২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ১৬ চৈত্র ১৪২৩ বঙ্গাব্দ বৃহস্পতিবার, ৩০ মার্চ ২০১৭ইংরেজী
শুক্রবার, 22 জানুয়ারী 2016 02:54

বিমলেন্দু বড়ুয়া : আমার প্রাণপ্রিয় বাবা

লিখেছেনঃ সবুজ বড়ুয়া শুভ

বিমলেন্দু বড়ুয়া : আমার প্রাণপ্রিয় বাবা

আমি ভোরের স্বপ্নে দেখেছি তোমারে...

বৃষ্টিস্নাত স্নিগ্ধ সকাল। সবদিকে সুনসান নীরবতা। শান্তির নির্মল পরশ বয়ে যাচ্ছে যেনো চারিদিকে। ঘাসে জমে থাকা বৃষ্টির শুভ্র কণা মনে হচ্ছে এক একটি শিশির বিন্দু। ঝাউবনের সারি সারি বৃক্ষরাজির শাখা রাস্তার দু’ধারে নূয়ে আছে। বৃষ্টির জল গড়িয়ে পড়ছে গাছের শাখা বেয়ে। রাসত্মার বিশাল নক্‌শা করা ফুটপাত ভেজাভেজা। আমরা দু’জন হাঁটছি। আমার বাম হাত বাবার ডান করতলে লুকিয়ে রেখে ধরাধরি করে হেঁটে চলেছি। কথার ফাঁকে ফাঁকে দু’জনার মধ্যে গানও চলছে। গুণগুণ করে, বাবার সেই আজন্ম প্রিয় গান ডি এল, রায়ের, ধনেধান্যে পুষ্পেভরা আমাদের এই বসুন্ধরা...। কিংবা “এ মহাসিন্ধুর ওপার থেকে...।”

হঠাৎ কি হলো জানি না। বুঝে ওঠার আগে বাবা আমার হাত ছেড়ে দিয়ে হেঁটে চলেছেন। আমি নির্বাক নিষ্পলক নেত্রেস্থির হয়ে আছি। আমার দু’চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। অজোর ধারায় ফুঁফিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছি। কিন্তু বাবা সেই স্বভাব সুলভ ভঙ্গিমায় ভারী চশমার ফাঁকে ফাঁকে রাসত্মা দেখে দেখে চলে যাচ্ছেন। আমি কেঁদে কেঁদে বাবার হেঁটে যাওয়া পদ যুগলের চিহ্নগুলোতে উপুড় হয়ে চুমো দিচ্ছি। আর আমার অশ্রু ধারা বৃষ্টিভেজা সেই রাস্তায় মিলিয়ে যাচ্ছে। পূর্বদিকে ঊষার প্রথম আলোর মিষ্টি আভা উকি দিচ্ছে। বাবা আমার মহাবস্থানের পথিকের মতো চলে যাচ্ছেন। ধীরে ধীরে বাবা আমার দৃষ্টি সীমানা ছাড়িয়ে কোথায় যেন হারিয়ে গেলেন। ক্ষীণ থেকে ক্ষীনতর হয়ে আর চোখের দেখা পেলাম না। আমি হু হু করে কেঁদে বলেছি। হঠাৎ কেন জানি ঘুম ভেঙে গেল, চোখের নোনা জলে বালিশ ভিজে গেছে। ঘুমভাঙা ভোরে বিছানায় বসে সেকি কান্না! আমার প্রাণপ্রিয় বাবাকে দেখলাম ভোরের স্বপ্নে ...। কিছু রাত জাগা পাখি উড়ে যাচ্ছে দূরের নীল সীমান্তে।

আর্তনাদ ব্যথাজর্জর বুকভরা নীল বেদনাকে সাথী করে আমার দিনটি শুরু হলো বুকভাঙা বেদনায়।

মরণের ফুল বড় হয়ে ফোঁটে...

কবি মোহিত লাল মজুমদার বড়ই আক্ষেপ করে বলেছিলেন : মরণের ফুল বড় হয়ে ফোঁটে। জীবনের উদ্যানে...। আমার বাবা বিমলেন্দু বড়ণ্ডয়াও বড় হয়ে ফুটেছিলেন তাঁর জীবন উদ্যানে নানা-ঘাত-প্রতিঘাত উত্থান প্রত্যাখ্যানের, হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনায় শত প্রতিকূলতার মাঝেও তাঁর জীবনকে পত্র-পুষ্পে বিকশিত করেছিলেন, সৌরভ বিলিয়েছিলেন। ফুল যেমনি নিজের জন্য ফোটে না। সবাই সৌরভ বিলানোর জন্য আনন্দ দেবার জন্য তার ফোটা। তেমনি তিনিও সারাটি জীবনকে ‘পরের তরে] জীবনের কম সৌরভে সুরভিত করেছেন। আমরা জানি জীবনের অমোঘ পরিণতি মৃত্যু। আমরা কেউই তা রোধ করতে পারবো না। আমার প্রিয় বাবাও পারেন নি। বাবা সব সময় বলতেন: আমার শরীর বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে, অস্থি-চর্ম কুঞ্চিত হবার আগেই যেন আমার মৃত্যু হয়। বাবার এ কথাটি সত্য প্রমাণ করলেন তাঁর মৃত্যু দিয়ে। তাই তাঁর দীর্ঘ বর্ণাঢ্য জীবনের প্রতিটি দিন প্রতিটি ক্ষণ, প্রতিটি সময় কাজে লাগিয়েছেন যথার্থভাবে সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে। যতদিন বেঁচেছেন ততদিনই জীবন্ত অবস্থায় বেঁচে থাকতে চেয়েছেন। তিনি বলতেন: জীবনকে জীবন্ত করে রাখাটাই জীবনের সার্থকতা। তাই তিনি দিন রাত কর্মের মাঝে আত্মনিবেদিত থেকেছেন। সুখ খুঁজেছেন কর্মের মাঝে। কুপমন্ডুকতা, আত্মকেন্দ্রিকতা তাঁকে কখনো স্পর্শ করতে পারেনি। সত্যের সন্ধানে নির্ভীক, শিক্ষা ও মনন বিকাশে আপসহীন, সাহিত্য সাধনায় সৌম্য যোগী এবং সমাজ সর্দ্ধম সেবায় নিবেদিতপ্রাণ এক মহান পুরুষ। বাবা কোনদিন আপনার লয়ে বিব্রত থাকেননি, সকলের তরে। পরের কল্যাণে, প্রয়োজনে নিজের জীবন-মন-প্রাণ সবই উৎসর্গ করেছেন এবং এতেই সুখী হতে পেরেছেন। মৈত্রী মিলনে, মানবতার ফল্গুধারায়, নবতর সৃষ্টির উচ্ছ্বাসে জীবনকে তিনি সজীব প্রাণবন্ত করে তুলেছিলেন।

আমার বাবা আমার অহংকার...

তিনি যেন এক বিশাল বিটপি। শান্ত শ্যামল বটবৃক্ষ। যাঁর সান্নিধ্যে সীমাহীন সুখ। ভয়হীন নির্মল নির্মোহ প্রাণ। তিনি স্নেহ পরায়ন দায়িত্বশীল পিতা, সুহৃদ বন্ধুবৎসল ভ্রাতা, প্রেমময় স্বামী। সমাজ সর্দ্ধম বিকাশে কল্যাণে তাঁর আত্মনিবেদন বা আত্ম্যোৎসর্গ থাকার তৃপ্তি সে এক অভিনব অনুকরণীয়।

আমার শৈশবে বাবার হাতে হাত রেখে সন্ধ্যাকালীন ভ্রমণের বের হতাম যা আমার কৈশোর-যৌবনে অটুট ছিল। এমনকি তাঁর দুর্ঘটনায় পতিত হবার পূর্বে যখন তিন মাস জাপানে অবস্থান করছিলেন সেই সময়েও আমি আর বাবা হাতে হাত রেখে ঘুরতাম।

চলার পথে নানা আলোচনা-সমালোচনা, রাজনীতি, সমাজ-সর্দ্ধম, দেশ-জাতি বিভিন্ন বিষয় উঠে আসতো আমাদের দু’জনার মাঝে। সাথে বিভিন্ন মেজাজের গান গাওয়া। সাথে চলতো গীতিকার, সুরকার আর কণ্ঠশিল্পীর গায়কী নিয়ে আলোচনা।

ছোটবেলা থেকে বাবা যখন অফিসে রওনা দিতেন অবশ্যই আমার দু’গালে আদরের চুমো খাততোই। অন্যথাই হলে কান্না কাটি। একবার হলো কি- গ্রামে থাকাকালীন চুমো না দিয়ে বেরিয়েগেছেন বাবা। বাবা অনেক দূরে চলে গেছেন ইতিমধ্যে। মাঝে হলো বিপত্তি, হোঁচট খেয়ে উল্টে পড়লাম। শব্দ শুনে বাবা পেছনে ফিরে দেখলেন আমরা। কারণ খুঁজতে জানতে পারলেন চুমো দেওয়া হয় নি। তারপর বাবার সেই ভুবন মোহিনী মধুর হাসিটি দিয়ে দু’গালে চুমো দিলেন। আমি তৃপ্তি নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। আর শেষবারের মতো আমাকে চুমো দিয়েছিলেন বাবা জাপানের নারিতা বিমানবন্দরে ১০ জানুয়ারি ২০০৭ খ্রীস্টাব্দে। জাপান পরিভ্রমণ শেষে যখন স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করছিলেন সেই মুহূর্তে। সেদিন দু’স্বপ্নেও ভাবিনি বাবার সাথে আর জীবন্ত-প্রাণবন্ত দেখা হবে না ।

এ কেমন চলে যাওয়া তাঁর...

বাবা যখন দেশে ফিরছিলেন তখন আমার থিসিস জমা দেবার সময়। ১৫ জানুয়ারি সর্বশেষ সময় আর বাবার দুর্ঘটনাটি হলো ১৩ জানুয়ারি। আমি জানলাম পরের দিন সন্ধ্যায়। এমন প্রতিকূলতার সময়ে আমার প্রিয় বাবার দুর্ঘটনার সংবাদ। কী যে কষ্টের প্রতিটিক্ষণ, প্রতিটি মুহূর্ত কেটেছে তা বলার মতো নয়। এমন বেদনা বিদীর্ণ সময়েও সঠিক সময়ে থিসিস জমা দেয়া হলো। জাপানের টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমার ডিপার্টমেন্ট বায়োমেডিক্যাল কেমিস্ট্রির সকল প্রফেসর, শিক্ষক-ছাত্র-ছাত্রী সহপাটী আমাকে সহমর্মিতা জানালো। এমন দুঃসময়ে আমাকে সান্তনা দিয়ে নানাভাবে সহায়তা করেছেন আমার পিতৃতুল্য শ্রদ্ধেয় মামা বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার কনসালটেন্ট ডা. সুমন সেবক বড়ণ্ডয়া ও তার স্ত্রী স্মৃতি বড়ুয়া। সুদূর ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলা থেকেও আমাকে প্রতিটি পদক্ষেপে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করেছেন। জাপানে সেই সময়ে আমার অভিভাবক হিসাবে স্থপতি ড. সন্‌জীব বড়ুয়া, ডা. রীতা বড়ুয়া, ড. অধ্যাপক খাদেমুল ইসলাম, ড. মোতারব হোসেন প্রমুখ। সাথে ছায়ার মতো থেকেছে আমার প্রিয়তমা স্ত্রী মিথিলা। ২০ তারিখ বাংলাদেশে পৌঁছলাম রাতে। বিমানবন্দরে আমার বোন অনিত্ম ও তার স্বামী উদয়শংকর বড়ুয়া গেলেন আমাদের রিসিভ করতে। মিথিলা সহ আমরা আবার বর্তমান অবস্থান দেখার জন্যে গেলাম ঢাকাস্থ এ্যাপোলো হাসপাতালে। আইসিইউতে সংজ্ঞাহীন পড়ে আছেন বাবা। সবার দেখার সুযোগ নেই তাই মনিটরের ব্যবস্থা। চিরদিনের সেই চিরচেনা বাবাকে চিনে নিতে কষ্ট হচ্ছিলো। প্রচণ্ড রক্তক্ষরণে চোখ ফুলে গেছে। কৃত্রিম উপায়ে চলছে শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যবস্থা, হৃদস্পন্দন সচল রাখার প্রয়াস। আমাকে ভিতরে প্রবেশের অনুমতি মিললো বটে কিন্তু আমি একী দেখলাম! আমাকে চুমো দেবার কিংবা চোখ মেলে তাকাবার কোন শক্তি নেই। দীর্ঘ এক নিঃশ্বাস, বুকভাঙা চাপা কান্না নিয়ে আমিই চুমো দিলাম আমার বাবাকে।

শ্যামল বাংলার স্নিগ্ধ কবি জীবনান্দের প্রভাব পাওয়া যেতো বাবার কাব্য সুষমায়। বাবার মৃত্যুটাও যেন বনলতা সেনের সেই কবির মতো দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে। বাবা চলে গেলেন চিরতরে ২২ জানুয়ারি। তাঁর চলে যাওয়াটা জাগতিক অমোঘ নিয়মে হলেও হৃদয়ের মর্মমূলে কেন জানি সকরুণ বেদনায় আর্তনাদ বেজে ওঠে:


‘হায় ওরে মানব হৃদয়,

বারবার

কারো পানে ফিরে চাহিবার

নাই যে সময়,

নাই- নাই।

.... তাই’

চিহ্ন এক পড়ে আছে

তুমি হেথা নাই।

এই না থাকার শূন্যতা, ব্যথাদীর্ণ দিনগুলোর হাহাকার আমি তাঁর প্রিয় সন্তান হিসেবে আমৃত্যু আমাকে গভীর ভাবে দহন করবে। অনুভবে-অনুক্ষণে শত শত সুখদ স্মৃতি আলোড়ন তোলে হৃদয়ে।

ঐ মহাসিন্ধুর ওপাড় থেকে...

গানের আসরে বাবার সাথে যখনই বসতাম, ডি এল রায়ের সেই অমর সৃষ্টি-ঐ মহাসিন্ধুর ওপার থেকে...। গাইতে হতো। প্রখ্যাত শিল্পী মান্না দের জলদ গম্ভীর কণ্ঠের এই গান সত্যি সত্যি জন্ম-মৃত্যু সেই মিছে মোহ মায়ার মরীচিকার কথা স্মরণ করিয়ে দিতো। বাবা সেই গানের নিগূঢ়তা, শব্দের যাদুময়তা সব ব্যাখ্যা করতেন। বাবার প্রায় প্রতিটি লেখার প্রথম পাঠক হতাম আমি। শব্দের গঠন প্রণালী গল্পের গতি প্রকৃতি অনুপ্রসারে অনাবিল আবেদন মোহময় আবেগ রচনা করতো তাঁর প্রতিটি লেখায়। জীবনকে তিনি সব সময় মাটির কাছাকাছি রাখতে চেয়েছেন এবং থেকেছেনও। উজ্জ্বল অনন্য কিংবা নক্ষত্র হয়ে ধন সম্পদ বিশাল বৈভরের অধিকারী না হলেও সাধারণের মাঝে ধানের গন্ধ আর দেহে সমুদ্রের লোনা জলে আজও অনন্য তিনি। সেই আলোকে নির্দ্ধিধায় বলতে পারি: বাবা বিমলেন্দু বড়ণ্ডয়া এ যুগের মহাস্বত্বতুল্য নির্মোহ মানুষের প্রতিকৃতি।

সবার প্রতি মমতা আছে কিন্তু কোন মোহ নেই। করণীয় কর্তব্য নিষ্ঠা আছে কিন্তু পদ-পদবির লিঞ্ঝা নেই। নির্ভীক সাংবাদিকতায় সাহিত্যের নবধারা স্মৃতির পারঙ্গমতায় লেখক আর পাঠকের মাঝে সহিতত্ত্ব বির্নিমাণে, সমাজ সচেতনতা ও দায়বদ্ধতার মাঝে বাবা বিমলেন্দু বড়ুয়াকে আমি খুঁজে পাই উত্তর আধুনিক এক মহাপুরুষ হিসেবে।

চিরন্তন ট্রাজেডি

বৈপরিত্য বিরুদ্ধ বাতাসে জীবন মাঝে মাঝে নাভিশ্বাস হয়ে ওঠে। অর্থহীন অনর্থক কলহ বিবাদে জর্জরিত হতে হতে খুঁজে ফিরি অতিনীল আকাশের স্বাদ এমন দুর্দিনে বাবার স্নেহময় পুণ্যপরশ বিশাল বিটপির শ্যামল ছায়া বড় বেশি প্রয়োজন। বাবার কবিতার ভাষায়

“...আর কোন যুদ্ধ নয়, শত্রুতার হোক অবসান

জন্ম জরা ব্যাধি মৃত্যু চির দুঃখ বিভীষিকা মাঝে

অপ্রিয় সংযোগ আর প্রিয়ের বিয়োগ ব্যথায়

ক্ষুব্ধ হই বারংবার খুঁজে ফিরি শান্তির সন্ধান..”

স্মৃতির বীনায় আজও বাজে হায়...

হাজারো মধুময় স্মৃতি ভিড় করছে মনের মনিভোটায়। স্মৃতির বীণায় বেজে চলছে বেহাগের করুণ সুর। যখনই কোথাও বের হই, অনুষ্ঠানে যাই ঘুরে ফিরে বাবার প্রসঙ্গ আসে। বেদনার কালো মেঘ ঢেকে যায় আমার হৃদয়। পর্বতসম বিশাল ব্যক্তিত্ব মানুষকে আপন করে নেবার অসাধারণ যাদুময় ক্ষমতা। সে যে বয়সেরই হোক তরুণ-যুবা-প্রৌঢ় কিংবা বৃদ্ধ। সবকিছুর মাঝে মানবিকতা মূর্ত হয়ে উঠতো সবার আগে। শিক্ষা সংস্কৃতির বিকাশে জনকল্যাণে স্কুল-কলেজ রাস্তাঘাট নির্মাণ, অনাথের নাথ হয়ে, কিংবা অভুক্ত কারো ক্ষুধা নিবারণে শহরে কিংবা গ্রামে তাঁর ছিল নিরন্তর পথচলা। বিদেশের মাটিতে স্বদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতেও বিভিন্ন দেশের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে বাবা বিমলেন্দু বড়ুয়ার অবদান অনস্বীকার্য বিশেষ করে মায়ানমার (বার্মা), থাইল্যাণ্ড, কোরিয়া, তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন, মঙ্গোলিয়া প্রভৃতি দেশ। সব কিছুর মাঝে প্রেরণাদাত্রী শক্তি হিসেবে কাজ করতেন একজন সে হলো আমার মা অমিতা বড়ুয়া। সামাজিক দায়বদ্ধতা রক্ষায় বাবা সব সময় সচেষ্ট ছিলেন। সব কিছুতেই ছিল পরিমিতি বোধ যা তাঁকে অনন্যঅসাধারণ করে তুলেছে। তাইতো তাকে কুঞ্জবনে বসন্ত বন্দরে। তারা জ্বলা আকাশে আসরে প্রার্থিক হিসেবে পাওয়া যাবে না। আকাশের অমেয় উৎসবে। তিনি বলেছিলেন। আছিতো মাটির কাছে দেহে তার বহুবর্ণ রং রঙিন মৃত্যুহোক। অমরতা চাই না বরং।

আমার বাবা বিমলেন্দু বড়ুয়া চলে গেছেন অমৃতলোকের সন্ধানে। নির্বাণের নির্মোহ নির্দেশ তিনি অনন্তলোকে যাত্রা করছেন। সত্য সুন্দর প্রতিষ্ঠায় যিনি ছিলেন এক অভিযাত্রী। মৃত্যুর পরও তিনি বেঁচে আছেন হাজার মানুষের হৃদয়ে। তাঁর কর্মযজ্ঞ, বিশাল সাহিত্য ভাণ্ডার নতুন প্রজন্মকে উচ্ছল প্রাণের জোয়ার উচ্ছ্বাসে ভরিয়ে দেবে আমার বিশ্বাস। তাইতো মৃত্যুর পরেও ভূষিত হচ্ছেন বিভিন্ন স্মারক সম্মাননায় অতীশ দীপঙ্কর স্বর্ণপদকসহ নানা অভিধায়। তাঁর স্মৃতিকে অম্লান করে রাখতে গঠিত হয়েছে সাংবাদিক বিমলেন্দু বড়ণ্ডয়া মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশন। তাঁর সাহিত্যকর্ম এবং স্মৃতিকে সমুজ্জ্বল করে ধরে রাখার মাধ্যমে জানানো হবে বাবার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। সেই আলোকে স্মরণ পত্র, স্মারক গ্রন্থ প্রকাশ ও নানা কর্মসূচি পালন তারই ক্ষুদ্র প্রয়াস।

বাবা বিমলেন্দু বড়ুয়া আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে চলে গেছেন প্রায় সাত বছর। সেই বিয়োগ ব্যথা এখনো শুকায়নি। অশ্রুসজল নয়নে। ব্যথাহত চিত্তে তাই আজ স্মরণ করি;

“তুমি চলে গেছ দূরে

সেই বীজ অমর অঙ্কুরে

উঠেছে অমর প্রাণে

কহিছে গম্ভীর গানে

যত দূর চাই নাই নাই

- সে পথিক নাই।”

Additional Info

  • Image: Image