২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ১২ আষাঢ় ১৪২৪ বঙ্গাব্দ সোমবার, ২৬ জুন ২০১৭ইংরেজী
সোমবার, 02 মে 2016 15:58

এ বছর চর্যাপদ প্রকাশের শতবর্ষ ।। চর্যাপদ : ফিরে তাকানো

লিখেছেনঃ সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ

এ বছর চর্যাপদ প্রকাশের শতবর্ষ ।। চর্যাপদ : ফিরে তাকানো

বাংলাদেশে আধুনিক জ্ঞানচর্চার শুরু হয়েছিল ঔপনিবেশিক শাসনের অভিঘাতে। পলাশীর যুদ্ধের তিন দশকের মধ্যে কলকাতায় রয়েল এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গল (১৭৮৪)-কে ঘিরে জ্ঞানচর্চার যে বৃত্ত গড়ে উঠেছিল, তার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ইউরোপীয়দের এশিয়াকে জানার চেষ্টা। বাঙালি বিদ্বজ্জন তাতে মুগ্ধ হয়ে যোগ দিয়েছিল। ইংরেজি সাহিত্যের আদলে বাংলা সাহিত্যচর্চা ফোর্ট উইলিয়াম গদ্যের সূচনা করেছিল। পদ্যেও পালাবদলের ধ্বনি শোনা গিয়েছিল, যার পরিণতি মাইকের মধুসূদন দত্তের কবিতা। পালাগান ও গীতিকার স্থান দখল করে নিয়েছিল নাটক, যার প্রকৃষ্ট প্রকাশ রামনারায়ণ তর্করত্নের মধ্যে। অন্যদিকে খ্রিষ্ট-মিশনারি ও ইংরেজ সিভিলিয়ানরা এ দেশের লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতির নানা উপকরণ জড়ো করে গড়ে তোলেন এক নতুন জ্ঞানজগৎ।

এর মাঝে এলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। স্বদেশবাসীকে মনে করিয়ে দিলেন, আমরা আধুনিক হয়েও বাঙালি থাকতে পারি; স্যুট অথবা কাঁটাচামচই আধুনিকতার একমাত্র চিহ্ন নয়। সিপাহি বিপ্লবে বাঙালি এলিটরা ‘পলায়ন’ কৌশল নিলেও তার অভিঘাত বৃহত্তর বাঙালি সমাজে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। নইলে মাইকেলের মেঘনাদবদ কাব্য বা দীনবন্ধু মিত্রের নীলদর্পণ অমন পাঠকপ্রিয় হতো না। পরে বিহারীলাল দত্ত বাঙালির প্রিয় গীতিকবিতাকে উপস্থাপন করলেন আধুনিক রূপে।

জ্ঞান ও সাহিত্যচর্চার এই ধারা উনিশ শতকের আশির দশকে যুক্ত হলো জাতীয়তাবাদী ভাবধারার নব উন্মেষের সঙ্গে। এরই পরিণতি—বাঙালি বিদ্বৎসমাজের ঐতিহ্যসন্ধানী দুটি সমান্তরাল ধারায় চলেছিল এর চর্চা। একদিকে লোকসাহিত্য ও শিল্পের উপকরণ সংগ্রহ ও প্রকাশ আবহমান বাঙালির সাহিত্যজগৎকে আধুনিক পাঠকের সামনে তুলে ধরে। বাংলায় মুদ্রণশিল্পের বিকাশ ও সাময়িকপত্র-সাহিত্যপত্রের প্রকাশ এ ক্ষেত্রে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করে। এরই সমান্তরাল ধারায় চলে পুঁথির সংগ্রহ ও প্রকাশ।

পুঁথি বাঙালির শত শত বছরের সাহিত্যসঙ্গী। একটি পাণ্ডুলিপি থেকে হাতের লেখা নকল করে তৈরি হতো বহু পাণ্ডুলিপি—এগুলোই পুঁথি। সেই অর্থে উনিশ শতকের আগের সব সাহিত্যই পুঁথিতে লিপিবদ্ধ। চমৎকার হাতের লেখা, নানা রঙের অলংকরণে মলাট বা পাটাতে চিত্রাঙ্কৃত কাঠ বা মোটা ঢাল—সব মিলিয়ে পুঁথিগুলো ছিল বর্ণাঢ্য। বাঙালির ঘরে ঘরে বসত পুঁথিপাঠের আসর—গৃহস্থের সংসার থেকে কৃষক-মজুরের চালাঘর পর্যন্ত তা ছড়িয়ে পড়েছিল। বাঙালির সাহিত্যরসের এ ভোগে উচ্চবর্গ বা নিম্নবর্গের ভেদ ছিল না।
শুধু পাঠ নয়, পুঁথি ফেরিও হতো অন্যান্য দৈনন্দিন উপকরণের সঙ্গে। পুঁথি নকল করে বিক্রিরও চল ছিল। উনিশ শতকের শেষ সিকিতে এই পটভূমিতে আবির্ভাব ঘটে একদল পুঁথি-সংগ্রাহকের—রাজেন্দ্রলাল মিত্র, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, দীনেশচন্দ্র সেন, বসন্তরঞ্জন রায়, নগেন্দ্রনাথ বসু এবং আরও পরে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ। রাজা রাজেন্দ্রলাল মিত্র ছিলেন এশিয়াটিক সোসাইটির পুঁথিসংগ্রহ কার্যক্রমের অধ্যক্ষ। তাঁর মৃত্যুর (১৮৯১) পর হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এই পদ অলংকৃত করেন।

ইতিমধ্যে বাঙালির জ্ঞানচর্চার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয় অন্য প্রান্ত থেকে। আলেকজান্ডার চোমা দ্য কোরোম বি এইচ হজসনসহ একদল ইউরোপীয় নেপাল ও তিব্বতে এক বিরাট পুঁথিভান্ডার খুঁজে পায়, যা স্পষ্টতই পূর্ব ভারতীয় ঐতিহ্যের ধারক। কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটির পত্রিকাসহ কয়েকটি গবেষণাপত্রে এর বিবরণ মুদ্রিত হলে পণ্ডিতমহলে স্বভাবতই ঔৎসুক্যের বিস্তার ঘটে। এই পটভূমিতেই হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বৌদ্ধ ধর্মঠাকুরের ব্যাপারে আরও অনুসন্ধানের জন্য নেপাল ভ্রমণের চিন্তা করেন।
বাংলা পুঁথির বিশাল ভান্ডারের সঙ্গে হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর প্রথম সম্যক পরিচয় ঘটে, যখন তিনি ১৮৮৬ সালে বেঙ্গল লাইব্রেরির গ্রন্থাগারিক নিযুক্ত হন। ব্রাহ্মণ পরিবারে তখন বাংলা পুঁথি বিশেষত বৈষ্ণব পুঁথি রাখা প্রায় নিষিদ্ধ। নতুন পুঁথির ভান্ডার বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে শাস্ত্রীর এবং শাস্ত্রীর প্রবন্ধের মাধ্যমে কলকাতার পণ্ডিতবর্গের ধারণা বদলে যায়। তবে কম্বুলটোলার লাইব্রেরিতে পঠিত (১৮৯১) শাস্ত্রীর ওই রচনা ছিল মূলত মুদ্রিত পুঁথির ভিত্তিতে, যাতে ১৫০ জন কবির বিবরণ ছিল।
শ্রোতৃমণ্ডলীর আগ্রহ শাস্ত্রীর মধ্যেও নতুন উৎসাহের সঞ্চার করে। তাঁর ভাষায়:
এই সকল সমালোচনায় উৎসাহিত হইয়া আমি ভাবিলাম, যদি ছাপা পুঁথির উপর প্রবন্ধেই এত নূতন খবর পাওয়া গেল, হাতের লেখা পুঁথি খুঁজিতে পারিলে না জানি কত কি নূতন খবর দিতে পাইব। সুতরাং বাঙ্গালা পুঁথি খোঁজার জন্য একটা উৎকট আগ্রহ জন্মিল।
এ সময়ে এশিয়াটিক সোসাইটির পুঁথি সংগ্রহের দায়িত্ব নিয়ে শাস্ত্রী সংগ্রহের সীমানাকে বিহার, উড়িষ্যা ও আসাম পর্যন্ত বিস্তৃত করেন। এই পর্বেই শাস্ত্রীর সঙ্গে নগেন্দ্রনাথ বসু ও দীনেশচন্দ্র সেনের ঘনিষ্ঠতা হয়। এ দুজন ও ‘ট্র্যাভেলিং পণ্ডিত’দের সাহায্যে শাস্ত্রী যেসব পুঁথি কেনেন ও ভাড়া নেন, তার মধ্যে ছিল মানিক গাঙ্গুলির ধর্ম্মমঙ্গল, রামাই পণ্ডিতের শূন্যপুরাণ, ময়ূরভট্টের ধর্ম্মমঙ্গল প্রভৃতি। শাস্ত্রীর বিবেচনায় ধর্মঠাকুর বৌদ্ধ এবং তাঁর সাধ হলো ‘নেপালে হিন্দুরাজার অধীনে বৌদ্ধ ধর্ম কি রূপ চলিতেছে, দেখিতে যাইব’। ১৮৯৭ সালে প্রথম নেপাল যান হরপ্রসাদ শাস্ত্রী। কাঠমান্ডুর দরবারি গ্রন্থাগারে তালপাতার পুঁথিসহ পূর্ব ভারতীয় পুঁথির বিপুল সংগ্রহ শাস্ত্রীকে আরও উৎসুক করে তোলে। পরের বছর আবার নেপাল যান কেমব্রিজের অধ্যাপক সিসিল বেন্ডলকে সঙ্গে নিয়ে। এবার কয়েকটি পুঁথি নকল করে আনেন—‘সুভাষিত সংগ্রহ’ ও ‘দোঁহাকোষ পঞ্জিকা’-এর দুটি।
‘একরূপ নূতন ভাষায় লেখা’ পুঁথির ভান্ডার হরপ্রসাদ শাস্ত্রীকে আবার টেনে নিয়ে যায় নেপালে ১৯০৭ সালে। তাঁর বিবরণে:
...আবার নেপাল গিয়া আমি কয়েকখানি পুঁথি দেখিতে পাইলাম। একখানির নাম ‘চর্য্যাচর্য্য-বিনিশ্চয়’, উহাতে কতকগুলি কীর্ত্তনের গান আছে ও তাহার সংস্কৃত টীকা আছে। গানগুলি বৈষ্ণবদের কীর্ত্তনের মত, গানের নাম ‘চর্য্যাপদ’।

এর সঙ্গে খুঁজে পান সরোরুহবজ্রের দোঁহাকোষ (অদ্বয়বজ্রের টীকাসহ) ; কৃষ্ণাচার্য্যের দোঁহাকোষ ও ডাকার্ণব। সংবাদপত্র, সভা-সমিতি ও অন্যান্য মাধ্যমে এ সংবাদ প্রকাশিত হলে বাংলার পণ্ডিতমহলে প্রবল আগ্রহের সৃষ্টি হয়। কিন্তু এর প্রকাশে বিলম্ব একরকম অস্থিরতার সৃষ্টি করে। শাস্ত্রীর জবানিতেই জানা যায়:
ছাপাইতে বিলম্ব অনেক হইয়াছে। ইহাতে অনেক ‘সাহিত্যামোদি’ অত্যন্ত ব্যস্ত হইয়াছেন;...। অনেকে বলিয়াছিলেন, ‘শাস্ত্রী মহাশয় যক্ষের ধনের মত এই সকল অমূল্য রত্ন লুকাইয়া রাখিয়াছেন, কাহাকেও দেখিতে দিবেন না।’ কিন্তু এই সকল ছাপাইতে যে কি পরিমাণ কাঠখড় দরকার,...তাহারা তত জানিতেন না,...
অবশেষে লালগোলার রাজা শ্রীযুক্ত রাও যোগীন্দ্রনারায়ণ রায় বাহাদুরের অর্থানুকূল্যে সাহিত্য-পরিষদ গ্রন্থাবলির ৫৫ সংখ্যক গ্রন্থরূপে ১৩২৩ সনে (১৯১৬) প্রকাশিত হয় হাজার বছরের পুরান বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোহা।

চর্যাপদের যে পুঁথিটি শাস্ত্রী খুঁজে পান তা পাকানো তালপাতার ওপর লেখা। সাড়ে ১২ বাই দেড় ইঞ্চি আকারে ৬৯টি পাতার প্রতিটিতে দুপাশেই পাঁচটি করে লাইন রয়েছে। তবে শাস্ত্রী খুঁজে পাওয়ার আগেই এর পাঁচটি পাতা হারিয়ে গেছে।
এ ছাড়া এর প্রথম শেষ দিকের পাতাগুলো ছিন্ন হওয়াতে এর লিপিকর, লিপিকাল ও লিপিস্থল জানা যায়নি। অধিকাংশ পণ্ডিত মনে করেন যে চর্যার পুঁথি প্রাচীন বঙ্গলিপিতে লেখা। তবে প্রাচীন বঙ্গলিপির সঙ্গে প্রাচীন ওড়িয়া ও নেওয়ারি লিপির পার্থক্য সামান্য। লিপিবিশারদেরা চর্যার পুঁথি নকলের কাল দ্বাদশ শতকের শেষে অথবা ত্রয়োদশ শতকের প্রথমার্ধ বলে মনে করেন।

পরে তিব্বতি মহাগ্রন্থ তান্জুর (bsan-gyur)-এ পঞ্চাশটি চর্যার অনুবাদ পাওয়া যায়। প্রবোধচন্দ্র বাগচী উদ্ধারকৃত তানজুর-এ চর্যার পুষ্পিকার অনুবাদ থেকে জানা যায় যে এটি চর্যার টীকাগ্রন্থ। মুদ্রিত ১০০ চর্যা থেকে বাছাই করে ৫০টি চর্যার টীকা তৈরি করেন। তবে প্রাপ্ত পুঁথিটি মুনীদত্তের স্বহস্ত লিখিত নয়। চর্যার এই টীকা গ্রন্থের তিব্বতি অনুবাদ হয়েছিল কাঠমান্ডুর তীর্থস্থান স্বয়ম্ভূতে। পরে কোনো সময় পুঁথিটি নেপালের রাজাদের অধিকারে যায় এবং দরবার গ্রন্থাগারে স্থান পায়। রাজদরবারে ভুক্তির সময় পুঁথির মলাটের ওপর নেওয়ারি বর্ণে লেখা হয়েছে ‘চর্যাচর্যটীকা’। পুঁথিটি নেপালে অনুলিপি করা হয়েছে, না পূর্ব ভারতের অন্য কোনো অঞ্চল থেকে নেপালে নেওয়া হয়েছে, তা জানা যায়নি। তবে মধ্যযুগে নেপালে এর একাধিক অনুলিপি তৈরি হয়েছিল।
শাস্ত্রীর সংকলিত গ্রন্থ যে সাড়ে ৪৬টি চর্যা পাওয়া গেছে, তার ৪০টির চরণসংখ্যা ১০, তিনটির ১৪, দুটির ১২, একটির ৮ এবং খণ্ডিত চর্যার ৬। এই ৪৮০ চরণে মোট শব্দসংখ্যা প্রায় ২ হাজার ৪০০। এই শব্দগুলোই বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রাচীনতম উপকরণ। তবে লিপিকরণ-সংক্রান্ত নানা সীমাবদ্ধতা ও অস্পষ্টতার ফলে চর্যাপদের বিপুলসংখ্যক শব্দের পাঠ নিয়ে মতভেদও রয়েছে। ফলে পরবর্তী সময়ে চর্যার পদগুলোর প্রচুর পাঠস্তর উপস্থাপন করা হয়েছে, যাতে অর্থ ও ভাবের পরিবর্তন চোখে পড়ে।

চর্যার সাড়ে ৪৬টি পদ ২২-২৩ জন সিদ্ধাচার্যদের রচনা। বজ্রযানী বিশ্বাসে সিদ্ধরা অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন পুরুষ। তারা মনে করে যে গৌতম বুদ্ধ গোপনে গুহ্যসাধনা করতেন এবং তার ধারাবাহিকতা রয়েছে তন্দ্রসাধনার মধ্যে। বৌদ্ধ ভাবধারা হীনযান ও মহাযানে বিভক্ত হলে মহাযান থেকে উদ্ভব ঘটে সহজযান, মন্ত্রযান ও তন্ত্রযানের। সহজযানীরা তাঁদের ভাবধারা প্রকাশ করতে এই পদগুলো রচনা করেছেন।
এর মূলকথা ভবসমুদ্রের নানা মোহ অতিক্রম করে নির্বাণ লাভ করতে হবে এবং তার জন্য চাই সাধনা ও গুরু। ওই সাধনা অনেক পরিমাণেই দেহতাত্ত্বিক সাধনা, যার অবশেষ দেখা যায় বাউলদের মধ্যে। এই পদগুলোতে প্রচুর পারিভাষিক শব্দ ও যোগসাধনার নানা অনুষঙ্গ রয়েছে। ফলে সাধারণের জন্য অনেক সময় তা অবোধ্য। আবার এসব পদে রূপক হিসেবে এসেছে দৈনন্দিন জীবনের নানা অনুষঙ্গ। ফলে সে সময়ের সমাজ ও মানুষের চিত্রও চর্যায় পাওয়া যায়। বাংলার ইতিহাসে যেহেতু প্রাচীন উপকরণের অভাব রয়েছে; সেদিক থেকে এগুলো অত্যন্ত মূল্যবান। সে সময়ের নগর ও অন্তসজ্জনের জীবনের নানা বিচিত্র চিত্রে চর্যা ভরপুর। সাহিত্যের ভাব এবং রূপের বিবেচনায়ও চর্যাপদের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এত প্রাচীন সাহিত্য উপকরণ খুব বেশি জাতির নেই।
চর্যা-রচয়িতা সিদ্ধদের ৮৪ সিদ্ধর অন্তর্ভুক্ত করা হয়। প্রাচীন ভারতে ৮৪ সিদ্ধর বেশ কিছু তালিকা পাওয়া যায়; এরা মহামুদ্রার গুরু বলে খ্যাত। এদের মূর্তি এবং তান্কা চিত্র পৃথিবীর বিভিন্ন জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। তবে কোনো কোনো পণ্ডিত ৮৪ সিদ্ধকে রূপকথা গ্রহণ করে মনে করেন যে ৮৪ আঙুল মাপের মানব শরীর থেকে ৮৪ সিদ্ধর ধারণার জন্ম। তবে বিভিন্ন মঠে সংরক্ষিত জীবনী, তিব্বতিতে লেখা নানা গ্রন্থ, নানা রাজবৃত্ত, গুরু-শিষ্যপরম্পরা প্রভৃতি থেকে মনে হয় যে সিদ্ধরা ঐতিহাসিক ব্যক্তি ছিলেন।

চর্যা রচয়িতা সিদ্ধদের মধ্যে রয়েছে সরহ, আর্যদেব, শবর, লুই, কুক্কুরী, দারিক, গুন্ডুরী, বিরূপ, ডোম্বী, কম্বল, কঙ্কন, কাহ্ন, তন্নী, মহী, ভদ্র, বীণা, ধাম, শান্তি, ডুমুকু, জয়ানন্দী, চাটিল, ঢেন্টন ও তাড়ক। এদের সবার নামের শেষেই সম্মানসূচক পা ও পাদ ব্যবহার করা হয়। অনেক পণ্ডিত সিদ্ধদের এসব নাম নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন। তাঁরা মনে করেন যে এর অনেকগুলোই প্রকৃত নাম নয়। আবার অনেক পদ শিষ্যদের রচনা বলেও দাবি করেছেন কেউ কেউ।

এসব চর্যাকারের বাস ও কাল নিয়ে এখনো বিতর্ক চলছে। তবে সাধারণভাবে ওদের নিবাস বাংলা, উড়িষ্যা, আসাম ও মিথিলার মধ্যে। এদের কাল সাধারণভাবে অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতকের মধ্যে। চর্যার পদে নানা ভৌগোলিক উল্লেখ এবং নানা ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গ্রন্থ থেকে এদের জীবনচিত্র আঁকা হয়েছে। দীর্ঘকাল ধরে এদের অনেকে আরাধ্য হিসেবেও সেবিত হয়েছেন।

এখন থেকে ঠিক ১০০ বছর আগে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী চর্যার ভাষাকে পুরান বাংলা বলে দাবি করেছিলেন। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, সুকুমার সেন প্রমুখের গবেষণা সে দাবিকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে। তবে এই পণ্ডিতেরা মেনে নিয়েছেন যে এর মধ্যে অন্তত কয়েকজন বাংলা ভাষায় লেখেননি। আবার তখন বাংলার সঙ্গে ওড়িয়া বা মৈথিলির পার্থক্য ছিল তখন সামান্য; আসামি ও বাংলা ছিল এক ভাষা। ফলে চর্যার ওপর বাংলার পার্শ্ববর্তী ভাষাগুলোর দাবি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ইদানীং আবার কোনো কোনো পণ্ডিত চর্যাকে অবহট্টে রচিত বলে মত দিয়েছেন।
একসময় মনে করা হতো যে চর্যা-রচনা শুধু প্রাচীনকালেই হয়েছিল। কিন্তু গত অর্ধশতকে রাহুল সাংকৃত্যায়ন, শশিভূষণ দাশগুপ্ত, জগন্নাথ উপাধ্যায় প্রমুখের সংগ্রহ চর্যার এক নতুন জগৎ গড়ে তুলেছেন। নবচর্যার এই ধারা বহন করে চলেছেন নেপালের নেওয়ারি মানুষেরা, বিশেষত বজ্রাচার্য ও শাক্যমুনিরা।

চর্যাপদ প্রকাশনার শতবর্ষে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসকে আমূল বদলে দেওয়া এই গ্রন্থর দিকে যেন আমরা নতুন করে ফিরে তাকাই।

সৌজন্যেঃ প্রথম আলো

Additional Info

  • Image: Image