২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ বৃহস্পতিবার, ২৩ নভেম্বর ২০১৭ইংরেজী
Clear

22°C

Chittagong

Clear

Humidity: 68%

Wind: 17.70 km/h

  • 23 Nov 2017

    Partly Cloudy 27°C 16°C

  • 24 Nov 2017

    Mostly Sunny 27°C 18°C

শুক্রবার, 22 জানুয়ারী 2016 02:25

এক খন্ড সোনালী স্মৃতি : বিমলেন্দু বড়ুয়া

লিখেছেনঃ বিমলেন্দু বড়ুয়া

এক খন্ড সোনালী স্মৃতি : বিমলেন্দু বড়ুয়া

স্কুলের নোটিশ বোর্ডের সামনে জটলা। ছাত্রদের হুড়াহুড়ি। বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফল লাগিয়ে দিয়ে দপ্তরী আর কেরানী বোর্ডের ঢাকনিতে ছোট্ট তালা আটকে দিলেন। ঢাকনির উপর তারের জাল। ফাঁক দিয়ে সব দেখা যাচ্ছে। সুন্দর হাতের লেখা। ইংরেজীতে লেখা উত্তীর্ণ ছাত্রদের নাম আর রোল নম্বর। যেন ঝকঝক করছে। যারা পাশ করেছে তাদের চোখে-মুখে আনন্দের উদ্ভাস। আর ফেল যারা মেরেছে তারা নীরবে নতমস্তকে আড়ালে চলে যাচ্ছে। এই আনন্দ-বেদনার পরিবেশে হঠাৎ এক নাটকীয় ঘটনা ঘটে।

ছেলেটি ছুটতে ছুটতে আসছিল কধুরখীলের দক্ষিণ পশ্চিম প্রান্ত থেকে। কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী কালুরঘাট রেলসেতুর পূর্বপাড়ে যেখানে বোয়ালখালী থানার কধুরখীল ইউনিয়নের সূচনা সেই পল্লীরই দুরন্ত এই ছেলেটি। প্রায় দু’মাইল পথ ভেঙ্গে এসে কধুরখীল ইউনাইটেড মুসলিম হাইস্কুলের নোটিশ বোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। ছিপছিপে গড়নের এই ছেলেটি ৭ম শ্রেণীর বার্ষিক পরীক্ষা দিয়েছে। বয়স চৌদ্দের কোঠায়। পরনে হাফশার্ট ও হাফ প্যান্ট। খুব সস্তা দামের। শরীর শীর্ণ-রোগাটে হলেও চেহারা মায়াময়। চোখ-মুখ বড়ো বেশি সপ্রতিভ। সবসময় কিছু যেন জানার জন্য সমুৎসুক। কী এক অনন্ত জিজ্ঞাসা!

বহু কাঠ খড় পুড়িয়ে অনেক আশা-ভরসায় ছেলেটি এই নতুন স্কুলে ভর্তি হয়েছিল। ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ দ্বিখন্ডিত হয়ে, পাকিস্তান সৃষ্টি হবার পর কধুরখীলে এই হাইস্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। চালু হয় ৫ম থেকে ৮ম শ্রেণী। চারটি শ্রেণী নিয়ে যাত্রা। এখানে শিক্ষকতায় ঢুকেছেন পণ্ডিত গিরিশচন্দ্র বিদ্যাবিনোদ। পটিয়া থানার (এখন চন্দনাইশ) দক্ষিণ জোয়ারা তাঁর জন্মস্থান এবং পাইরোল গ্রামে তাঁর স্থায়ী বাসস্থান। প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর তিনি দ্বিতীয়বার দার পরিগ্রহ করেন কধুরখীল গ্রাম থেকে। সেই সূত্রেই এ নতুন হাইস্কুলে তাঁর নিযুক্তি। থাকেন দ্বিতীয় শ্বশুরবাড়ীতে। তিনিই ছেলেটিকে নিয়ে আসেন এই হাইস্কুলে। ছেলেটির পড়াশুনা বন্ধ ছিল একটানা ছয় বছর। ১৯৪২ সালে জাপানী-ব্রিটিশ যুদ্ধকালে উদ্বাস্তু অবস্থায় ৪র্থ শ্রেণী থেকে বৃত্তি পরীক্ষা পাশ করার পর হাইস্কুলে তো যাওয়াই হয়নি তার।

এখন ছেলেটি পরীক্ষার ফলাফল দেখতে এসে এ কী দেখল! তার রোল নম্বও নাম কিছুই নেই। তাহলে সে কি ফেল মেরেছে? কিছুক্ষণ থমকে দাঁড়িয়ে থাকে বজ্রাহতের মতো। তারপর কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে স্কুলের দক্ষিণ সংলগ্ন দীঘিরপাড়ের গাছতলায় বসে থাকে। বসে বসে ভাবতে কেমন যেন আচ্ছন্ন হয়ে যায়। পড়ার জন্য এত লাফালাফি করে ফেলের গ্লানি নিয়ে কী করে বাড়ী ফিরবে সে! এখন পণ্ডিত মশাইও তো নেই। তিনি অন্যস্কুলে চলে গেছেন। বছর দু’বছরের বেশি থাকেন না এক স্কুলে। বড়ো অস্থির মানুষ। তিনি কেন ধরে আনলেন এই ছেলেটিকে? অভাবে-অনটনে ভাগ্য বিপর্যয়ে পড়ে সে বর্মা-প্রত্যাগত পিতার চাষাবাদ-ক্ষেত খামারের কাজে জড়িয়েই ছিল।

একদিন গরু চরাচ্ছিল সে পাড়ার উত্তর দিকে প্রাইমারী স্কুলের পাশে রেল রাস্তায়। শিক্ষক-ছাত্রছাত্রীদেও সন্ত্রস্ত অবস্থা। পাড়ার প্রামাণ্য লোকেরা এসেছেন। পরিদর্শনে আসছেন স্কুল ইন্সপেক্টর। গরু চরানো ছেলেটি কৌতূহল ভরে জানালার শিক ধরে বাইর থেকে দেখছিল ভেতরের কাণ্ড কারখানা। শিক্ষকদের ব্যস্ততা বেড়ে যায়। তাঁদের একজন বললেন: এই ছেলে, বাইরে দাঁড়িয়ে দেখছিস্ কি? ভেতরে আয়। চতুর্থ শ্রেণীতে গিয়ে বসে যা।
ছেলেটি থতমত খেয়ে বললে ঃ আমি তো স্যার সেই যুদ্ধের বছর ৪র্থ শ্রেণী থেকে বৃত্তি পাশ কওে গেছি। এখন তো আর পড়ি না, আমি তো ছাত্র নই।
: দূরও বোকা, তোকে আজকের জন্যই ছাত্র হতে বলছি। তাড়াতাড়ি আয়। ঐ ডাকে ছেলেটি শ্রেণীকক্ষে ঢুকে পড়ে। বসে যায় ৪র্থ শ্রেণীর অন্যান্য ছেলে মেয়েদের সংগে।
ততক্ষণে ইন্সপেক্টর সাহেব এসে গেছেন। শ্রেণী পরিদর্শন করছেন। তাঁর পেছনে গণ্যমান্য দু’জন ব্যক্তি। তাঁরা প্রথমেই ঢুকলেন ৪র্থ শ্রেণী কক্ষে। শুরু হল প্রশ্নের পর প্রশ্ন। ইংরেজী, বাংলা, ভূগোল, মানসাঙ্ক ইত্যাদি বিষয়ে একের পর এক চুটকি প্রশ্ন। অন্য ছেলে-মেয়েরা ঘাবড়ে যায়। কিন্তু একদিনের এই ছাত্রটি বুক ফুলিয়ে পটাপট সব প্রশ্নের জবাব দিতে থাকে। নির্ভুল জবাব।
ইন্সপেক্টর সাহেব তো খুশি, বললেন: সাবাস্! ভালো করে পড়ো।

তারপর একসময় তিনি চলে যান। ছেলেটিও তার গরুগুলি দেখার জন্য ছুটে যায়। ভালো করে পড়ার স্বপ্ন কবেই যে ভেঙে খানখান হয়ে গেছে। তার সেই স্বপ্নসাধ তো এখন আর্তনাদেই পর্যবসিত।
সন্ধ্যার পর একদিনের জন্য ছাত্র সাজা সেই রাখাল ছেলে গরুর পাল নিয়ে রেল রাস্তা থেকে বাড়ী ফিরছে। তখন সান্ধ্য ভ্রমণে বেরিয়েছেন পণ্ডিত মশাই। কালুরঘাট ব্রিজের দিকে কর্ণফুলীর হাওয়া খেতে যাচ্ছেন তিনি। ছেলেটি পা ছুঁয়ে প্রণাম করে তাঁকে। পণ্ডিতমশাই আশীর্বাদী হাত প্রসারিত করে বললেন: বেশ, বেশ। তুমি তাহলে ক্লাস ফোরেই পড়ছ। আজ তোমার জবাবগুলি খুব সুন্দও হয়েছে। ইন্সপেক্টর সাহেব বলেছেন তাঁর খুব ভালো লেগেছে। আমরাও খুশি। ভালোমতে পড়ো।

গিরিশ পণ্ডিতও স্কুল পরিদর্শনের সময় গণ্যমান্য ব্যক্তি হিসেবে ছিলেন। কিন্তু তাঁর খোশ মেজাজ তৎক্ষণাৎ বিস্ময়ে বিগড়ে গেল ছেলেটির জবাব শুনে ঃ কই আমি তো পড়ি না, স্যার!
: পড়ো না মানে! তোমাকে ক্লাস ফোরে দেখলাম যে!
ছেলেটি আহত স্বরে বলে: আমাকে মাস্টারেরা ডেকে আজকের মতো বসিয়েছেন ছাত্র হিসেবে। আমি তো পড়া ছেড়েছি ১৯৪২ সালে।
গিরিশ পণ্ডিত যেন আকাশ থেকে পড়লেন: কি বলো হে ছেলে! পড়া ছাড়লে কেন?
: ছাড়িনি স্যার, ছাড়তে হয়েছে। পড়ার সামর্থ্য নেই আমাদের। --- ছেলেটির অকপট স্বীকারোক্তি। দু’চোখ ছলছল করে ওঠে তার।
ফিরে দাঁড়ালেন পণ্ডিতমশাই। সান্ধ্য ভ্রমণে ক্ষান্ত দিয়ে ছেলেটির বাড়ীতে গিয়েই হাজির হলেন। বাড়ীর লোকজন ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠলো। পাড়ার নতুন জামাই। জামাই আদরে বসার ও চা আপ্যায়নের ব্যবস্থা হল। এ কথা-সেকথার পর পণ্ডিতমশাই জিজ্ঞেস করলেন ছেলেটির বাবা আর মাকে কেন ছেলেটিকে হাইস্কুলে দেওয়া হয়নি, কেন ছয়টি বছর বন্ধ রাখা হল তার পড়াশুনা।

ছেলেটি ততক্ষণে গোয়ালে গরুগুলি বেঁধে ঘরের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। শুনছে পণ্ডিতমশাইর উত্তপ্ত সংলাপ। মা-বাবা তাঁদের অক্ষমতার কথা ইনিয়ে বিনিয়ে বলছেন ঃ বর্মার রাজধানী রেঙ্গুনে স্টীল ট্রাঙ্কের ফ্রাক্টেরী ছিল, দোকান ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানী বোমার আঘাতে সব ধ্বংস হয়ে গেছে। সবকিছু হারিয়ে প্রাণ নিয়ে দুর্গম পথ হেঁটে প্রায় দু’ মাস বনজঙ্গলে কাটিয়ে বাড়ী এলেন উপার্জনকারী লোকটি। কিন্তু যুদ্ধ ততদিনে চট্টগ্রামের সীমান্তে। কালুরঘাট ব্রিজের সংলগ্ন লোকালয়ে ব্রিটিশ সৈন্যদেও ঘাঁটি বসেছে। অধিবাসীদের উদ্বাস্তু করা হয়েছে। আত্মীয় স্বজনদের কাছে চলে যেতে হয়েছে, আশ্রয় নিতে হয়েছে। প্রাইমারী স্কুলটিও স্থানান্তরিত করা হয়েছে গোমদন্ডীতে। শুরু হল ১৯৪৩ এর ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। গোমদণ্ডী থেকে কধুরখীলে নিজেদের বাড়ীঘরে ফিরে চাষের কাজে নামতে হল। কাজেই ছেলে পড়াবো কী করে জামাই বাবা?
ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বললেন পণ্ডিত মশাই: কেন, না খেয়ে পড়াতেন, উপোস থেকে পড়াতেন। হায়, হায়! ছেলেটির কেন যে সর্বনাশ করলেন? ছেলের মামা তো বেশ বড় লোক, তাঁকে কেন ধরলেন না?
বাবা-মা’র সংক্ষিপ্ত উত্তর: ধরাধরি অনেক হয়েছে বাবাজী। ছেলে পড়ানো আমাদের অদৃষ্টে নেই। অসুখ-বিসুখে মরে যাচ্ছি, দু’ বেলা ভাত জোটে না।
গর্জে উঠলেন পণ্ডিত মশাই: ঝাঁটা মারি অদৃষ্টের কপালে। আপনারা শক্ত হোন। ছেলেটিকে আমি নিয়ে যাবো হাইস্কুলে। পড়ার একটা ব্যবস্থা তার করতেই হবে।
ছেলেটির দিকে তাকিয়ে বললেন তিনি: এই ছোকরা, তুমি কোন ক্লাসে পড়তে পারবে?
কোন কিছু না ভেবেই ছেলেটি বললো: ক্লাস সেভেনে পারবো স্যার।
ঠিক আছে। কালই তোমাকে ইস্কুলে নিয়ে যাবো। কধুরখীল মুসলিম হাইস্কুলে ভর্তি করিয়ে দেবো।
তারপরই পণ্ডিতমশাই হাজির হলেন ছেলেটির মামার বাড়ীতে। মামা ডাক্তার। পাড়ার বড় লোক, নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি। তাঁকেও কিন্তু ছাড়লেন না পণ্ডিতমশাই। খুব বকাবকি করলেন। শেষ পর্যন্ত সাব্যস্ত হল নাম লেখানো আর এক মাসের মাইনে তিনি দেবেন। ছেলেটিকে হাইস্কুলে ভর্তি করানো হোক। বিনা বেতনে পড়ার ব্যবস্থা করবেন পণ্ডিতমশাই।

তখন আড়াই টাকা সপ্তম শ্রেণীর মাইনে। আর এক মাসের মাইনে সমান ভর্তি ফি। এই পাঁচ টাকা দিয়ে ক্লাস সেভেনে ভর্তি হয়ে গেল ছেলেটি কধুরখীল ইউনাইটেড মুসলিম হাইস্কুলে। অন্যান্য আনুষঙ্গিক চার্জ মওকুফ করালেন পণ্ডিতমশাই। পুরনো বইপত্র জোগাড় করা হলো আধামূল্যে। এজন্য বিশ টাকায় বেচতে হলো মা-র একটি রুপোর বিরাট চন্দ্রহার।

খেয়ে না খেয়ে, চাষের কাজ সেওে ছেলেটি স্কুলে যায় পণ্ডিতমশাইর সাথে। পখে পথে পড়া মুখস্থ করে। ইংরেজী আর বাংলা কবিতা পাঠ মুখস্থ আদায় করা হতো স্কুলে। নতুন হাইস্কুল। পড়া লেখার ব্যাপাওে খুব কড়াকড়ি। কধুরখীল হাইস্কুলের সাথে পাল্টা দিয়ে চালাতে হচ্ছে। অনেক ছাত্র সেখান থেকে এই নতুন স্কুলে এসে ভর্তি হয়েছে। ছেলেটির তাই দিনরাত খাটতে হয়েছে কিন্তু এত খাটা-খাটুনীর পর এ কেমন ফল পেলো সে। দু চোখ বেয়ে জল আসে। আর সেই জলধারা যেন মিশতে চাইছে লালার দীঘির অথৈই জল রাশিতে। পড়ন্ত সূর্যের কিরণে চিকচিক করছে দীঘির নিস্তরঙ্গ কালোজল। একদৃষ্টে চেয়ে থাকে সে সেদিকে। আর ভাবে তার ফেলে আসা সেই বেদনাদীর্ণ দিনগুলোর কথা। ভাবতে ভাবতে কেমন তন্ময় হয়ে যায় সে। হঠাৎ চমক ভাঙে সহপাঠী ইউসুফের ডাকে ঃ কিওে, এখানে বসে আছিস কেন? চল, হেডমাস্টার সাহেবের কাছে যাই।
: সেখানে গিয়ে কি করবো? --- জিজ্ঞাসার মধ্যে কেমন যেন নির্লিপ্ততা।
: কি করবো মানে? কেন জিজ্ঞেস করবো, নাম নেই কেন তোর। তুই তো ফেল মারতে পারিস না। --- ইউসুফের কণ্ঠে প্রগাঢ় দৃঢ়তা।
দীঘির পাড় থেকে ইউসুফ ছেলেটিকে টেনে নিয়ে গেল হেডমাস্টারের কক্ষে। সালাম জানিয়ে দু’জনে দাঁড়ায় তাঁর সামনে।
হেডমাস্টার আনোয়ারুল আজিম। কানুনগোপাড়ার কাছে খরন্দ্বীপে বাড়ী। খুব রাশভারী মানুষ। তবে মুখখানা বড়োই হাস্যোজ্জ্বল। মাথায় লাল তুর্কী টুপী। তার পেছন দিকে কালো রেশমী সূতোর ঝালর-ঝুঁটি। কথা বলতে মাথা নাড়লে সেই টুপীর ঝালর-ঝুঁটি নড়ে। মাথা ঝাঁকিয়ে তিনি জিজ্ঞেস করলেন ঃ কি চাই। তোমরা কি জন্য এসেছ?
ছেলেটি মুখ নীচু কওে দাঁড়িয়ে থাকে। সহপাঠী ইউসুফ সাহস কওে এগিয়ে গিয়ে বললো ঃ স্যার, নোটিশ বোর্ডে এই ছেলেটির নাম নেই। তাই বিষয়টি জানতে এসেছি, কেন এমন হল স্যার!
হেডমাস্টার সোজাসুজি বললেন: সে ডিফল্টার। মাইনে বাকী, তাই নাম ওঠে নি।
ছেলেটি ব্যাকুলভাবে বলে ওঠে: আমাকে তো ফ্রি দেয়া হয়েছে স্যার।
: ফ্রি শীপ দেয়া হলেও, তিনমাসের মাইনে দিতে হয়। তোমার দু মাসের বেতন বাকী রয়েছে। সেগুলো ক্লিয়ার করো।
ইউসুফ তৎক্ষণাৎ বললে: স্যার, বেতনের টাকা পাবে কোথায় সে? তাদের অবস্থা খুবই খারাপ।

হেড মাস্টার সকৌতুকে বললেন: তোমার বাড়ী গোমদন্ডী, ওর বাড়ী কধুরখীল। তুমি কী করে জানো যে ওদের অবস্থা খারাপ, তুমি কেন সুপারিশ করতে এসেছ!
ইউসুফ কিন্তু দমবার পাত্র নয়। সে কাতর কণ্ঠে বর্ণনা করে যায় ছেলেটির দুর্ভাগ্য-দুরবস্থার কথা ঃ আপনি স্যার বিশ্বাস করুন, ওর বাবা বেরিবেরি রোগে আক্রান্ত। চিকিৎসা চালাতে পারছেন না। ফোলা হাত-পা নিয়ে চাষের কাজ করতে হয়। দু’মাসের মাইনে দেবার কোন সংগতি নেই তাদের।

হেডমাস্টার আজিম সাহেব আর্তনাদ করে উঠলেন: বলো কি হে! এমন করুণ অবস্থা তাদের! ঠিক আছে, দেখি কী করতে পারি। তোমরা বাইরে যাও।
তিনি সংগে সংগে কেরানী বাবুকে ডেকে বললেন: ছেলেটির সকল বকেয়া মওকুফ করা হলো। খাতায় ওভাবে লিখুন হেডমাস্টারের নির্দেশ।
হেডমাস্টার ধীর পদবিক্ষেপে বেরিয়ে এলেন কক্ষ থেকে। দপ্তরীকে দিয়ে নোটিশ বোর্ডের আচ্ছাদন খুললেন। অধীর আগ্রহে চেয়ে রইল ছাত্ররা সেদিকে। ইউসুফ আর ছেলেটিও রুদ্ধশ্বাসে দেখছে। চোখে-মুখে প্রচণ্ড ব্যাকুলতা: কী জানি, কি হয়!

হেডমাস্টার পকেট থেকে ফাউন্টেনপেন বের করে নোটিশ বোর্ডে খসাখস্ লিখলেন: Stood First। প্রথমস্থানের অধিকারী। তারপর সাহাস্যে ফিওে তাকিয়ে ছেলেটিকে লক্ষ্য কওে বললেন: তুমি প্রথম হয়েছ পরীক্ষায়। সাবাস্!
এই ঘোষণার সংগে সংগে ছেলেরা উল্লসিত হয়ে ওঠে। ইউসুফ আর ছেলেটি লাফিয়ে লাফিয়ে দেখছে নোটিশ বোর্ড। ছেলেটির বুক ফেটে কান্না আসছে। চোখের জল বাধা মানছে না। টপটপ ঝরছে দু’ গাল বেয়ে। তবু সে হাসছে। অনাবিল প্রাণ খোলা হাসি। কান্নাকে ছাপিয়ে সেই হাসির ছটা ছড়িয়ে পড়ছে সুবর্ণ দ্যুতিতে। কধুরখীল ইউনাইটেড মুসলিম হ্ইাস্কুলের চত্বর মুখর হয়ে ওঠে সেই কান্না-হাসি দীপ্ত ছেলেটিকে ঘিরে। সেই ছেলেটির নাম বিমলেন্দু বড়ুয়া।

Additional Info

  • Image: Image