু অঘোরনাথ ও মহেশচন্দ্র ঘোষ বৌদ্ধ ধর্মের ওপর আরোপ করেন ব্রাহ্মণত্ব এবং উভয় ধর্মের মধ্যে পার্থক্যহীনতা প্রমাণ করার প্রয়াস থাকে গবেষণাতে। ইতিহাসের দৃষ্টিতে বৌদ্ধধর্ম প্রতিষ্ঠিত হয় হিন্দু ধর্মের উৎস থেকে। ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের বিরুদ্ধতাই এই ধর্মের জাগরণের একটি প্রধান কারণ।

buddha 0014

ব্রাহ্মণ্যধর্মের একক আধিপত্যে জটিল ক্রিয়াকা-বহুল যাগযজ্ঞে সাধারণ মানুষ ছিল শাস্ত্রবিধি, প্রথা ও আর্যদের নিকট সমর্পিত এবং যুক্তি বুদ্ধিহীন ও সত্য বিস্মৃত। ধর্ম যখন এত বেশি আড়ম্বরপ্রিয় ও অনুষ্ঠাননির্ভর হয় তখন সাধারণের পক্ষে তা হয়ে পড়ে অপালনযোগ্য। এছাড়া অবতার গ্রহণ ও বর্জনে থাকে বিশ্বাসগত সামপ্রদায়িকতা। এক্ষেত্রে অবতারের মূল মন্ত্রই থাকে উপেক্ষিত। এমনি ধর্মীয় সমাজে জন্ম নিয়ে সিদ্ধার্থ মানুষের মুক্তি কামনায় ব্রাহ্মণ্যধর্মের বিদ্রোহী হন। যাগযজ্ঞ ও বাহ্য আড়ম্বরের বিরোধিতা করেন এবং প্রচলিত আচার অনুষ্ঠান বর্জন করেন। ধর্ম সাধনার আনুষ্ঠানিক বাহ্যিকতা তার কাছে হলো অগ্রহণীয়। ধর্মসাধানায় মানব কল্যাণমুখি পথের অভিযাত্রী হয়ে তিনি মানুষকে আহ্বান জানালেন। ইহলোক ও পরলৌকিক সুখ কামনায় যাগযজ্ঞ ও পশুবলিকে তিনি বর্জন করলেন। ইন্দ্রিয় সংযম, চরিত্র গঠন, মৈত্রী ও করুণার মাধ্যমে মোক্ষপ্রাপ্তির বা নির্বাণ লাভের বাণী শোনালেন জগতকে।

বহুকাল পর (শ্রাবণ ১২৯২) রবীন্দ্রনাথ একটি প্রবন্ধে বলেন_ ঈশ্বরকে আমরা হৃদয়ের সংকীর্ণতাবশত সীমাবদ্ধ করিয়া ভাবিতে পারি, কিন্তু পৌত্তলিকতায় তাঁহাকে বিশেষ একরূপ সীমার মধ্যে বদ্ধ করিয়া ভাবিতেই হইবে। অন্য কোন গতি নাই।... কল্পনা উদ্রেক করিবার উদ্দেশ্যে যদি মূর্তি গড়া যায় ও সেই মূর্তির মধ্যেই যদি মনকে বদ্ধ করিয়া রাখি তবে কিছুদিন পরে সে মূর্তি আর কল্পনা উদ্রেক করিতে পারে না। ক্রমে মূর্তিটাই সর্বেসর্বা হইয়া উঠে। এভাবেই ব্রাহ্মসমাজের মধ্য থেকে তার প্রথম জীবনের ধর্মবোধের জন্ম। ক্রমে ক্রমে ব্রাহ্মসমাজের গ-ি থেকে বিশ্বধর্মের আঙিনায় হেঁটে বুদ্ধের ধর্ম আদর্শের এক মৌলিক বিন্দুতে এসে রবীন্দ্রনাথ একসময় মিশে যান। অন্ধ আচারনির্ভর ভেদবাদের সংকীর্ণতা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ধর্ম ও ধর্মতন্ত্রের পার্থক্য নির্ণয়ে স্পষ্ট উচ্চারণে বলেন, ধর্মবলে, যে মানুষ যথার্থ মানুষ সে যে ঘরেই জন্মাক পূজনীয়। ধর্মতন্ত্র বলে যে মানুষ ব্রাহ্মণ সে যতবড় অভাজনই হোক, মাথায় পা তুলিবার যোগ্য। অর্থাৎ মুক্তির মন্ত্র পড়ে ধর্ম, আর দাসত্বের মন্ত্র পড়ে ধর্মতন্ত্র।

বুদ্ধদেব এই ধর্মতন্ত্রের বিরুদ্ধে ছিলেন প্রতিবাদী ও সে সময়কার ব্রাহ্মণ্যবাদপুষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম বিদ্রোহী। তিনি সত্যে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে তিনটি শর্তের উল্লেখ করেন:

পরিশুদ্ধ ও মুক্তির জন্য কর্মে মানুষের স্বতন্ত্রতা রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।

কর্মের স্বাধীনতার জন্য বুদ্ধির স্বাধীনতা প্রয়োজন।

বুদ্ধির স্বাধীনতার জন্য কোনো গ্রন্থের অধীনতাপাশে আবদ্ধ থাকা অপ্রয়োজনীয়।

বুদ্ধের এই তিনটি অঙ্গীকারাত্মক শর্ত ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রতিষ্ঠানিক ভিতে আঘাত করে বিশ্বাসের জায়গাটা ভেংগে দেয়। তাঁর ধর্ম হয় মানবমুখি ও কল্যাণব্রতী। তার কল্যাণবোধ করুণা আশ্রিত হয়ে ভেদাভেদ ভেংগে মানুষ মানুষকে খোঁজে, সীমানার গ-ি ভেংগে হিংসা, বিভেদ বিসর্জনের মধ্য দিয়ে মুক্ত আত্মার বিশ্বকে দেখে।

রবীন্দ্রনাথ বুদ্ধদেবের মধ্যে কখনো অবতারের অস্তিত্ব খোঁজেননি। তিনি তাঁর মধ্যে দেখেন_ মানবমহিমার শ্রেষ্ঠতম প্রকাশ। বুদ্ধদেবের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে তিনি বলেন:

তারই শরণ নেব যিনি আপনার মধ্যে মানুষকে প্রকাশ করেছেন। যিনি সেই মুক্তির কথা বলেছেন, যে মুক্তি নঞর্থক নয়, সদর্থক, যে মুক্তি কর্মত্যাগে নয়, সাধুকর্মের মধ্যে আত্মত্যাগে, যে মুক্তি রাগ-দ্বেষ বর্জনে নয়, সর্বজীবনের প্রতি অপরিমেয় মৈত্রী সাধনায়। আজ স্বার্থক্ষুধান্ধ বৈশ্যবৃত্তির নির্মম নিঃসীম লুব্ধতার দিনে সেই বুদ্ধের শরণ কামনা করি।

জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও 'জন্মদিনে' (১৯৪১ সালে) কাব্যের ষষ্ঠ সংখ্যক কবিতায় কবি বলেন:

এ ধরায় জন্ম নিয়ে যে মহামানব

সব মানবের জন্ম সার্থক করেছে একদিন।

 

তাঁহারে স্মরণ করি জানিলাম মনে_

প্রবেশি মানবলোকে আশিবর্ষ আগে

এই মহাপুরুষের পুণ্যভোগী হয়েছি আমিও।

বুদ্ধের ত্যাগ ও প্রেমের বাণী উপনিষদের অমোঘ মন্ত্র 'তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জীথা এক হয়ে আশ্রয় নেয় রবীন্দ্রনাথে। বর্তমানে লোভের অশুভ প্রবৃত্তিতে মানুষের সকল শ্রেয়োবোধ প্রেয়তে আচ্ছন্ন, জাতিতে জাতিতে বাধে স্বার্থের সংঘাত, মানুষের ন্যায়বোধ ও শুভবুদ্ধি ক্রমশ অপসৃয়মাণ। রবীন্দ্রনাথ তখন মুক্তির আশায় সর্বত্যাগী মুক্তির অগ্রদূত রাজপুত্র সিদ্ধার্থকে খোঁজেন। রাজসুখ ত্যাগী কোন সন্ন্যাসীর খোঁজে রবীন্দ্রনাথ অনাগ্রহী, দীনতম মানুষের দুঃখ মোচনকারী মানুষের মঙ্গল কামনায় সর্বত্যাগী বুদ্ধই তার প্রণম্য।

রবীন্দ্রনাথের সমগ্র জীবন ও কর্ম পরিচালিত হয়েছে উপনিষদের এক মহান বাণীকে ঘিরে 'মা গৃধ: কস্যস্বিদ্বনম্।' কারো ধনে লোভ করো না। কেন লোভ করবে না। যেহেতু সমস্ত কিছু এক সত্যের দ্বারা পরিব্যাপ্ত। ব্যক্তিগত লোভে সেই একের উপলব্ধির মধ্যে বাধা আনে। তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জীথা সেই একের থেকে যা আসছে তাকেই ভোগ করো। সমস্ত মানবসত্য ও মানবকল্যাণ ক্ষেত্রে এই একের সত্যই বড়। সেই একের যোগে উৎপন্ন যা কিছু তাকেই সকলে মিলে ভোগ করো।

জগত সংসারের মানুষের দুঃখে রাজপুত্র সিদ্ধার্থ হলেন ব্যথিত। দুঃখ বিনাশের সন্ধানে তিনি তিনটি পথের সন্ধান পেলেন। জ্ঞান (সম্যক দৃষ্টি, সম্যক সংকল্প) সীল (সম্যক বাক্য, সম্যক কর্ম, সম্যক জীবিকা) ও সমাধি (সম্যক প্রযত্ন, সম্যক স্মৃতি, সম্যক সমাধি) মাধ্যমে দুঃখ মোচনের পথ দেখান। প্রেম, করুণা, মৈত্রী দর্শনে তিনি বিশ্বমানবকে বাঁধেন এক মঙ্গললোকে। তখন মানুষের মধ্যে বসবাসরত আমি পরিবার, গ্রাম, দেশ ভূম-লস্থ প্রাণী ও জগতের স্বার্থে নিজের স্বার্থ হয়ে ওঠে ও সে তখন তার পরিধি অতিক্রম করে অনন্তে পৌঁছায়। নিজ স্বার্থসীমা ডিঙিয়ে সে তখন মুক্তির সীমানাকে স্পর্শ করে। বুদ্ধের এ চেতনা মনজগতের আত্মমুক্তি এবং আত্মমুক্তিকে বিশ্বমননে সংযুক্ত করে। প্রায়োগিকভাবে ভিক্ষুসংঘে ব্যক্তি সম্পত্তি উচ্ছেদ করে ভোগবস্তুতে সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠা ছিল তাঁর নির্দেশনা।

রবীন্দ্রনাথ সংসারত্যাগী সন্ন্যাসী বা মানবকল্যাণে ব্রতী হয়ে মহামানবরূপী বুদ্ধ হওয়ার মনবাসনা কখনো ভিতরে ভিতরে জাগ্রত করেননি। তিনি জগতের সৎ-অসৎ, সুন্দর-অসুন্দর, লোভ-ত্যাগের মধ্যেও ছিলেন নিরাশক্ত আনন্দ প্রত্যাশী। মঙ্গলময় চেতনা তার সারা জীবনের পথের ধ্রুবতারা। অসতো মা সদগময় / তমসো মা জ্যোর্তিগময়ঃ অসত্য থেকে সত্য নিয়ে যাও, অন্ধকার থেকে আলোকে নিয়ে যাও_ এ পথেই তিনি মিলতে চেয়েছেন মঙ্গললোকে ও বিশ্বলোকে। এ বিশ্বলোকের পথহারা পথে হাঁটতে হাঁটতেই তার বহুপথের একটা মিলে যায় বুদ্ধের দেখানো পথে। 

Additional Info

  • Image: Image