২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ২ পৌষ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ শনিবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৭ইংরেজী
Partly Cloudy

17°C

Chittagong

Partly Cloudy

Humidity: 94%

Wind: 17.70 km/h

  • 17 Dec 2017

    Partly Cloudy 26°C 15°C

  • 18 Dec 2017

    Sunny 26°C 15°C

  • সেই খানেরই গলদ, যেখানে সততা নেই। টাকা পয়সার দিকে নজর দিলে কাজের নেশা নষ্ঠ হয়ে যায়। টাকা পয়সা বড় কথা নয়, কাজ চাই।

    মহাসংঘনায়ক শ্রীসদ্ধর্মভাণক বিশুদ্ধানন্দ

  • আমাদের সমাজে যে এখনো কোন বড় কোন প্রতিভার জন্ম সম্ভব হচ্ছে না, তার কারণ পরশ্রীকাতরতা। আমরা গুণের কদর করি খুব কম। কিন্তু মন্দটাকে সগর্বে প্রচার করে বেড়াতে পারি।

    মহাসংঘনায়ক শ্রীসদ্ধর্মভাণক বিশুদ্ধানন্দ মহাথের

  • যুদ্ধ সভ্যতাকে ধ্বংস করে এবং শান্তি বিশ্বকে সুন্দর করে । যুদ্ধ মানুষকে অমানুষ করিয়ে দেয়, যুদ্ধ ছিনিয়ে নেয় প্রেম-ভালবাসা এবং যুদ্ধের আগুনে আত্নহুতি দিতে হয় বহু প্রাণের । যুদ্ধকে মনে প্রাণে ঘৃণা করা উচিৎ।

    মহাসংঘনায়ক শ্রীসদ্ধর্মভাণক বিশুদ্ধানন্দ মহাথের

  • আপনি যেমন মহৎ চিন্তা করেন কাজেও সেইরুপ হউন, আপনার কথাকে কাজের সাথে এবং কাজকে কথার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তুলুন।
    মহাসংঘনায়ক শ্রীসদ্ধর্মভাণক বিশুদ্ধানন্দ

কাজী নজরুল ইসলাম : সমকালের, উত্তরকালের

রবিবার, ২৫ মে ২০১৪ ২০:৫৫ ড. করুণাময় গোস্বামী

কাজী নজরুল ইসলাম : সমকালের, উত্তরকালের

কাজী নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের জাতীয় কবি। কবির জন্মদিনে তাঁর পুণ্যস্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করি। নজরুলের কর্মময় জীবন ছিল সংক্ষিপ্ত। সেই সংক্ষিপ্ত সময়ে তিনি বিস্ময়করভাবে বিপুল ও বৈচিত্র্যপূর্ণ কর্মপ্রয়াসকে সাফল্যমণ্ডিত করে তুলেছিলেন। সৃজনশীলতা, চিন্তাশীলতা ও কর্মোদ্যোগের এমন বিপুল সফল রূপায়ণ, এত সংক্ষিপ্ত সময়ে এত জনপ্রিয়তার সঙ্গে, শুধু ভারতবর্ষের ইতিহাসে নয়, মানুষের ইতিহাসেরই এক বিরল ঘটনা। সেই বিরল ঘটনার রূপকার আমাদের জাতীয় কবির স্মৃতির প্রতি পুনরায় গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করি।

নজরুলের প্রধান পরিচয় তিনি বিদ্রোহী কবি। এখন থেকে প্রায় ৯০ বছর আগে লেখা বিদ্রোহী কবিতা তাঁকে বিদ্রোহী কবি-খ্যাতি এনে দেয়। হাজার বছর অতিক্রম করেছে বাংলা সাহিত্যের বিবর্তনের কাল, তাতে একজনই মাত্র আমাদের বিদ্রোহী কবি, তিনি কাজী নজরুল ইসলাম। ১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে, মুজফফর আহমদ যেমন জানাচ্ছেন, নজরুল গভীর রাত থেকে সকাল পর্যন্ত সময় নিয়ে এই কবিতাটি রচনা করেন। সাপ্তাহিক বিজলীতে প্রকাশিত হওয়ামাত্র এই কবিতা পাঠক-আগ্রহের এক বিস্ময়কর ঝড় তোলে এবং এতটাই বিস্ময়কর যে শুধু একটি মাত্র কবিতা ২২ বছর বয়সের কবিকে জনপ্রিয়তার এমন উচ্চতায় পৌঁছে দেয় যে সেও সাহিত্যের ইতিহাসের এক অভাবনীয় ঘটনা।

সারা ভারতবর্ষের ইতিহাসের অন্তরে বিদ্রোহের এক প্রবল আকুতি ধীরে ধীরে উত্তপ্ত হয়ে উঠছিল। ইংরেজ শাসনের ও শোষণের নিষ্ঠুরতা দিন দিন সহনীয়তার সীমা অতিক্রম করে যাচ্ছিল। ক্ষুদিরামের ফাঁসি, জেনারেল ডায়ারের নির্দেশে জালিয়ানওয়ালাবাগে গণহত্যা ইতিহাসের অন্তরকে শোকে-ক্রোধে অস্থির করে তুলছিল। আবহাওয়ায় যেন আগুন লেগে গিয়েছিল। সেই আগুন কবির কণ্ঠে ভাষা পাচ্ছিল না। অথচ মানুষ চাইছিল, এমন একজন কবি আসুন, যিনি আগুনের যুগের আগুনের আবেগকে আগুনের ভাষায় প্রকাশ করবেন। পল্টনফেরত তরুণ নজরুল সেই অগ্নিযুগের প্রাণস্পন্দনকে নিজের প্রাণে ধারণ করে আসামান্য এক কবিতার আকারে প্রকাশ করলেন। বিদ্রোহের আগুনকে কেন নজরুল এমন করে ধারণ করতে পারলেন? কেনই বা তিনি এমন আশ্চর্য ভাষায় তা প্রকাশ করতে পারলেন? পারলেন এ জন্য যে বিদ্রোহের আগুন তাঁর নিজের প্রাণেও জ্বলছিল এবং এমন দারুণ এক প্রকাশ শক্তি নিয়ে তিনি জন্মেছিলেন যে প্রায় এক বসায় রচনা করা একটি গীতিকবিতার মর্মে এক মহাকাব্যিক দ্যোতনা সঞ্চার করতে সমর্থ হয়েছিলেন।

বিদ্রোহী কবিতার শুরুতেই নজরুল এক প্রচণ্ড আহ্বান ধ্বনিত করেন, বল বীর/বল উন্নত মম শির। কবি ডাক দিয়ে বললেন, কখনো নিজেকে দুর্বল ভেবো না, নিজেকে বীর বলে ভাবো। তোমার প্রতিপক্ষ ইংরেজ প্রবল নিশ্চয়ই, তার সাম্রাজ্যে সূর্য অস্ত যায় না, তাতে কী হয়েছে, একবার বীরত্বের তেজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াও, তুমি অসাধ্য সাধন করতে পারবে। শির নেহারি আমারি নতশির ওই শিখর হিমাদ্রির। হিমালয় পর্যন্ত মাথা নিচু করে অভিবাদন করবে মানুষকে। সে মানুষ বীর, যে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে জানে। হিমালয়ের মাথা নিচু করার কথাটি আলংকারিক, ভাবার্থ হচ্ছে বীরের সামনে কোনো বাধাই বাধা নয়। আপাত অর্থে মনে হয় এবং এই আপাত অর্থও সত্যি যে নজরুল তাঁর সামনেকার বাংলার মানুষকে, ভারতবর্ষের মানুষকে বীরের মতো প্রতিবাদ-প্রতিরোধ করার জন্য ডাক দিচ্ছেন, তবে গভীরতর অর্থে এ হচ্ছে তাঁর আত্ম-আহ্বান। তিনি নিজের ভেতরের নিজেকে জাগিয়ে তুলছেন, নিজের ভেতরকার বিদ্রোহীকে স্বরূপে আবির্ভূত হতে বলছেন। বিদ্রোহীর আত্মবোধনের কবিতা এটি। মহৎ শিল্পের যে গুণ, বিশেষকে নির্বিশেষ করে তোলা, এখানেও বিশেষ নজরুল নির্বিশেষ হয়ে দেশের সব মানুষের অন্তরে সঞ্চিত বিদ্রোহাস্ফুলিঙ্গে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছেন। তবে সে আগুনে নিজেকেই পোড়াচ্ছেন অতি তীব্রভাবে। সে জন্যই বিদ্রোহী কবিতা একদিকে যেমন সেই অগ্নিগর্ভ কালের আত্মকথন, অন্যদিকে প্রবলতরভাবে বিদ্রোহী নজরুলের মর্মবিবরণ। এমনি আশ্চর্য একটি বিন্দুতে এসে ব্যক্তি ও সমাজ, সমাজ ও ব্যক্তি একান্ত হয়ে মিশে যায়। তবে সৃজনশীল ক্ষেত্রে যেমন হয়ে থাকে, ব্যক্তির শক্তি যদি এমন হয় যে তিনি সমকালীন সমাজকে অতিক্রম করে সমকালের বাইরে গিয়ে দাঁড়াতে জানেন, তাহলে তিনি দাঁড়িয়ে যান চিরকালের পটে। নজরুল তেমন শক্তি নিয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন এবং কবিতাটি যখন লিখেছিলেন, তখনই তিনি এমন বলতে পেরেছিলেন যে তিনি চিরকালের পটে দাঁড়াচ্ছেন চিরবিদ্রোহী হিসেবে। বিদ্রোহী যে আমির কবিতা সে বোঝা গেল প্রথম স্তবকের দ্বিতীয় চরণেই, বল উন্নত মম শির। এর পরে শুধুই আমি আর আমি।

একজন জাপানি গবেষক চমৎকার একটি কাজ করেছেন বিদ্রোহী কবিতায় আমির ব্যবহার নিয়ে। তাঁর ধারণা যে ইংরেজ জাতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ভারতবর্ষে আমিত্বের শক্তিটি খর্ব হয়ে আসছিল। নজরুল সেই ম্রিয়মাণ অহংবোধকে চাঙ্গা করে তোলার জন্য বারবার আমির ব্যবহার করেছেন। সে জন্যই বিদ্রোহী কবিতায় শতাধিকবার আমির ব্যবহার। সেই আমি সামূহিক ও ব্যক্তিক। নজরুল সামূহিক অহংবোধকে জাগ্রত করতে চাইছেন, নিজের অহংবোধকেও তীব্র থেকে তীব্র করে তুলছেন। অহংবোধকে তীব্র করে তোলার ভেতর দিয়ে এই মহিমান্বিত বোধে তিনি পৌঁছলেন যে তিনি ক্ষণবিদ্রোহী নন, চিরবিদ্রোহী, তাঁর বিদ্রোহ শেষ হওয়ার মতো নয়। অধ্যক্ষ ইব্রাহীম খাঁকে লেখা সেই বিখ্যাত পত্রের এক জায়গায় নজরুল বলছেন, 'বিদ্রোহীর জয়-তিলক আমার ললাটে অক্ষয় হয়ে গেল তরুণ বন্ধুদের ভালোবাসায়। একে অনেকেই কলঙ্ক-তিলক বলে ভুল করেছে, কিন্তু আমি করিনি। বেদনা-সুন্দরের গান গেয়েছি বলেই কি আমি সত্য-সুন্দরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছি? আমি বিদ্রোহ করেছি, বিদ্রোহের গান গেয়েছি অন্যায়ের বিরুদ্ধে, অত্যাচারের বিরুদ্ধে, যা মিথ্যা কলুষিত, পুরাতন-পচা সেই মিথ্যা সনাতনের বিরুদ্ধে, ধর্মের নামে ভণ্ডামি ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে। হয়তো আমি সব কথা মোলায়েম করে বলতে পারিনি, তলোয়ার লুকিয়ে তার রূপার খাপের ঝকমকানিটাকেই দেখাইনি- এই তো আমার অপরাধ। এরই জন্য তো আমি বিদ্রোহী। আমি এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছি, সমাজের সকল কিছু কুসংস্কারের বিধিনিষেধের বেড়া অকুতোভয়ে ডিঙিয়ে গেছি, এর দরকার ছিল মনে করেই।' শুধু তরুণ বন্ধু নয়, প্রবীণ রবীন্দ্রনাথ যে নজরুলকে অপার স্নেহে অভিসিক্ত করলেন তারবার্তা পাঠিয়ে, সে-ও এই চিরবিদ্রোহীকে ভালোবেসেই। ১৯২৩ সাল। নজরুল তখন হুগলি জেলে অনশনরত। রবীন্দ্রনাথ তখন কলকাতার বাইরে শিলংয়ে। সেখানে থেকে তিনি নজরুলকে টেলিগ্রাম পাঠালেন, তিনি যেন অনশন ত্যাগ করেন, এ বাংলা সাহিত্যের দাবি। তিনি লিখেছিলেন, গিভ আপ হাঙ্গার স্ট্রাইক। আওয়ার লিটরেচার ক্লেইমস ইউ। এ বড় কম ভালোবাসা নয়। নোবেলজয়ী বিশ্ববিখ্যাত ষাটোর্ধ্ব কবি সাহিত্যে মাত্র প্রবেশ করা তরুণকে, এ আমাদের সাহিত্যের দাবি, তুমি আত্মহননের পথে যেও না বলে অনুরোধ জানিয়ে তারবার্তা পাঠালেন। প্রাপককে পাওয়া যায়নি, এই অজুহাতে টেলিগ্রামটি নজরুলকে পৌঁছে দেওয়া হয়নি। রবীন্দ্রনাথের কাছে সেটি ফিরে আসে। পুত্র রথীন্দ্রনাথকে এক পত্রে রবীন্দ্রনাথ বলেন, 'আমি নজরুলকে প্রেসিডেন্সি জেলের ঠিকানায় টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিলাম। জেল থেকে সেটি ফেরত এসেছে, বলা হচ্ছে প্রাপককে পাওয়া যায়নি। বোঝা যাচ্ছে, আমার বার্তা ওরা তাকে পৌঁছাতে চায় না। নজরুল প্রেসিডেন্সি জেলে না থাকলে ওরা তো জানে সে এখন কোথায় আছে। অর্থাৎ এরা তাকে আত্মহননের পথ থেকে ফেরাতে চায় না।' রবীন্দ্রনাথ যে নজরুলের জীবন রক্ষার জন্য কতটা উদ্বিগ্ন, রথীন্দ্রনাথকে লেখা এ চিঠি থেকে তা আরো স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। জেলে অনশন শুরু করার আগেই আলিপুর কারাগারে অবরুদ্ধ নজরুলকে রবীন্দ্রনাথ তাঁর গীতিনাট্য বসন্ত উৎসর্গ করেন। জাতির জীবনে নজরুল বসন্ত এনেছেন বলে রবীন্দ্রনাথের ধারণা, সে জন্য তরুণ কবিকে অভিনন্দিত করতে তিনি গীতিনাট্য বসন্ত উৎসর্গ করেন। এ বসন্ত কোকিলের পাখায় ভর করে দক্ষিণের মৃদুমন্দ বাতাসে ভেসে আসা পুষ্পগন্ধে আমোদিত বসন্ত নয়। এ বসন্ত বিদ্রোহের, এ বসন্ত ইংরেজ শাসনকে না বলার, এ বসন্ত না বলার জন্য নিগ্রহ স্বীকার করার, এ বসন্ত দেশের মানুষকে মাথা উঁচু করে বীরের মতো দাঁড়ানোর আহ্বান জানানোর ঋতু। নজরুল বসন্তের অনুষঙ্গটিই পাল্টে দিলেন। এরও আগে নজরুল অর্ধসাপ্তাহিক ধূমকেতু পত্রিকা বের করবেন স্থির করলেন, আশীর্বাণী চাইলেন রবীন্দ্রনাথের কাছে। কালবিলম্ব না করে রবীন্দ্রনাথ আশীর্বাণী পাঠালেন অসামান্য এক কাব্যকণিকায়- আর চলে আয়রে ধূমকেতু/আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু/দুর্দিনের এই দুর্গশিরে/উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন/অলক্ষণের তিলক রেখা/রাতের ভালো হোক না লেখা/জাগিয়ে দে রে চমক মেরে/আছে যারা অর্ধচেতন। দেশকে জাগিয়ে তোলার কাজে লেগে যাওয়ার জন্য আহ্বান জানানো হচ্ছে শুধু পত্রিকাকে নয়, স্বয়ং নজরুলকেও, কেননা তিনিই ধূমকেতু। তিনি নিজেই জানিয়েছেন এর আগে প্রকাশিত তাঁর এক দুর্দান্ত কবিতায় : আমি যুগ যুগে আসি, আসিয়াছি পুনঃমহাবিপ্লবহেতু/এক স্রষ্টার শনি মহাকাল ধূমকেতু। বিদ্রোহীকে অভিনন্দন, ধূমকেতুকে অভিনন্দন, নববসন্তকে অভিনন্দন, চিরবিদ্রোহীকে অভিনন্দন। অভিনন্দন নবীনের পক্ষ থেকে, অভিনন্দন প্রবীণের পক্ষ থেকে।

এতটা যে অভিনন্দন তরুণ নজরুলের প্রতি, সে শুধু ইংরেজের বিরুদ্ধে না বলার জন্য নয়, তাঁর চিরবিদ্রোহের ভাবের জন্য। ইংরেজ বিতাড়ন ছিল একটা জ্বলন্ত সমসাময়িক প্রসঙ্গ। নজরুলের মতো তীব্র রাজনীতিমনস্ক কবিকে সেদিকে মনোযোগ দিতেই হতো। কোনো বড় কবিই সমকালকে উপেক্ষা করতে পারেন না। নজরুলের অনেক কবিতা পড়লে আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, তিনি সমকালকে বড় বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন, সমকালের মধ্যেই রয়েছেন। যেমন 'আমার কৈফিয়ত' কবিতায় বলছেন : পরোয়া করি না, বাঁচি বা না বাঁচি যুগের হুজুগ কেটে গেলে। পরোয়া কবি করবেন কেন, পরোয়া করবেন মহাকাল। কে হুজুগেই মিলিয়ে যাবেন, কে হুজুগ কাটিয়ে চিরযুগের লোকে উত্তীর্ণ হবেন, সে পরীক্ষা নিচ্ছেন তিনি। অত্যন্ত নির্মোহ চিত্তে তিনি চিরবিদ্রোহী নজরুলকে ইতিহাসের চিরযুগে উত্তীর্ণ করে দিলেন। নজরুল জীবনের সামগ্রিক উদ্ভাসন চাইছেন। এই উদ্ভাসনের শেষ নেই, নজরুলের বিদ্রোহের শেষ নেই। নজরুলের অবস্থানের গৌরবেরও শেষ নেই। উজ্জ্বলতাকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস মহাকালের মূল্যায়নে বহন করে চলছে।

স্বাদেশিকতার উন্মেষ ঘটে বাংলা সাহিত্যে ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় ভাগে। সাহিত্যের মঞ্চ থেকে দেশাত্মবোধ রাজনীতির মঞ্চে স্থান করে নেয়। মঞ্চ থেকে মিছিল, মিছিল থেকে সংগ্রাম। সংগ্রামের মত ও পথ অনেক; কিন্তু সব ভাবনার পথ গিয়ে মেলে ইংরেজ বিতাড়নের আকাঙ্ক্ষায়। রাজনৈতিক স্বাধীনতা চাই। রাজনৈতিক স্বাধীনতা চাওয়াই সবটা চাওয়া কি না, এ নিয়েও কথা হয়। কথা হয় সমাজের বিকাশ নিয়ে। স্বাধীনতাকে সমর্থন করবে সমাজ। সেই সমাজ যদি যথার্থপথে বিকশিত না হয়, তাহলে স্বাধীনতাকে ফলপ্রসূ করবে কে? এ নিয়ে স্বাদেশিকতার মঞ্চ থেকে চিন্তাভাবনা চলে। এই চিন্তার উত্তরাধিকার সুসংহত রূপ লাভ করে কাজী নজরুল ইসলামের ভাবনায়, রচনায় ও কর্মে। উপনিবেশবাদ নিজেই যথেষ্ট অন্ধকার তৈরি করে, আবার সে বিদায় হওয়ার সময়ও সে অন্ধকার সঙ্গে করে নিয়ে যায় না, গাঢ়তর করে পেছনে রেখে যায়। সেই অন্ধকার থেকে কী করে বেরিয়ে আসা যায় এবং একটি উজ্জ্বল সমাজ নির্মাণ করা যায়, সে ভাবনার একটি চমৎকার রূপরেখা দেখি আমরা নজরুলের কর্মে। তিনি সমাজের সামগ্রিক মুক্তি কামনা করলেন। তিনি এমন একটি সমাজের ছবি দাঁড় করালেন, যেখানে কোনো ধরনের কোনো অন্ধকার থাকবে না। কিন্তু অন্ধকারকে ধরে রাখার জন্য কিছু সমর্থন ব্যবস্থাও উপনিবেশবাদ পেছনে রেখে যায়, সমাজতন্ত্রের উত্তরাধিকার থেকেও কিছু অন্ধকার আসে। চিরবিদ্রোহী কবি সমাজকে পেছনে নেওয়ার যাবতীয় কায়েমি ভাবনাকে ধরে টান দিলেন। সমাজ প্রগতির ধারণাগুলো দানা বাঁধছিল বাংলা ভাষায় রচিত নানা কাজে বিচ্ছিন্ন ও অসংহতভাবে। নজরুলের রচনায় ও কর্মোদ্যোগে প্রগতির ধারণাগুলো সংহত হয়ে দেখা দিল। নজরুল রাজনৈতিক স্বাধীনতা চাইলেন এবং ধূমকেতু পত্রিকায় তিনিই প্রথম ভারতবর্ষের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি উত্থাপন করলেন। তবে কথা যা থেকে যায় সে হচ্ছে, স্বাধীনতার প্রাপ্তিকে যদি সমাজের প্রগতি দিয়ে সমর্থন করা না যায়, তাহলে তো তা সামূহিক জীবনে অর্থবহ হয়ে ওঠে না। তিনি নিজেই কবিতায় বললেন, ক্ষুধাতুর শিশু চায় না স্বরাজ, চায় দুটি ভাত। স্বাধীনতা প্রাপ্তির আনন্দের সঙ্গে নিরন্নের অন্নের সংস্থানের বিষয়টিও যুক্ত হবে। সে একেবারে সহজ সত্য কথা। শুধু অন্ন জোগানো নয়, আরো কিছু সহজ সত্য আছে এর মধ্যে। নজরুল সব সহজ সত্যকে তাঁর নিজের জীবনস্বপ্ন বাস্তবায়নের মধ্য নিয়ে আসতে চাইলেন। অজস্র লেখার ভেতর দিয়ে নিজের স্বপ্নকে দেশের স্বপ্নে পরিণত করে তুলতে চাইলেন। সে স্বপ্ন মুক্তির। সমাজ কতগুলো অন্ধকারের ডোরে বাঁধা, সেগুলো ছিন্নভিন্ন করে নজরুল একে মুক্তির আলোয় নিয়ে আসতে বললেন। সমাজ একটি শোষণহীন অর্থ ব্যবস্থার ওপর দাঁড়াবে, ধর্মের নামে কোনো ভণ্ডামি চলবে না, সাম্প্রদায়িক প্রীতি হবে সহাবস্থানের মূল ব্যাপার, সমাজ ব্যবস্থাপনায় নারীদের অধিকার ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে, সর্বজনীন মঙ্গলবোধ হবে স্বাধীন সমাজের চালিকাশক্তি। নজরুল তাঁর জীবনের সর্বশেষ ভাষণে তাঁর অগ্রসর ভাবনাবলিকে অভিহিত করলেন 'অভেদ সুন্দর সাম্য' হিসেবে। কবি তিনি, তাঁর ধ্যানের বস্তু সুন্দর, সেই সুন্দরের প্রতিষ্ঠা দেখতে চান তিনি ব্যক্তির জীবনে, সামূহিক জীবনে, রাষ্ট্রের ব্যবস্থাপনা ভাবনায়। অসুন্দরকে সংহার করতেই হবে, এ ছিল তাঁর জীবনমরণ পণ। অসুন্দরকে সংহার করে সুন্দরকে প্রতিষ্ঠা করাই নজরুলের বিবেচনায় একটি আকাঙ্ক্ষিত সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রধান ব্যাপার। সেই সৌন্দর্য প্রতিষ্ঠার ভেতর দিয়ে সমাজ অভেদ হবে ও সাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে। তাতেই সমাজ এসে দাঁড়াবে মুক্তির পাদপ্রদীপে।

বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সঙ্গে মুক্তি ও স্বাধীনতা দুটি ধারণাই গভীরভাবে যুক্ত। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে যে ঐতিহাসিক ভাষণ দিলেন, তাতে তিনি এবারের সংগ্রামকে মুক্তির সংগ্রাম ও স্বাধীনতার সংগ্রাম বলে উল্লেখ করলেন। আমরা সেই স্বাধীনতাযুদ্ধকে মুক্তিযুদ্ধ বলি। স্বাধীনতাসংগ্রামীদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সশ্রদ্ধচিত্তে অভিহিত করি। তাহলে ঐতিহাসিক বিবেচনায় রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও সামাজিক মুক্তি- দুটি ধারণাকেই স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে প্রতিষ্ঠার সংকল্পের সঙ্গে যুক্ত দেখি। দীর্ঘকাল ঔপনিবেশিক শাসনের অন্ধকারে থাকা তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশের পক্ষে স্বাধীনতা অর্জনের সঙ্গে সামাজিক মুক্তি অর্জনের স্বপ্নকে যুক্ত করে নেওয়া একটি অসামান্য তাৎপর্যময় বিষয়। আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের পর্ব সমাপ্ত হয়েছে। এখন চলছে মুক্তির ধারণাকে বাস্তবায়িত করার প্রয়াস। মুক্তি একটি সামাজিক-দার্শনিক বিষয়; এর লক্ষ্যগুলো অর্জনের প্রচেষ্টাকে আমরা চিরপ্রচেষ্টা বলি। কারণ মুক্তি ব্যাপারটা এমন বহুমাত্রিক, মনুষ্যত্বের এমন ব্যাপক জাগরণ এর সঙ্গে যুক্ত, মূল্যবোধের এমন বিশ্বজনীন গৌরব এর সঙ্গে সম্পৃক্ত যে মুক্তি অর্জনের কোনো শেষ নেই। এক মাত্রা পেরোই তো নতুন মাত্রা যুক্ত হয়। ফুল ফোটার শেষ আছে, জীবন প্রস্ফুটনের শেষ নেই। বাংলাদেশে আজ অনিঃশেষ জীবন প্রস্ফুটনের কাজ চলছে। এর সঙ্গে জাতির পিতার, অগণিত মুক্তিযোদ্ধার অঙ্গীকারের সম্পর্ক আছে। জীবন প্রস্ফুটনের এই চিরপ্রয়াসে আমাদের প্রেরণা হিসেবে রয়েছেন চিরবিদ্রোহী বীর কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি ১৯৫২ সালের ভাষা সংগ্রাম থেকে শুরু করে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত স্বাধিকার অর্জনের সংগ্রামের সব স্তরে আমাদের সঙ্গে ছিলেন প্রেরণাদাতা হিসেবে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তিনি ছিলেন আমাদের দুর্বার প্রেরণার উৎস, এখন থেকে আগামী বহু দশকজুড়ে আমাদের জীবন বিকাশের প্রয়াসে, আমাদের বহুমাত্রিক মুক্তি অর্জনের অভিযানে অংশ নিতে তিনি গভীর প্রেরণা হিসেবে আমাদের মনে কাজ করবেন। নজরুল চিরনিদ্রিত আছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদ প্রাঙ্গণে। তিনি চিরজাগ্রত আছেন তাঁর রচনায়, চিরজাগ্রত আছেন তাঁর প্রগতির আহ্বানে। তাঁর সেই সুগম্ভীর আহ্বান আমাদের উদ্বোধিত করুক। আমরাও যেন তাঁর মতো করে বলতে পারি, জয় নব অভিযান, জয় নব উত্থান।

লেখক : শিক্ষাবিদ

কৃতজ্ঞতাঃ দৈনিক কালেরকন্ঠ

Nirvana Peace Foundation

নির্বাণা কার্যক্রম
Image
নির্বাণা পিস ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে শিশু কিশোরদের চিত্রাংকন প্রতিযোগিতা সম্পন্ন নির্বাণা পিস ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে শিশু কিশোরদের চিত্রাংকন প্রতিযোগিতা সম্পন্নশিশু কিশোরদের… ( বিস্তারিত )
Image
নির্বাণা পিস ফাউন্ডেশনের ব্যতিক্রমী আয়োজন নির্বাণা পিস ফাউন্ডেশনের ব্যতিক্রমী আয়োজন শিশু কিশোরদের মধ্যে ধর্মীয় চেতনা… ( বিস্তারিত )
Image
পূর্ব আধারমানিক মানিক বিহারে বৌদ্ধ ধর্মীয় কল্যান ট্রাষ্টের আর্থিক অনুদানের চেক প্রদান পূর্ব আধারমানিক মানিক বিহারে বৌদ্ধ ধর্মীয় কল্যান ট্রাষ্টের আর্থিক অনুদানের… ( বিস্তারিত )
আরও
সংবাদ সমীক্ষা
Image
সাহিত্যিক সাংবাদিক বিমলেন্দু বড়ুয়ার দশম মৃত্যুবার্ষিকী ২২ জানুয়ারি সাহিত্যিক সাংবাদিক বিমলেন্দু বড়ুয়ার দশম মৃত্যুবার্ষিকী ২২… ( বিস্তারিত )
আরও