২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ১০ বৈশাখ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ রবিবার, ২৩ এপ্রিল ২০১৭ইংরেজী
বৃহস্পতিবার, 30 এপ্রিল 2015 15:48

সুলেখা বড়ুয়া'র ছোট গল্প : চেতনায় নিলীমা

লিখেছেনঃ সুলেখা বড়ুয়া

সুলেখা বড়ুয়া'র ছোট গল্প : চেতনায় নিলীমা

ডিগ্রী পরীক্ষার শেষ দিন নীল অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে নিলীমার জন্য। একসাথে যাবে আজ এবং পাঁচ বছর আগের সেই না বলার কথা গুলো নিলীমার কানে পৌছাতে হবে। কিন্তু কিভাবে যে বলবে বুঝতে পারছে না সে। মনের মধ্যে অনেক কল্পনার জাল বুনে চলেছে, কিন্তু সঠিক কোনটি হবে ভেবে পাচ্ছে না। কিভাবে বললে নিলীমার কানে শুনতে ভাল লাগবে, কি জানি ভাবছে সে।
এদিকে নিলীমাও হল থেকে বের হচ্ছে না। কি যে করবে নীল; মাঝে মাঝে মনে হয় অপেক্ষার প্রহরগুলো একটি মিনিট যেন একটি ঘন্টা।

একবার গিয়ে দেখে আসলে কেমন হয়? নিজেকে প্রশ্ন করে নীল। না থাক, যদি নিলীমা কিছু মনে করে। কিভাবে যে তার মনের অব্যক্ত কথা গুলো বলবে, শুধুই তাই ভাবে।
আজ যদি বলা না হয়, তাহলে আর কোনদিন বলা হবে না। তাই মনস্থির করল নীল, যে ভাবেই হোক আজ বলতেই হবে। না হয় এই ভালবাসা হয়ত: কোনদিন প্রকাশ পাবে না। নিলীম হল থেকে যখন বের হবে, ঠিক তখন চারদিকে অন্ধকার হয়ে বৃষ্টি নামল। নিলীমা মনে মনে একটু ভয় পাচ্ছ, কারণ বৃষ্টির সাথে সাথে বিজলী চমকাচ্ছে এবং সেই সাথে মেঘের গর্জন। তবুও সাহস করে বের হলো। বাসায় তো যেতেই হবে। গেইট এর বাইরে এসে দেখে নীল কারো জন্য অপেক্ষায় আছে। নিলীমাকে দেখে যেন স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল নীল। নিলীমা ও যেন মনে মনে একটু সাহস পেলো। নিলীমাকে দেখে নীল এগিয়ে এলো।

: আরে নিলীমা,কেমন আছো ?
: হুম, ভাল।
: পরীক্ষা কেমন হল ?
: ভালই।

আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। নীল প্রস্তাব দিলো, চল নিলীমা কিছু খাওয়া যাক। কিন্তু নিলীমা ভাবল আজ তো মনে হয় বৃষ্টি দু-তিন ঘন্টার আগে থামবে না। সুতরাং বাসায় চলে যাওয়ায় ভাল হবে।
নিলীমা: দেখুন, আবহাওয়া তো ভার না,বাসায় চলে গেলে মনে হয় ভাল হবে।

: তা তুমি যাবে কিভাবে ?
: বাসেই চলে যাবো ভাবছি।
: বাস তো ছেড়ে দিয়েছে তুমি বের হওয়ার দু মিনিট আগে। আর একটা আসবে আধা ঘন্টা পরে। তুমি কী রিক্সা দিয়ে যাবে?

নিলীমা চিন্তা করলো, একা যেতেও তো ভয় লাগছে প্রবল বৃষ্টির মধ্যে। নীল থাকাতে একটু সাহস পাচ্ছে মনে।
: নীল আবার বলে, কি ভাবছো ?
 যাবে রিক্সা দিয়ে ?

: হুম যাওয়া যায়।

একথা শুনে নীলের মনে খুশীর আবরণ ঢেউ খেলে গেল। নীল একটা রিক্সা ঠিক করে উঠে বসল রিক্সায় এবং সাথে নিলীমাও। এমন মুসলধারায় বৃষ্টি পড়ে; ঠিক তখন নীল মনে মনে ধন্যবাদ জানাচ্ছে সৃষ্টিকর্তাকে এবং সাথে প্রকৃতিকেও। অমন বৃষ্টি না হলে তো নিলীমাকে সে সাহস করে কোন দিন বলতে পারতো না এক সাথে যাওয়ার জন্য। যথাসময়ে পেডেল চাপল রিক্সাওয়ালা। রিক্সার চাকা ঘুরল, দুজনেই চুপচাপ। অনেক্ষণ কেটে গেল ওভাবেই। অবশেষে নীল বলে উঠল, নিরবতার প্রতিযোগিতা চলবে ?

: নিলীমা হেসে বলল,তা আপনার পরীক্ষা কেমন হল ?
: নীল সংক্ষেপে উত্তর দেয়, ভাল।
ইন্টার পাশ করে এক বছর ফাঁক গিয়েছে, কোথায় ভর্তি হবো সিদ্ধান্ত নিতে পারি নাই।
: আপনি তো আই. কম অন্য কলেজ থেকে করেছেন,ঐ কলেজ থেকে বি. কম দেন নাই কেন?

নীল ঐ কথার উত্তর না দিয়ে নিলীমাকে বলল, নিলীমা তোমাকে আজকে আমি কিছু কথা বলব। অনেকদিন আগে থেকে বলব বলব করে বলা হয়নি। আসলে সময়-সুযোগ কিংবা সাহস কোনটাই পাচ্ছিলাম না। তাই বলাও হয়ে উঠে নাই। আর কিভাবে যে বলব; তোমার শুনতে কেমন লাগবে আমি জানি না।
নিলীমা এবং নীল একেই উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলে পড়া-লেখা করেছে। নিলীমা যখস ষষ্ঠ শ্রেণীতে নীল তখন সপ্তম শ্রেণীতে, সুতরাং নীল এক বছরের সিনিয়র। সাধারণত নীল অনেক ভদ্র  ছেলে। তাই নিলীমা চিন্তা করতেছে কি এমন কথা বলার আছে, যাই হউক। নিলীমা বলল,হ্যাঁ বলেন।
নীল বলল, নিলীমা আমার কথাগুলো যদি তোমার ভাল না লাগে তুমি গ্রহণ করো না।
নিলীমা তখনও বুঝতে পারছে না, নীল কি বলতে পারে।

: হুম বলেন।
: জান নিলীমা, যখন থেকে আমার মনে নৈসর্গিক ভাল লাগার জন্ম নিচ্ছে ঠিক তখন থেকে আমার মনের নিলাভ আঙ্গিনায় শুধু তোমারি প্রতিচ্ছবি আমি দেখতে পেয়েছি। আঙ্গিনায় শুধু তোমারি

প্রতিচ্ছবি আমি দেখতে পেয়েছি। বিশ্বাস কর, মন থেকে আমি মুছে ফেলতে চেয়েছি প্রতিবার, কিন্তু কিছুতেই পারছি না। আমি জানি না, প্রায় পাঁচ বছর নিজের সাথে যুদ্ধ করেছি। এটা হবার নয়। কিন্তু জেনো, আমি হেরে গিয়েছি প্রতিবারই। মানুষ তার প্রিয়জনকে ভালবাসা কিংবা ভাললাগার কথা সুন্দর  করে গুছিয়ে বলতে হয় তা আসলে আমি জানি না। নিলীমা শুনে স্নায়ুবিক দূর্বলাবস্থা। কারণ, সে কোনদিন কল্পনাও করতে পারে নাই নীল যে তাকে এভাবে ভালবাসার কথা শুনাবে।
আবার মনে মনে ভাবল এর চেয়ে সুন্দর করে ভালবাসার কথা কিংবা ভাললাগার কথা কেউ বলতে পারে কি না জানে না সে।
আসলে নীল এমন ভাবে কথাগুলো বলেছে, নিলীমা চিন্তা করতেছে কি বলা যায়। পরে এক সময় বলল ঠিক আছে, আমাকে একটু ভাবতে সময় দেন।
নিলীমা চিন্তা করল,ত্বরিত অস্বীকৃতিপূর্ণ কিছু করা ঠিক হবে না।
কারণ – “আঘাত থেকে প্রতিহিংসার জন্ম হয়।”

সে দিন নীল নিলীমাকে একেবারে বাসা পর্যন্ত পৌছায়ে দিয়ে আসল। কারণ পুরো সময়টা মুষলাধঅরে বৃষ্টি ছিলো। তখন নীলকে বেশ দায়িত্ববান দায়িত্ববান মনে হচ্ছে। নীল ও মনে মনে খুউব প্রফুল্লতা অনুভব করছে। কারণ ওর ভাললাগাকে ভালবাসার কথাগুলো বলতে পেরে। যাওয়ার আগে ঠিকানা চেয়ে নেয় নীল। সে হয়ত পরীক্ষা শেষে ঢাকায় চলে যাওয়ার প্লেন। এরপর তাদের চিঠির মাধ্যমে যোগাযোগ হয়।

: নিলীমা খুবই টেনশন অনুভব করছে।
এখন সে কী করবে?
কিভাবে নীলকে প্রতিরোধ করা যায়?
প্রতিরোধ তো করতেই হবে?
নিলীমা নিজেকে প্রশ্ন করে এবং উত্তর খোজে নিজেই। যখন সে একা থাকে। এই ভাবনা ভাবিয়ে তোলে।
মন ধর্মের অনুগামী, মন শ্রেষ্ঠ।

আমাদের বর্তমান ভাবনা আগামীদিনের জীবন গড়ে তোলে। আমাদের জীবন হলো আমাদের মনেরই সৃষ্টি। যদি মানুষ জেনে শুনে ভুল পথে পা বাড়ায়, অনুতাপ তাকে অনুসরণ করে।
“ গরুর গাড়ীর চাকা যেমন অনুসরণ করে টেনে তোলে বলদকে”।

যথা সময়ে পরীক্ষার ফলাফল বের হলো। দুজনেই ভালই পাশ করলো।
এদিকে নীল বাবার নির্দেশে ঢাকায় যেতে হচ্ছে,যদিও ওর একদম ইচ্ছে ছিলো না চট্টগ্রাম ছেড়ে যাওয়ার। তবুও যেতে হচ্ছে। ঢাকার ভাল কোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.কম. করবে।
নিলীমাও তাকে অনেক উৎসাহ দিয়ে ঢাকায় পাঠিয়ে দিল। তারপর যেন স্বস্তির নিশ্বাস নিল নিলীমা।
নীল শত ব্যস্ততার মাঝেও দুটো করে চিঠি লিখত প্রতিমাসে।

দু’ বছর আগে নিলীমার উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হলে, নিলীমার মা পরিকল্পনা করেছে দশ দিনের কোর্সে বিদর্শন ভাবনা করবে। পরীক্ষা শৈষ হলে একদিন মায়ের সাথে ভাবনা কেন্দ্রে আসল। যথাসময়ে মা বিদর্শন ভাবনা শুরু করল গুরুর নির্দেশে। নিলীমাও মাযের অনুরোধ ও কৌতুহলবশত: খন্ড ভাবনায় বসল। খন্ড ভাবনা করে, নিলীমা বুঝল ভাবনা করা অনেক কষ্ট। তার মানে ছোট্ট বেরায় বাল্য শিক্ষাতে পড়েছি।

“ভাবনা যত যাতনা তত”।
কথাটা সত্যি সত্যি সত্যি।

সেদিন ভাবনা পরিচারনাকারী গুরুকে বন্দনা করে চলে আসবে। ঠিক ঐ মূহুর্তে গুরুজি নিলীমাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
: নিলীমা তোমার পরীক্ষা তো শেষ; তুমিও দশ দিনের কোর্সে বিদর্শন ভাবনায় বসে যাও।
: নিলীমা, না না। গুরুজী আমি পারবো না। ভাবনা করতে অনেক কষ্ট। আমার ভয় লাগে। গুরুজীও নাছোড়বান্দা। উনি ছলে, কৌশলে নিলীমাকে শেষ পর্যন্ত রাজী করালো।

অবশেষে নিলীমা দশদিনের কোর্সে ভাবনায় রত হল। প্রথম প্রথম খুব কষ্ট লাগতেছে নিলীমার, অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়ার কারণে।
প্রতিদিন বিকালে ভাবনা কেন্দ্রে দেশনা শুরু হয়। দেশনা শেষে গুরু যাদের সমস্যা দেখে কিংবা যাদের বুঝতে কোন রকমের সমস্যা হয় কোন কিছুতে, প্রশ্ন উত্তরের মাধ্যমে তাদের সমস্যা সমাধান করার সুযোগ থাকে দেশনার পর।
ভাবনায় বসার দুদিন পর শ্রদ্ধেয় গুরুজী ঠিক সেভাবেই দেশনার পর ডেকে নিয়ে সুন্দরকরে বসায়ে জিজ্ঞাসা করলো, নিলীমা তোমার অনুভূতি কেমন?

: নিলীমা উত্তরে বলে, বেশী বেশী ব্যাথা।
: গুরুজী জিজ্ঞেস করলো আবার, আচ্ছা যখন বেশী ব্যথা হয় তখন কী তুমি নড়ে বস, তাই না? নিলীমা উত্তর দেয়, হুম।
: গুরুজী একটু মৃদু হাসল,এবং বলল শোন তুমি জান না, তুমি তোমার নিজের কত বড় ক্ষতি করে যাচ্ছ।
: নিলীমা ছোট একটা প্রশ্ন করল, কি রকম ?
তখন গুরুজী বিস্তারিত বর্ণনা করতে গিয়ে  বলল, মানুষ এক জীবনে  কত কষ্টই না ভোগ করতেছে। আমরা যদি এক বসাতে একটি জীবন ধ্বংস করতে পারি তাহলে মন্দ কি।
: নিলীমা আবার ছোট্ট করে প্রশ্ন করে, মানে ?

বুঝলাম না গুরুজী।
তখন গুরুজী উত্তর দেয়, ভাবনায় বসার শুরুতে যদি তোমার প্রতিক্রিয়া উঠে, ঐ প্রতিক্রিয়া এক বসাতেই কাটিয়ে উঠতে পার সঠিক ভাবে তাহলে মনে করতে তোমার একটা জন্ম তুমি ধ্বংস করেছ।
এই কথা শুনে নিলীমার তো মন খারাপ হয়ে গেছে। গত দুই দিন সে কি করল।

যাই হউক, প্রথম প্রথম হয়ত সে বুঝে উঠতে পারেনি। তাই সে মনে মনে অধিষ্ঠান করল, এর পরবর্তী আটদিন খুব মনোযোগ দিয়ে শেষ করতে হবে। আর আশ্চর্যের ঘটনা হলো প্রতিদিন কার দেশনার সাথে ভাবনায় যা প্রতিক্রিয়া হয় সব মিলে যাচ্ছে নিলীমার । সে জন্য নিলীমার আগ্রহ আরো বেড়ে গেলো ভাবনার প্রতি। ভাবনার স্বাদটুকু একটু একটু অনুভব হচ্ছে যেন নিলীমার মনে।
আহ: কি প্রশান্তি ! ভাবনার স্বাদ, আনন্দ কারো সাথে শেয়ার করা যায় না। শুধু নিজে নিজেই ঐ আনন্দ উপলব্ধি কিংবা অনুভব করা যায়।
এবার নীলে পরিচয় দিই একটু। নীলের পুরো নাম হচ্ছে “শামীম চৌধুরী নীল”।

নিলীমা যখন নীলের কথা ভাবে, ঠিক তখনই তার বিদর্শনে পাওয়া আনন্দের স্বাদ, প্রতিদিরকার দেশনার কথা, দান, শীল ও বির্দশনে যে একমাত্র দু:খ মুক্তির উপায় এবং এই দূর্লভ মনিষ্য জীবনের চেয়ে আরো দূর্লভ বৌদ্ধ ধর্মে জন্মগ্রহণ করা, সর্বোপরি একমাত্র তথাগত সম্যক গৌতম বুদ্ধ এই আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ আবিষ্কার করেছেন।
এই সব চিন্তা নিলীমার মনে ঘুরপাক খেতে থাকে। মাঝে মাঝে মনে হয় প্রতিধ্বনির মতো আওয়াজ হয়ে কানে বাজে।
চিন্তা করতে করতে এক সময় নিলীমার মনে হলো, আমার দু:খ মুক্তির সন্ধান আমি পেয়েছি, সেখানে নিলের ভালবাসা খুবই নগন্য।
অবশেষে সিদ্ধান্ত নিলো,

“আমার ধর্ম আমি কোন দিন  ত্যাগ করবো না”।

নীল এক সময় ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে এসে নিলীমার সাথে দেখা করতে চাইল। নিলীমাও মনে মনে ভাবল, নীলের সাথে সামনা সামনি কথা বলা দরকার।
চট্টগ্রামে এসে নীল চিঠির মাধ্যমে যোগাযোগ করে কোথায়, কখন এবং কিভাবে দেখা করা যায়।
নিলীমা ঠিক করলো,সমুদ্রের কাছাকাছি কোথাও । কারণ নিলীমা চিন্তা করলো, নীলকে কঠিন বাস্তব সত্য কথাগুলো বললে নীলের সহ্য করার মতো সে রকম পরিবেশ নির্বাচন করতে হবে। সুতরাং সমুদ্রের কাছে থাকলে প্রত্যেক মানুষের কষ্ট একটু হালকা থাকে। মনে হয় প্রকৃতির সাথে কষ্টগুলো অনেকটা শেয়ার করা যায়।
তারপর কোন এক বিকালে সমুদ্রের পারে সবুজ কোমল ঘাসের গালিচা আবিষ্কার করে ডাকদিরো নিলীমা। আসুন এখানে বসি। জায়গাটা খুব চমৎকার এবং নিরিবিলি।

: নিলীমা বলে,জানেন আমার খুউব ভাল লাগে জায়গাটা। এখানে কিছুক্ষণ বসে থাকলে মনে শান্তি আসে, স্থিতি আসে।
: নীল বলে, নিলীমা- তোমার মনেও কি ঝড়? আমার মতো !
: নিলীমা চুপ করে থাকে আর দাঁত দিয়ে ঘাসের ডগা কাটতে থাকে।
: বল নিলীমা,আমার মত কি তোমার মনে হয় না..................ধর্ম , সমাজের , পরিবারের বাধা অতিক্রম করে আমরা দূরে কোথাও চলে যাই। তুমি কেন পার না বল আমাকে ?

নীলের কন্ঠে অনেকটা আর্তনাদের সুর।
নীল আবার বলে, আমি যদি বৌদ্ধ ধর্ম পালন করি,দরকার বশত গেরুয়া বসন পড়ে ধর্মের আচরণগুলো শেখার জন্য কোন বৌদ্ধ মন্দিরে তিন মাস থাকব কিংবা তোমাকে নিয়ে আমি কোন বৌদ্ধ রাষ্ট্রে চলে যাবো....থাইল্যান্ড, বার্মা....

নীলের আবেগের কথাগুলো শোনে নিলীমার মনে খুউব কষ্ট হচ্ছে নিলীমার জন্য।
চুপ করে রইলে কেন? বলকিছু। কি জানি বলবে বলেছ, বলে নীল।

বিশ্বাস করুন, আমার মত অবস্থায় পড়লে অন্য কোন মেয়ে আপনার সঙ্গে পালিয়ে যেত। আমি যে তা পারি না। সমাজ না মানুক, বাবা-মা’র সম্মতি থাকবে না, আশীর্বাদ থাকবে না, এমন সম্পর্কতো সার্থক হতে পারে না, সুখের হতে পারে না। আমরা উভয়ে বাবা-মা থেকে তাদের সন্তানকে বঞ্চিত করছি, কাজটা এমনটি না। একটু ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করে দেখেন তো।
নীল অবাক হয়ে চেয়ে থাকে নিলীমার মুখের দিকে। সন্ধ্যার আঁধারে অস্পষ্ট সমুদ্রের জলের মতো ওর মুখটাও অস্পষ্ট,আর মনটাও যেন সমুদ্রের জলের মতো গভীর।

: নীলের প্রচন্ড ইচ্ছে হচ্ছে নিলীমার হাতটি একটু ছুঁয়ে দেখতে। কিন্তু সাহস হলো না।
: হুম চুপ করলে কেন? কি বলছিলে ? আমাদের সম্পর্কটা কি হতে পারে না? ভাই-বোনের কিংবা ভাল-বন্ধু।
নি – লী – মা; অনেকটা আর্তনাদের মতো শোনায় নীলের কন্ঠস্বর।
বন্ধুত্ব কিংবা ভাই-বোনের সম্পর্কে গ্লানি নেই, লজ্জা নেই কেউ কটাক্ষ করবে না, ধর্ম বা সমাজ বাধা দিতে পারবে না, এমন মধুর সম্পর্কে।
অবাক হয়ে চেয়ে থাকে নীল নিলীমার দিকে।

: আমার মা- বাবা, আপনার মা-বাবা কারো আপত্তি থাকবে না এ সম্পর্কে।
আকাশ আর সমুদ্র যেখানে মিলে মিশে একাকার হয়ে আছে নীল অনেক্ষণ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলো ঐ দিগন্ত রেখায়।
নীল তারপর ধরা গলায় বলে, মন মানতে চাইছে না তবুও তোমার কথা আমি মেনে নিলাম নিলীমা। আমি জানতাম তুমি এমন কিছু কথা শুনাবে। তাই কাল থেকে ভাবছিলাম তোমাকে হারিয়ে বাঁচব কি করে? আলোহীন অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছিলাম। তুমি আলো দেখালে, সঠিক পথের সন্ধান দিলে, বাঁচার প্রেরণ দিলে। তাই হোক নিলীমা, তুই আমার সবচেয়ে ভাল বন্ধু।
আমাদের সম্পর্কটা যেন চিরদিন আমার আপন হয়ে থাক।

সেদিন মনে কতটুকু কষ্ট নিয়ে কথাগুলো বলেছে নীল, সেই জানে। তারপর আকাশের দিকে দৃষ্টি দিয়ে অনেক্ষণ তাকিয়ে রইল।
এক সময় নিজের অজান্তে চিৎকার করে বলে ওঠে।

“এ যেন নিলীমায় নীল”

 

সুলেখা বড়ুয়া : সদ্ধর্মপ্রাণ সমাজ সচেতন সুলেখক। বর্তমানে লন্ডন প্রবাসী। একজন সংস্কৃতিসেবী।

Additional Info

  • Image: Image